kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মানবিক সময়ের অপেক্ষায়!

শামীম আল আমিন

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানবিক সময়ের অপেক্ষায়!

গ্রামের বিরোধ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে। ফাঁসাতে হবে যেকোনোভাবেই। মিথ্যা মামলা দিতে হবে। আর তার জন্য নিজের সন্তানের বুকে ছুরি চালিয়ে দিতেও দ্বিধা করলেন না এক বাবা। পাঁচ বছরের শিশু সন্তানকে বাবা নামধারী এক পাষণ্ড নিজেই তুলে দিয়েছেন তার ভাইদের হাতে। খুন করার জন্য। নির্মমতার সব উদাহরণ তৈরি করে সেই বাবার উপস্থিতিতে খুন করা হলো শিশুটিকে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামের কৃষক আবদুল বাসিত কাজটি করতে পারলেন! সন্তানের জন্য জন্মদাতা বাবার এতটুকু মমতা হলো না, একবারও বুকটা কেঁপে উঠল না।

জন্মদাতার হৃদয়েই যখন বিষ তখন প্রভাবশালী এক দল ছাত্রনেতার অন্তরে মমতা থাকবে—এমন প্রত্যাশা করাটাই তো ‘পাপ’! তাদের কত ক্ষমতা! হলে থাকতে হলে, সিট পেতে হলে, এমনকি ক্যাম্পাসে টিকে থাকতে হলে তাদের অনুকম্পা তো লাগবেই। সেখানে ফেসবুকে ভিন্নমত, প্রতিবাদ! তা কিভাবে সহ্য করবেন মহাক্ষমতাবানরা। ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরেই ফেলল ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা এক দল ‘গুণ্ডা’। দেশজুড়ে তোলপাড়, কত রাজনীতি।  

তাসলিমা বেগম রেনুর কথা এখনো নিশ্চয়ই ভোলেননি কেউ। এইতো সেদিনের কথা। নিজের মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানো দরকার। বাড্ডার একটি স্কুলে গেলেন মা রেনু। এক দল লোক ছড়িয়ে দিল ‘সন্দেহ’ নামক বিষবাষ্প। ব্যস, আর যায় কোথায়! গর্জে উঠল বীর জনতা! কে শোনে কার কথা। কী যে ক্রোধ তাদের অন্তরে। আইন তুলে নিতে হবে নিজের হাতে। তা-ও কেউ-ই যখন নিশ্চিত নয়, আসলেই কি এই নারী অপরাধী! আমি ভাবি, মানুষ কী করে এতটা নির্মম হয়।

সায়মা নামের সাত বছরের শিশুটির কথা মনে আছে, নাকি এত ঘটনায় দ্রুতই বিস্মৃত হয়েছে সবাই? এইতো সেদিন ছোট্ট মেয়েটির নিরুপায় বাবা শিশুকন্যাটির ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কী আকুল হয়েই না কাঁদছিলেন! যে কান্না সংক্রমিত হয়েছিল আশপাশের অনেকের মধ্যে। টিভির পর্দায় দেখেছিল কোটি মানুষ। সায়মার বাবা আব্দুস সালাম বলছিলেন, ‘আমি ব্যর্থ হয়েছি, আমি মেয়েকে আগলে রাখতে পারিনি। যাঁদের সন্তান আছে, তাঁরা কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিভাবে তাদের নিরাপদে রাখবেন, তা ভেবে দেখবেন।’

ছোট্ট শিশু সায়মাকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ছাদ দেখানোর কথা বলে প্রতিবেশী এক যুবক তাকে ধর্ষণ করে। পরে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করে খালি একটি ফ্ল্যাটে লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। কী নির্মমতা! মানুষ কী করে পারে! তারাও তো ‘মানুষ’ নামধারী!

প্রতিদিন কত ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন কত খবর আসে কাগজের পাতা ভরে। গরম খবরের আশায় কাপ ভর্তি গরম চা নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে দর্শক। গরম খবরের অভাব হয় না। একটি শেষ হতে না হতে আরেকটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ঘটনার ঝড় থামতে না থামতে আরেকটি ঝড় ওঠে। কত ঘৃণা, আফসোস, বিচারের দাবি। শেষমেশ একটি ঘটনা তলিয়ে যায় আরেকটির আবির্ভাবে। অথচ ঘটনা থেমে থাকে না। অবাক হই। ভাবি, কেউ কি আগের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয় না; একটু চিন্তাও করে না? ভয় পায় না! লজ্জা পায় না! বিবেক দিয়ে তাড়িত হয় না? ওই মানুষগুলোর বুকের ভেতরে কি ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে কোনো অঙ্গের অস্তিত্ব নেই? ভালোবাসা, মমতা, বিবেক, মানবিকতা—এ শব্দগুলোর সঙ্গে তাদের কি কখনো পরিচয় হয়েছিল! তাদের কি মা ছিল কখনো, বাবা ছিল, বোন, ভাই কিংবা আদরের সন্তান! কাকেই বা দোষ দেব, লেখাটি শুরুই তো করলাম সন্তান হত্যার নির্মমতার কথা শুনিয়ে। ভাবতে ভাবতে আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমার নিশ্চয়ই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার। আমি না হয় চিকিৎসা নিতে গেলাম; কিন্তু অসুস্থ সমাজের চিকিৎসা কে করবে? প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই। কিছু মানুষের ‘লালসা’ এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

আমি এখন ‘মানবিক সময়’-এর অপেক্ষায়। কিন্তু সময় কি কখনো মানবিক হয়, নাকি মানুষই সময়কে মানবিক বানায়? বিষয়টি কি এমন যে ‘মানবিক সময়’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। কয়েক বছর আগের কথা বলছি। একদিন খাবার টেবিলে আমার শিশুকন্যা অপর্ণা আমিন একটি কথা বলে আমাকে রীতিমতো চমকে দিল। তখন তার বয়স ছিল সাত বছরের কাছাকাছি। অপর্ণা আমাকে সেদিন বলেছিল, “বাবা, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধের শাস্তি যদি হয় শুধু ‘স্যরি’ বলা, তাহলে আর পুলিশ লাগবে না।” আমি অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। এরপর জানতে চাইলাম, কেন সে এমনটা মনে করছে। তখন অনেকটা বিজ্ঞের মতো অপর্ণা বলে, “ধরো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটাই এমন ছোট হবে যে শুধু ‘স্যরি’ বলে দিলেই শেষ। তখন পুলিশ এসে কী করবে? পুলিশ লাগবে, বলো?” ছোট বাচ্চাটা জানতে চায়। এবার আরো একবার চমকে উঠি। অপর্ণার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বরং আমি তার কাছে জানতে চাই, এমন কথা তাকে কে বলেছে? সে হেসে উত্তর দেয়, ‘আমার কার্টুন বলেছে, বাবা।’

ভেবে দেখুন, একটা কার্টুন চরিত্র সাত বছরের শিশুকে শিখিয়েছে ‘স্যরি’ বলার গুরুত্ব। সেই সঙ্গে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনার উপায়ও বাতলে দিয়েছে। গোটা পৃথিবীটাই যদি এমন হয় যে কোনো বড় অপরাধ হবে না, বরং অপরাধের মাত্রা এতটাই ‘তুচ্ছ’ হবে যে একজন আরেকজনকে ‘স্যরি’ বলে দিলেই তা শেষ হয়ে যাবে; সে ক্ষেত্রে অপরাধের প্রতিকারের জন্য পুলিশ লাগবে না। তেমনি অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার কাজও হয়ে যাবে শেষ। এর অর্থ মানুষ অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। ছোটখাটো ভুল হয়ে গেলে স্যরি বলেই সমাধান করবে।

আমরা জানি, কোনো সমাজই অপরাধমুক্ত নয়। অপরাধ হয় বলেই রয়েছে আইন ও আইনের প্রয়োগ। রয়েছে শাস্তির বিধানও। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার অসংগতি ও পচন নিয়ে কথা বলছি। তার মানে এই নয় যে পৃথিবীর সভ্য দেশ বলে পরিচিত আমেরিকার মতো দেশে বীভৎস অপরাধ হয় না। সব জায়গায় হয়। কম আর বেশি। আইন আর তার প্রয়োগের তারতম্য, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, বৈষম্য আর ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা কোথাও কোথাও সেই পচনকে গভীর করে তুলেছে। পার্থক্যটা সেখানেই।

কিন্তু আমি যার অপেক্ষায়, সেই ‘মানবিক সময়’ এই পৃথিবীতে হয়তো অলীক কল্পনামাত্র। হয়তো কখনোই সমাজকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। এর পরও আমি সেই সময়ের অপেক্ষায় থাকলাম। মানবিক সময়ের। যে সমাজে শুধু ‘দুঃখিত’ বললেই সব বিবাদ মিটে যাবে। 

লেখক : কালের কণ্ঠ’র উত্তর আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা