kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

‘...আমি তোমাদেরই লোক’

মোফাজ্জল করিম

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



‘...আমি তোমাদেরই লোক’

এক শ বছর আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভাগমন হয়েছিল সিলেটে। কবি বর্তমান মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে এসেছিলেন সিলেটে এবং পথে আমার জন্মভূমি কুলাউড়ার রেলওয়ে জংশন স্টেশনে রাত্রি যাপন করেছিলেন। সেই সময় করিমগঞ্জ-কুলাউড়া রেলপথটি চালু ছিল। পাকিস্তানি আমলে বোধ করি পঁয়ষট্টি সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি রেললাইনও তুলে ফেলা হয়। বর্তমানে ব্যাপক জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে লাইনটি পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি শুভ উদ্যোগ।

রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালের ৪ নভেম্বর দিবাগত রাত্রে কুলাউড়া স্টেশনে রেলের ‘সেলুন কারে’ অবস্থান করেছিলেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক সিলেট সফর এবং যাত্রাপথে কুলাউড়ায় রাত্রিযাপনকে স্মরণ করে উভয় স্থানে যথোপযুক্ত মর্যাদায় স্মরণোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এগুলোও অবশ্যই অত্যন্ত শুভ উদ্যোগ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সুধীজনকে জানাই সাধুবাদ। সিলেটের চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা সর্বজনশ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং এককালের ডাকসাইটে আমলা জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও তাঁর স্নেহধন্য সিলেটের জনপ্রিয় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁরা দুইজন রাজনৈতিকভাবে যদিও দুই মেরুতে অবস্থান করেন, তবুও সিলেটের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে তাঁদের পরস্পরের মধ্যে যে সমঝোতা তা সর্বজনবিদিত এবং আমার মতে এই মণিকাঞ্চনযোগ সম্ভব হয়েছে জনাব মুহিতের স্বভাবসুলভ ঔদার্য ও মেয়র আরিফের তাঁর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধের কারণে। জনকল্যাণ, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার-শুভাচারের ক্ষেত্রে তাঁরা উভয়েই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। রবীন্দ্র-আগমনের এই শতবর্ষী অনুষ্ঠানে স্বভাবতই নগরপিতা হিসেবে আরিফ উদ্যোগ গ্রহণ করে ছুটে গেছেন বর্তমান সিলেটের রাজনৈতিক মুরব্বি জনাব মুহিতের কাছে। জনাব মুহিতও তাঁকে বিমুখ করেননি। তবে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, অনুষ্ঠানটি হতে হবে সর্বজনীন ও সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। শোনা যায়, এতে তাঁর অনুগামীদের অনেকের ভ্রুকুঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু শ্রদ্ধেয় মুহিত সাহেব এসব ব্যাপারে আপোসহীন। আমি ঢাকায় বসে এর প্রমাণ পেলাম, যখন মেয়র আরিফ আমাকে অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানালেন ও স্মরণোৎসব পর্ষদের আহ্বায়ক জনাব মুহিত নিজে চিঠি দিয়ে আমাকে উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে থাকতে অনুরোধ জানালেন। আর সর্বজনীন যে কোনো ব্যাপারে আমি তো মোটামুটি ‘নাচইন্যা বুড়ি’। অতএব...। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, আমাদের দেশপ্রেম ও শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-সাহিত্য ইত্যাদি কিছু কিছু বিষয়কে সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। তা না হলে আমরা উন্নয়নের পথে, সমৃদ্ধির পথে যতই এগিয়ে যাই না কেন, পরস্পরের সঙ্গে বাদ-বিসম্বাদে লিপ্ত থেকে আমাদের প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে হতে একদিন বিলীন হয়ে যাবে। তখন জাতি যে মহাদুর্যোগে নিপতিত হবে, তাতে তার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।

২.

এ কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে গত পাঁচ দশকে আমাদের জাতীয় রাজনীতি সন্দেহ, অবিশ্বাস, একদেশদর্শিতা ও সংকীর্ণমন্যতার বিষবাষ্পে ভরে উঠেছে। এটা যে শুধু পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে তা নয়, এমন নয় যে কেবল ‘ক’ দল ‘খ’ দলের বিরুদ্ধে আর ‘খ’ দল ‘ক’ দলের বিরুদ্ধে ছুরি শাণাচ্ছে, নিজেদের মধ্যেও অবিশ্বাস-অন্তর্দ্বন্দ্ব, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি একেকটি দল ও সংগঠনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় জীবনে। সৃষ্টি হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। অস্থিরতা বাড়ছে সমাজজীবনে।

একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে, এই পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা হচ্ছে স্বাধীনতার ‘বাই-প্রডাক্ট’। বাংলায় বলে উপজাতক। আমরা যখন পরাধীন ছিলাম তখন আমাদের ‘কমন এনিমি’ ছিল পাকিস্তানিরা। তখন আমরা মোটামুটি এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি নিজেদের পাওনা আদায়ের জন্য, নিজেদের মধ্যে ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ ছিল গৌণ। কারণ বড় হিস্যাটা পেলে তবেই না সেটার ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি-কাউলাকাউলি হবে। আর যখন বড়টা পেয়েই গেলাম, অর্থাৎ দেশটার ষোলো আনা মালিক বনে গেলাম নিজেরা, তখন কে কাকে কনুই মেরে হটিয়ে, ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে, পুরোটা একাই সাবড়াব সেই ধান্ধাবাজি পেয়ে বসল আমাদের।

আর এটা শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা, বিষয়-আশয়, চাকরি-বাকরিই নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার বেলায়ও এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ল। দুইজনে ভাগ করে নিলে আমি পাব আট আনা, না হয় দশ আনা-বারো আনা, আর যদি ভাগ না দিতে হয় তা হলে তো ষোলো আনাই আমার। তা হলে অন্যকে ভাগ দিতে যাব কেন? কোন দুঃখে? পুরোটা বাগাবার ফন্দি-ফিকির সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারলেই তো কিস্সা খতম। পাকিস্তানিরা কত যত্ন সহকারে আমাদের এই শিক্ষাই তো দিয়ে গেছে! এভাবেই তো তখন দেশ শোষণ করেছে ২২ পরিবার। আর এখন শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে মাশাল্লাহ ওই ধরনের ২২ পরিবারকে কড়ে আঙ্গুলের ডগায় নাচাবার যোগ্যতা হাসিল করেছে আমাদের দেশের অন্তত ২২শ পরিবার। ফলে আজ আমরা সিনা ফুলিয়ে বলি, আমাদের প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলল বলে, আর মাথাপিছু গড় আয় দুই হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গড় আয়ের মাজেজাটা যারা বোঝে না তারা ভাবে, দেশের গরিবস্য গরিব বস্তির লোকটা বা অজ পাড়াগাঁয়ের বারো মাস মুনিষখাটা ভূমিহীন ভোম্বইল্যাও সারা বছরে দুই হাজার ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার টাকা কামাই করে। তা হলে তার দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৬৬ টাকা। এটা ওই ভোম্বইল্যা বা বস্তির বসিরন বেওয়াকে যদি বলেন, তবে তারা আপনাকে শুধু মারতে বাকি রাখবে। ‘মস্করা করার আর জায়গা পান না। সারাদিন খাইটা-খুইটা এক কেজি চাউল আর দুইটা পিঁয়াজ কিনার পয়সা পাই না, আর আপনি হুনাইতাছেন চার শ-পাঁচ শ টাহার কিস্সা। ভাগেন ইহান থাহি।’... তা হলে ঘটনাটা কী? ঘটনা আর কিছু না, ঘটনা ওই পাঠশালা স্কুলে পড়া শুভংকরের ফাঁকি। পাকিস্তানি আমলের সেই ২২ পরিবারের উত্তরসূরিদের একেকজনের বার্ষিক গড় আয় মিলিয়নস অব ডলার, আর ভোম্বইল্যাদের আয় হয়ত বড়জোর ৪/৫ শ ডলার—অর্থাৎ ৩৪/৩৫ হাজার টাকা। অথচ গড়পড়তা হিসাবের গ্যাঁড়াকলে পড়ে তারা হয়ে গেছে লাখপতি! শুনতে খুব ভালো লাগে ঠিকই; কিন্তু বৈষম্যের করাল ছোবলে যে এই মানুষগুলোর জীবন প্রতিনিয়ত তেজপাতা হচ্ছে, সে খবর কি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-আইএমএফ রাখে? নাকি আমরা নিজেদের ভালো ঋণগ্রহীতা প্রমাণ করে আরো বেশি বেশি ঋণ পাওয়ার আশায় নিচুতলার হাড় জিরজিরে মানুষগুলোর গায়ে-গতরে লাল-সবুজ রং লাগিয়ে বিশ্বসভায় তাদের সং সাজিয়ে হাজির করি। আর পাঁচ শ টাকার বালিশ পাঁচ হাজার টাকায় কিনে বগলদাবা করে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে ছুটে চলি পারমাণবিক চুল্লির আগুনে গা গরম করতে। মহাসড়ক ও চুল্লি নির্মাণের শ্রমিক ও ভূমিহীন কৃষক ব্যাটা তখন বৌ-বাচ্চা নিয়ে বিনিদ্র রাত জাগে আগামীকাল কী খাবে সেই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে।

এই বৈষম্য, এই অনাচার, ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা আমরা গর্বভরে উচ্চারণ করি, সেখানে তো বৈষম্য, অনাচার, বঞ্চনা দূর করে একটি সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশের কথাই রক্তের অক্ষরে লিখে গেছে ত্রিশ লক্ষ শহীদ। দল-মত-নির্বিশেষে তাদের সেই ত্যাগ-তিতিক্ষাকে ভাঙিয়েই তো প্রতিনিয়ত আমরা গলাবাজি-স্টান্টবাজি করে চলেছি, যা শুনলে, যা দেখলে, মনে হয় দেশ থেকে অন্যায়-অবিচার, অনৈক্য দূর করে সাম্য, ন্যায়নীতি, ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আবার শহীদ হতে প্রস্তুত আছি। এটা যে কত বড় প্রবঞ্চনা তা বলে শেষ করা যায় না। এটা যদি সত্যি হতো তা হলে দেশ আজ দুর্নীতির মহাসাগরে নিমজ্জিত হতো না, কন্যাশিশুটি, নারীটি প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হতো না, সুশাসন নির্বাসিত হতো না দেশ থেকে। শিক্ষাঙ্গন থেকে কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ভাগোয়াট হতে হতো না উপাচার্যদের।

আর সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সকল অপকর্মের জন্য চূড়ান্ত বিশ্লেষণে আমার মতে, দায়ী আমাদের জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে সীমাহীন জাতীয় অনৈক্য। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, সাধারণ সৌজন্যবোধ—এসব যেন দ্রুত অপসৃয়মাণ এই সমাজ থেকে, এই দেশ থেকে। অথচ বাঙালির নম্রতা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, অতিথিপরায়ণতা চিরকাল বিশ্ববাসীর প্রশংসামিশ্রিত শ্রদ্ধা অর্জন করে এসেছে। যাই যাই করেও বাঙালির এইসব গুণাবলীর যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে সেটুকু পুঁজি করে এখনো আমরা বিশ্বদরবারে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের স্থানটুকু ধরে রাখতে পারতাম, যদি না ইদানীং পেশিবলে বলীয়ান ও ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় পরিপুষ্ট একটি অপশক্তি আমাজনের সামপ্রতিক দাবানলের মত দ্রুত বিস্তারলাভ করত। এরা মনে করে প্রশাসন, শিক্ষাঙ্গন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতি—সর্বক্ষেত্রে তাদের কথাই প্রথম কথা, তাদের কথাই শেষ কথা। নিয়মনীতি, আইনকানুন, ভদ্রতা-ভব্যতা এসবই এদের কাছে অচল আধুলি, সেকেলে প্রথা। এসব ‘এনালগ’ আমলের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান বর্তমান ‘ডিজিটাল’ আমলে অচল। এখনকার ডায়ালগ হচ্ছে : দেবেন না মানে? দিতে হবে। নিয়মকানুন? আইন? গুলি মারেন ওইসব বস্তাপচা আইন। জানেন আমি কে?

৩.

তিন দিন ধরে সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানে যোগদান ও নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সিলেটে আছি। সিলেটের অনুষ্ঠান বিরাট অনুষ্ঠান, বিশাল তার আয়োজন। মেয়র আরিফের বিশেষ অনুরোধে আজ (০৬/১১/২০১৯) একটি সেমিনারে সরকারি মুরারীচাঁদ কলেজে গিয়েছিলাম, যদিও আয়োজকরা আমাকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানাননি। বলা যেতে পারে, অনাহূত বা রবাহূত হয়ে গেছি। আরো সঠিকভাবে বলা উচিত, ‘মেয়রাহূত’ হয়ে গেছি! যাওয়ার একটা বিশেষ কারণও ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে ১৯৬৩ সালে আমার সরকারি চাকরিজীবনের শুরু, এখানে তিন বছর অবস্থানকালের অনেক মধুর স্মৃতি চিরকাল আবেগাপ্লুত হয়ে স্মরণ করি। আমার জান্নাতবাসী আব্বা ১৯২২-২৬ সালে এই কলেজের শৈশবে একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। যা হোক, স্মৃতিভুক আমি গেলাম তো অন্তরের টানে; কিন্তু গিয়ে বুঝলাম, বাংলা ভাষায় অপাংক্তেয় বলে যে একটা শব্দ আছে আমি তারই প্রতিভূ। না, সেমিনারের আয়োজকরা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্দেশ খাইয়েছেন, একটা চটের ব্যাগ, যার উদরে ছিল কিছু কাগজপত্র, ধরিয়ে দিয়েছেন, সেমিনার শেষে তাঁদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের জন্য পীড়াপীড়ি করেছেন ঠিকই; কিন্তু যার জন্য আমার এই প্রিয় শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে আমার মনটা সারাক্ষণ আঁকুপাঁকু করছিল তাই করতে দিলেন না। এমনকি উপযাচক হয়ে আমি বিনীত অনুরোধ জানানোর পরও না। অর্থাৎ দীর্ঘ ৫৩ বছর পর আমার প্রাণপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশের অনুরোধটুকুও রক্ষা করলেন না। কেন? আমাদের আমলের সিনেমার বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে হয় : বাকি অংশ রূপালি পর্দায় দেখুন। আমি বুঝলাম, আমার গায়ের গন্ধ তাঁদের নাসারন্ধ্রে ঢুকে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। আমি অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে আসার সময় মনে মনে কবিগুরুকে স্মরণ করলাম : হায় বিশ্বকবি, হায় মানবতার কবি, তুমি কি আমাদের জন্য এই আদর্শই রেখে গেছ? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভাঙিয়ে যেমন আমরা যার যার আখের গোছানোতে ব্যস্ত, তেমনি তোমার কবিতা-গান-গল্প, তোমার বাণী ভাঙিয়ে আমরা উঠতে বসতে কত না অপকর্ম করি। তুমি পৃথিবী থেকে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা দূর হয়ে গিয়ে এই ধরা কলঙ্কমুক্ত করার জন্য নিত্য প্রার্থনা করে গেছ। আর তোমার সেমিনারে বক্তৃতা করতে নয়—গুণী অংশগ্রহণকারীরা হয়ত ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন বক্তৃতা করার যোগ্যতা এই নমশূদ্রের নেই, সেই অধিকার শুধু তাদেরই আছে সিলেটে, তথা এই হিংসায় উন্মত্ত বাংলাদেশে—আমি চেয়েছিলাম শুধু আমার অন্তরের শ্রদ্ধাটুকু তোমার উদ্দেশে নিবেদন করতে এবং হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা জানাতে আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান মুরারীচাঁদ কলেজকে।

ভালো কথা। ঘটনাটি সম্বন্ধে সুপ্রিয় মেয়র আরিফ বা শ্রদ্ধেয় মুহিত সাহেব অবগত নন, কারণ আরিফ অনুষ্ঠানে যাননি, আর মুহিত সাহেব অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ পরই চলে গিয়েছিলেন। তাঁরা হাজির থাকলে আমি নিশ্চিত, এমনটি হতে দিতেন না।

আর গত পরশু (০৪/১১/২০১৯) কুলাউড়ায় ঘটে গেছে এর চেয়েও চমকপ্রদ একটা ঘটনা। বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে এক্ষেত্রে বরং কিল খেয়ে কিল চুরি করাই ভাল। আমাদের সিলেট-কুলাউড়াতে বলে : ‘পানিৎ (পানিতে) ছেদ (কোপ) মারলে আটুৎ (হাঁটুতে) আইয়া (এসে) লাগে।’ কারণ এই ঘটনাটি ঘটেছে আমার জন্ম-উপজেলা কুলাউড়ায়। কী সে ঘটনা? শুনুন তা হলে। ওখানেও ৪ নভেম্বর বেশ বড় আয়োজন করে এক শ বছর আগে কবিগুরুর রাত্রিবাস (যদিও আয়োজকরা বলছেন কবির কুলাউড়া আগমন। সঠিক শিরোনাম হতে পারে : কুলাউড়ায় কবির ‘ফোর্সড নাইট হল্ট’) স্মরণ করা হয়। আয়োজকরা সবাই সরকারের একজন কৃপাধন্য সাবেক সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বে কুলাউড়ার সরকারদলীয় নেতাকর্মী। একজন শিখণ্ডীও ছিলেন বিএনপি থেকে। প্রধান অতিথি ছিলেন জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত, যিনি সিলেট থেকে কুলাউড়া যাওয়ার সময় মেয়র আরিফকে সঙ্গে নিয়ে যান। (অনেকে নাকি অনুষ্ঠানসূচী চূড়ান্তকরণের সময় আরিফকে বিশেষ অতিথি করার প্রস্তাব দিয়ে ঝাড়ি খাওয়ায় আরিফ আর আনুষ্ঠানিকভাবে অতিথি হতে পারেননি।) আর আমি? আমি সেদিন ঘটনাচক্রে সারাদিনই কুলাউড়ায় ছিলাম এবং আয়োজকরা তা জানতেন। কিন্তু...। (আবারও ‘বাকি অংশ রূপালি পর্দায় দেখুন’।) ফলে দূর থেকে অনুষ্ঠানের ‘ঘ্রাণে অর্ধভোজন’ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

উপসংহার : মাননীয় আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী গংসহ সকল শ্রদ্ধেয় নেতা-নেত্রীর উদ্দেশে সবিনয় নিবেদন : আমরা-আপনারা আর কয়দিন আছি, আমরা কি এই অপসংস্কৃতির বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? এখনো সময় আছে, শুধু লিলুয়া বাতাসে পাল তুলে তরতর করে এগিয়ে গেলেই চলবে না, শক্ত হাতে হাল-বৈঠাও ধরতে হবে। আর যেসব ফুটো দিয়ে নৌকার তলা দিয়ে পানি ঢুকছে, সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আর কীটনাশক দিয়ে ঘুণপোকা ধ্বংস না করলে কিন্তু খবর আছে।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা