kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজনীতিতে নতুন মুখ ও জাগরণ দরকার

এম হাফিজউদ্দিন খান

৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজনীতিতে নতুন মুখ ও জাগরণ দরকার

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং গণতন্ত্রচর্চা নিয়ে কিছু বলতে গেলে হতাশ না হয়ে উপায় নেই। এখন বলতে গেলে, গণতন্ত্রের চর্চা কোনো দলের মধ্যেই দেখতে পাই না। এটা যে শুধু সরকারি দলের মধ্যেই খারাপ অবস্থা, তা নয়। সার্বিকভাবে বলতে গেলে কোনো দলের মধ্যেই গণতন্ত্রের সুষ্ঠু ও সুন্দর চর্চা পরিলক্ষিত হয় না। রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় নেই। কারণ আদর্শের জায়গা থেকে তো রাজনীতি করা হয় না। এখন রাজনীতি করা হয় স্বার্থ ও ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্য আর সুবিধাজনক পক্ষপাত থেকে। কাজেই রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে বা আমার কাছে জানতে চাওয়া হলে ভালো ভালো কথা বলা কঠিন।

দেশের মান্য ও গুণী ব্যক্তিত্ব ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে, তারা তো সেভাবে কিছুই করতে পারেনি। ঐক্যফ্রন্ট একটি রাজনৈতিক জোট; কিন্তু তাদের কোনো ধরনের বড় কাজ নেই। বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়ে তারা দেশের মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড ও প্রভাব বিস্তার করে সাড়া ফেলা কিংবা আলোড়ন তোলা তো দূরে থাক, সেভাবে একটা শক্তি নিয়ে দাঁড়াতেই পারেনি। তারা যেটা করছে বা করতে পেরেছে, তা হলো—সাংবাদিকদের ডেকে সংবাদ সম্মেলন, কখনো জাতীয় প্রেস ক্লাবে বসে আলোচনা ও নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা। কিন্তু রাজপথে নেমে বড় কোনো আন্দোলন বা দাবি তারা আদায় করতে সমর্থ হয়নি। নানা ধরনের মিটিং ও আলোচনা এবং সংবাদ সম্মেলন—এসব ছোটখাটো কার্যক্রমের মধ্যেই তারা ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতিতে বিএনপি বা তাদের ঐক্যজোটের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ও সম্ভাবনা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।

যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের বাইরে বিরোধী দলের একটি বড় ভূমিকা থাকে। রাজনীতি, জাতীয় বিষয়াদি এবং সামাজিক প্রভাব থাকে। বিএনপির সেই অর্থে কোনো ভূমিকা নেই। অতীতে আমরা দেখেছি, বিরোধী দলের কী ঐতিহ্য ও দাপট ছিল। যে দলেরই সংগঠন হোক, তারা রাজপথে নেমে অনেক দাবি আদায় করে তবেই ঘরে ফিরত। এখন জাতীয় কোনো সমস্যা বা সামাজিক জরুরি বিষয়ের দাবি উত্থাপন এবং তা আদায় করার জন্য চেষ্টা ও আন্দোলন—কিছুই দেখা যায় না। সামান্য আলোচনা ও সমাবেশ হয়তো হয়; কিন্তু সেই আন্দোলন বড় কোনো কাজে ভিড়তে পারে না। সোজা কথায়, এখন বিরোধী দলের বলার মতো কোনো ভূমিকা ও প্রভাব নেই। অথচ গণতন্ত্র মানেই বিরোধী দল থাকতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার বা আন্দোলনের কথা বাদই দিলাম, সামাজিকভাবে যে একটা ভালো অবস্থান, নিজেদের মধ্যে ঐক্য এবং সাংগঠনিক চর্চা—এসবও দেখা যায় না।

অতীতে বিরোধী দলের এ ধরনের নিষ্ফলা মৌসুম আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ধরনের সংকট ও গণতন্ত্রের ঘাটতি আগে কখনো দেখা যায়নি। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখনো রাজনৈতিক ময়দানে সরকারের বাইরে সক্রিয় ও শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল। তাদের নানা ধরনের কার্যক্রম ও আন্দোলন ছিল। তারা সমাজে ও রাজপথে কঠোর অবস্থান নিয়ে নানা রকম দাবি আদায় করেছে। গণতন্ত্রের চর্চা করেছে। নব্বইয়ে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, আমরা কেউ-ই তা ভুলে যাইনি। তখন শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নয়, আলোকচিত্রী, শিল্পী, সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা রাস্তায় নেমে এবং নিজের জায়গা থেকে আন্দোলন করেছেন। নাট্যকর্মীরা পথনাটক করে আন্দোলনের অংশ হয়েছেন। এখন সেই পরিবেশ ও আন্দোলনের কোনো ইঙ্গিত বা আভাসও দেখতে পাই না। এটা খুব একটা ভালো লক্ষণ বলে আমরা মনে করতে পারি না।

রাজনীতি তার নীতি, আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে রাজনীতির জায়গায় আছে কি না—এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এখন মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। দরকারি মুহূর্তেও মানুষ কথা বলে না। প্রতিবাদ করে না। কোনো সামাজিক সমস্যা ও সংকট নিয়ে মানুষ উচ্চকিত নয়। অবাক কাণ্ড, এমন কেন হবে? এখন বলতে গেলে কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে ভালো কোনো টক শো হয় না। টক শোকে বলা যায় সাম্প্রতিক বিষয়ের ভালো ও মন্দের আয়না। দেশের কোথায় কী ঘটছে, রাষ্ট্রে কী ঘটছে, এর ভালো ও খারাপ নিয়ে কথা বলার একটি ভালো প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে টক শো। এখনো টক শো হয় টেলিভিশনে; কিন্তু তার সবই হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত। আমি একসময় নিয়মিত টক শোতে যেতাম। এখন আর সেভাবে যাওয়া হয় না। সেই পরিবেশ আর নেই, সময় ও পরিবেশ বদলে গেছে।

সরকারের বাইরে বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে আন্দোলনের হাওয়া নেই। তাদের আন্দোলন করার মন ও ইচ্ছা যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষও এখন উচ্চকিত স্বরে কথা বলতে চায় না। এখান থেকে তাহলে বোঝা যায়—মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। মানুষ নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। সোজা কথা—মানুষ ভয়ে আছে।

রাজনীতিতে এখন আদর্শ ও নীতির চর্চা খুবই কম। প্রায় নেই বললেই ভালো বলা হয়। এখন রাজনৈতিক চর্চার চেয়ে স্বার্থ ও সুবিধার রাজনীতি বেশি। রাজনীতিটা দৃশ্যমান আছে, তবে সেটা ফাঁকা বাক্সর মতো। ভেতরে শূন্য। বর্তমান রাজনীতির হালহকিকত বুঝতে হলে আমরা ক্যাসিনো কাণ্ডগুলোর দিকে চোখ রাখতে পারি। ক্যাসিনোর যে গল্প ও অভিযান, এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির ভেতরের কথা অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। দুর্নীতি ও স্বার্থের কারণে রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। এটা একেবারে নিচে থেকে শুরু করে ওপর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এর থেকে শিগগিরই বেরিয়ে আসা অতটা সহজ বলে মনে হয় না।

ঐক্যফ্রন্ট তো সেভাবে দাঁড়াতে পারছে না। সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। কাজেই রাজনীতিতে এখন নতুন মুখ ও গণজাগরণ দরকার। এর বাইরে আশার আলো সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। এখন এখানে অনেক ধরনের সমস্যা ও সংকট চলছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ তো পাওয়া যাচ্ছে না। আইনের শাসন ঠিকমতো না হলে মানুষ হতাশ হয়। সমাজে নানা ধরনের খুন, ধর্ষণ, হত্যা ও সমস্যা চলছেই। এসব সমস্যার জন্য তো এককভাবে কাউকে দোষী করা যায় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যেটা দরকার—আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো কিছু করা সম্ভব। মানুষ সেদিকেই তাকিয়ে আছে।

এখন একমুখী শাসন ও সরকারব্যবস্থা চলছে। দেশের নানা ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে। মানুষ ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। অনেকে বলছেন, বড় প্রজেক্টেই শুধু সরকারের আগ্রহ। ছোট ও জরুরি বিষয়ে সরকারের আগ্রহ বা মনোযোগ কম। কোনো কাজই নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। এটাও আরেক বিড়ম্বনা। কারণ এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে হয়তো জবাবদিহির ব্যাপার নেই। কোন প্রজেক্ট কী কারণে দেরি হচ্ছে, খরচ কেন বেড়ে যাচ্ছে? তদন্ত হয় কি? তদন্ত না হলে সংশোধনও হয় না।

আমি যেটা বলব, বিশাল বিশাল যে প্রজেক্ট হচ্ছে, তাতে পরিকল্পনারও ঘাটতি আছে। এখানে কস্ট ও বেনিফিট নিয়ে ভাবা হয় না। অমুক প্রজেক্টে এত টাকা খরচ হচ্ছে, কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর কতখানি উপকার পাওয়া যাবে। কোন কাজটি আগে করা জরুরি? সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুবিধার জন্য হাসপাতালের উন্নয়ন আগে করা দরকার, নাকি রূপপুর প্রকল্প—এসব বিষয়ে ভালো করে গবেষণার দরকার আছে বলে মনে করি।

সব শেষে যেটা বলা যেতে পারে—সমাজে ও রাজনীতিতে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন দরকার। সে জন্য করণীয় হচ্ছে, স্বার্থের জন্য বা কোনো ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে রাজনীতি করবে না—এমন ধরনের মানুষ দরকার। সে রকম নতুন মুখও তো দেখা যাচ্ছে না। ঐক্যফ্রন্ট ভালো কিছু করতে পারবে—সে রকম সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তারা তো সেভাবে দাঁড়াতেই পারল না। এখন সরকারের বাইরে বিএনপি ছাড়া আর বড় কোনো দলও দেখছি না। এখনো বিএনপির জন্যই বলা যায়, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিতভাবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পারলে ভালো কিছু সম্ভব হতে পারে। এর বাইরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা