kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্ষমতার প্রশ্রয়ে তারুণ্যের বিভ্রান্তি

গোলাম কবির

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্ষমতার প্রশ্রয়ে তারুণ্যের বিভ্রান্তি

সব ধর্মে এবং নীতি-কেতাবে নিজেকে চেনার কথা বলা হয়েছে। নিজের বাইরে ও ভেতরের নানাবিধ বিচ্যুতি সহসা আমাদের সচকিত করে না। বয়স ও ক্ষমতার দাপট আমাদের সব ভুলিয়ে দেয়। কার কত বড় সাহস যে আমাদের বিচ্যুতি চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে কোপানলে পতিত হবে! এই যে আদর্শহীন কিছু তরুণ ক্ষমতার পায়া ধরে সর্বত্রই অনাসৃষ্টিতে লিপ্ত হচ্ছে, তার ক্ষত সারাবে কে? সারাবে নিরাসক্ত দেশপ্রেমিক ক্ষমতাধিপতি। আমরা এমনি বামন যে চাঁদের দিকে তাকানোর অভিলাষ থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। তাই যদি হয় তবে দেশের, সমাজের গতি কী হবে!

আজকের সমাজের নানাবিধ অপকর্ম আমাদের বিচলিত করছে। আমরা আমাদের সময়কে দোষারোপ করছি। এটা চিরকালেরই রীতি। মহাভারতে তখনকার সমাজের রাজরাজড়াদের যে খণ্ডিত চিত্র আছে, তার সব সুখকর বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের ‘গান্ধারীর আবেদন’ পড়লে তার কিছুটা আঁচ করা যাবে, ধৃতরাষ্ট্রের অনাচারকে কিভাবে সেখানে দেখানো হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেরকালের তরুণদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেননি। বলেছেন, তরুণরা একটা বিশেষ বয়সে নিজের কিংবা জগতের অন্তঃ পায় না। তাই তাদের মধ্যে অঘটনের প্রবণতা। এই প্রবণতা ‘বালির বাঁধ’ দিয়ে রোধ করা যায় না। তলস্তয় নিজের জীবনের যে যৌবন উন্মাদনার কথা বলেছেন, তাতে হানাহানি নেই। তবে যা আছে তা কিন্তু নির্জলা সুশীল নয়। ইমরুল কায়েস তাঁর মোয়াল্লাকায় যে নাহরে জুলজুলের দৃশ্যেব অবতারণ করেছেন, তা শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কিংবা ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের সমগোত্রীয়, অনেক ক্ষেত্রে হার মানায়।

স্কুল-কলেজের শিক্ষককে পিতৃতুল্য ভাবা হয়েছে সমাজসচেতনতার পুরাতন কাল থেকে। এখন শিক্ষকদের অনেকে ভাইয়ার পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে নিভৃতে থাকার সুযোগ পেয়ে প্রণয়ের ছদ্মবেশে রিরংসিত চেতনার বাস্তবায়ন বেশি হয়। ফলে অনাচার দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তা ছাড়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ের কিছু ব্যক্তি, যারা বিবেকের ভারসাম্য রক্ষা করতে কিংবা নিজেদের পিতা হিসেবে ভাবতে অসমর্থ, তারা অতি আধুনিকতার নামাবলি প্রচার করে কন্যা শিক্ষার্থীকে অঙ্কশায়িনী করতে দ্বিধা করে না। এসব দেখে তরুণরা কী শিখবে! এখানেই শেষ নয়, অনেক শিক্ষক ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য শিক্ষার্থীদের অপব্যবহার করে, তারা ন্যায়নীতি সম্পর্কে নির্লিপ্ত। গলদের সূচনা কি এখান থেকে নয়? আর যারা পরকালের অনন্ত সুখের বিশ্বাস শিক্ষার্থীদের চেতনায় প্রোথিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের কেউ কেউ যখন বয়সের বাছবিচার না করে পাশবিক আচরণে উদ্যত হয়, তখন তাদের কী পরিচয়ে পরিচিত করা যায়! এদের পরকালের ভয়-নির্লিপ্ততা দেখে সমাজের তরুণরা সংযম শিখবে কোথায়?

আমাদের সন্তানরা উচ্ছন্নে গেল বলে আমরা সাধু বেশে উপদেশ খয়রাত করতে বসছি। আমরা নিজেদের দিকে তাকাই না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এ ব্যাপারে কারো ওপর দোষারোপ করা বৃথা। কারণ এটা হলো, ‘এ আমার এ তোমার পাপ’! অর্থাৎ আমরা অপকর্ম করেই তরুণদের অবিমৃশ্যকারিতায় প্রলুব্ধ করছি। এতে কোনো কোনো সময় আপতক্ষমতার ভিত দৃঢ় করার জন্য অপকর্মকারীর রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করছি। আর অর্থের হাতছানিতে সংশ্লিষ্টদের উকিল নামে কথিত কিছু ব্যক্তি অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে। এতসব বিবেকহীনতা দিয়ে সমাজবিনষ্ট রোধ করা কঠিন।

আমরা যদি পারিপার্শ্বিকের গুঞ্জন কান পেতে শুনি তবে নিজেদের শুধরাতে সময় লাগে না। ‘তার চেনার আলোক’ অর্থ হলো মানুষ কিভাবে ব্যক্তিকে চিনছে, তাই দিয়েই ক্ষমতাধরের মূল্যায়ন। স্তাবকের দল সামান্য মাংসখণ্ডের জন্য লেজ নাড়ে, প্রশংসার ঝড় তোলে, আর আমরা তাতেই মত্ত হয়ে অপকর্মকারীর সহযোগিতায় গা ভাসাই, তখন সর্বত্রই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মাৎস্যন্যায়। ইতিহাস এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় বারবার। নিকট-অতীতে ক্ষমতার প্রশ্রয়ে তারুণ্যের বিভ্রান্তি দেখেছি। আমরা শিক্ষা নিই না। আইনকে যদি তার সোজা পথে চলতে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হতো, তবে এত সব নৈরাজ্য দেখে আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে পড়ত না।

মানবসমাজ আর মানবমুক্তি যদি আমাদের কাম্য হয়, তবে পারিপার্শ্বিকের চেনার আলোকে নিজেকে কঠিন-কোমলরূপে প্রতিভাত করতে হবে। উপদেশের কোমল বাণী আর শাসনের কঠিন শৃঙ্খলের আগে নিজের কর্মকৃতী এমন হওয়া উচিত, যাতে কথা আর কাজে ফারাক না থাকে, তবেই সমাজজীবনে পরিশুদ্ধির সন্ধান মিলবে। নতুবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। দুখের বিষয়, ইতিহাসের পাঠ ক্ষমতাধররা গ্রহণ করে না।

লেখক: সাবেক শিক্ষক

রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা