kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ও সুন্দরবনের জৈবঢাল

বিধান চন্দ্র দাস

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ও সুন্দরবনের জৈবঢাল

বুলবুল আঘাত হানল। এই আঘাতের মাত্রা খুব তীব্র না হলেও তার ধাক্কা একেবারে কম হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে  হয়তো দেরি হবে। কিন্তু এরই মধ্যে যে সংবাদ পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলা যায় যে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ২৭ মে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় আইলা ও তাদের অনুষঙ্গ জলোচ্ছ্বাস যে পরিমাণ জান-মালের ক্ষতি করেছিল—তার তুলনায় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতির পরিমাণ অল্পই। সাফির-সিম্পসন স্কেলে এই ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ক্যাটাগরি নম্বর ১ হলেও তা সুন্দরবনের সঙ্গে বাধা না পেলে তা থেকে অবশ্যই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশিই হতো। কাজেই সেই হিসেবে বলা যায় যে বরাবরের মতো এবারও সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করল। আমাদের চোখে আরো একবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল তার প্রয়োজনের কথা।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল তার উৎপত্তি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেছে। গত মাসের ২৪ তারিখে (২৪ অক্টোবর ২০১৯) ফিলিপাইন সাগরে ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় একটি ঝড় ‘মত্ম’ সৃষ্টি হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে (৩০ অক্টোবর ২০১৯)  সেটি দক্ষিণ চীন সাগরে এসে উপস্থিত হয়। এই সময় ‘মত্ম’র কারণে মধ্য ফিলিপাইনে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় এবং তার জন্য সেখানে বন্যাও হয়। এরপর ‘মত্ম’ পশ্চিম দিকে সরে এসে ভিয়েতনামের উপকূলে আছড়ে পড়ে। এই সময় সেখানে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১২ কিলোমিটারের মতো ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ২০০ মিলিমিটার। স্বাভাবিক নিয়মে ঝড়টি পশ্চিম দিকে স্থলভূমিতে অগ্রসর হওয়ার পরেই তার গতিবেগ কমে আসতে থাকে। কারণ ভূপৃষ্ঠ যতই উষ্ণ হোক—সেখান থেকে কোনো ঝড় শক্তিশালী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জলীয়বাষ্প পায় না। ধারণা করা হয়েছিল যে ঝড়টি সেখানে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঝড়টি ‘ভূতুড়ে ঝড়’ হিসেবে থেকেই যায় ও হঠাৎ করে আরো পশ্চিমে—ব্যাংককের ওপরে ঘন মেঘ ও জলীয় বাষ্প তৈরিসহ সেখানে বৃষ্টিপাত শুরু হলে বোঝা যায় যে ঝড়টি শেষ হয়ে যায়নি। এরপর এই ঝড় ২ নভেম্বর ২০১৯ আন্দামান সাগরের দিকে সরে যায়। আন্দামান সাগরে এই সময় পানির তাপমাত্রা ছিল ৩০ সেন্টিগ্রেডের ওপর। কাজেই স্তিমিত ঝড় নতুন করে আবার তার রসদ অর্থাৎ প্রচুর জলীয়বাষ্প পেয়ে বৃহস্পতিবারেই (৭ নভেম্বর ২০১৯) ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে থাকে ও বঙ্গোপসাগরে চলে আসে। এই সময় এর নাম দেওয়া হয় ‘বুলবুল’। সাফির-সিম্পসন স্কেল অনুযায়ী তখন এর ক্যাটাগরি নম্বর হয় ২। এরপর ‘বুলবুল’ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে এবং আসার পথেই তার শক্তি হারিয়ে আবার ক্যাটাগরি নম্বর ১-এ পরিণত হয়। শনিবার (৯ নভেম্বর ২০১৯) সন্ধ্যার পরে ‘বুলবুল’ পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকা বকখালী, ফ্রেজারগঞ্জ ও সাগরদ্বীপে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের সুন্দরবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শনিবার রাত থেকেই বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে ও সুন্দরবনের ওপর আঘাত হানার পর সেখানে বাধা পেয়ে রবিবার (১০ নভেম্বর ২০১৯) ভোরে আরো দুর্বল হয়ে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। কাজেই বলা যায় যে বুলবুলের শক্তি খর্ব করার জন্য ভারত ও বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই রাখল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এর আগেও সুন্দরবন তার নিজের বুক পেতে অনেক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াল ছোবল গ্রহণ করেছিল। নিকট-অতীতে সিডর ও আইলা প্রথমে তাদের সর্ব শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়েছিল সুন্দরবনের ওপর। আছড়ে পড়ার পরই সেই সময় তার জন্য প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুন্দরবন। সত্যি কথা বলতে কী—দেশের দক্ষিণে গড়ে উঠা এই ম্যানগ্রোভ বন অতীতে অনেক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত রুখে দেওয়ার জন্য দুর্ভেদ্য বনদুর্গের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ দেশ। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে বসবাস। প্রায় প্রতি তিন বছরে একবার করে এ দেশে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের এক ষষ্টাংশ বাংলাদেশে চলে আসে। সাধারণত বর্ষার আগে গ্রীষ্ম ঋতুতে (এপ্রিল-মে) ও পরে হেমন্ত ঋতুতে (অক্টোবর-নভেম্বর) বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় হতে দেখা যায়। উত্তর বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের স্থলভূমিতে ত্রিকোণাকৃতি ধারণ করায় ও মহীসোপান (স্থলভাগ সন্নিহিত সমুদ্রতলের অংশ) অগভীর হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের পুনরাবৃত্তি ও মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড়ের ঘন ঘন আঘাত সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক কিংবা সৃজিত ম্যানগ্রোভ বন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে ম্যানগ্রোভ বনের এই কার্যকর ভূমিকা পালনকে বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক সেবা বলে অভিহিত করেছেন। ম্যানগ্রোভ বন ঢেউ ও ঝড়ের বিরুদ্ধে জৈব ঢাল হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘ ও চওড়া ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাস ও বাতাসের গতিবেগ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসজনিত বিপদ অনেকটাই কমিয়ে দেয় ঘন ম্যানগ্রোভ বনের চওড়া বেষ্টনী। কিন্তু ম্যানগ্রোভ বনের এই সেবা বিশেষ করে তার ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার বিষয়টি সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না—যতটা মূল্যায়ন করা হয় এই বন থেকে রাজস্ব পাওয়ার বিষয়টি।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের ২০১৭ সালে করা একটি গবেষণাপত্রেও বাংলাদেশে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ বনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। ম্যানগ্রোভ প্রজাতির ভিন্নতা, তাদের ঘনত্ব ও ম্যানগ্রোভ বনের প্রশস্ততার ওপরেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষার বিষয়টি জড়িত বলে ওই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে ৫০ মিটার থেকে দুই কিলোমিটার চওড়া ম্যানগ্রোভ বন জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাকে ৪ সেন্টিমিটার থেকে ১৬.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। আর ৫০ মিটার থেকে ১০০ মিটার চওড়া বাইন ও কেওড়ার বন ২৯ শতাংশ থেকে ৯২ শতাংশ পানির গতিবেগ  হ্রাস করতে পারে।

সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের ঘনত্ব ও তাদের শেকড় এবং কাণ্ডের ওপর জরিপ করে ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে কেওড়া, বাইন আর সুন্দরী গাছ যেকোনো উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের গতিবেগ কমিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। উল্লিখিত গবেষণাপত্রে ম্যানগ্রোভের কোন গাছ কোথায় লাগাতে হবে, সে ব্যাপারেও দিকনির্দেশনা ছিল। ক্রমবর্ধমান চরে কেওড়া আর বাইনগাছ ও জোয়ার-ভাটার জায়গায় গরান, গেওয়া ও সুন্দরীগাছ লাগানোর কথা সেখানে বলা হয়েছে। গবেষণাপত্রে বেড়িবাঁধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ও নদী বরাবর বেড়িবাঁধের ধার দিয়ে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

এ বছর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা থেকে প্রকাশিত একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল বাংলাদেশের দক্ষিণে উপকূলীয় বন সৃজনে প্রকল্পিত খরচ ও উপকারের তুলনামূলক উপাত্ত প্রদর্শিত হয়েছে। বৃক্ষরোপণ, ভূমি খরচ ও পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনিক খরচের বিপরীতে কাঠ ও জ্বালানির মূল্য, অন্যান্য বনজ দ্রব্যের মূল্য, উপকূলীয় মৎস্য মূল্য, প্রতিরোধিত মৃত্যু ও গৃহক্ষতি মূল্যের তুলনামূলক  হিসাব দেখিয়ে বলা হয়েছে যে উপকূলীয় বন সৃজন লাভজনক।

আসলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় সুন্দরবনকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন গোটা উপকূলীয় এলাকায় নদী বরাবর উঁচু বাঁধ নির্মাণসহ তার পাশ দিয়ে ম্যানগ্রোভ গাছের ঘন চওড়া বন। গোটা উপকূলীয় এলাকায় এ ধরনের বাঁধ ও ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে বুলবুল, আইলা বা সিডরের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে যাবে।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা