kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শামসুর রাহমানের কবিত্ব

ড. এম আবদুল আলীম

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শামসুর রাহমানের কবিত্ব

শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) কবিত্ব নিয়ে কথা বলতে গেলে মনে পড়ে আদিকবি বাল্মীকির সেই অমর শ্লোক, ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।/যৎ ক্রৌঞ্চ মিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্’-এর প্রসঙ্গ। মহামুনি বাল্মীকি তাঁর শিষ্য ভরদ্বাজকে সঙ্গে নিয়ে তমসা-তীর্থে স্নানে যাওয়ার পথে তীরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চের পাশে স্ত্রী ক্রৌঞ্চের বিলাপ দেখে বেদনাবিহ্বলচিত্তে উপর্যুক্ত শ্লোক উচ্চারণ করেছিলেন। শামসুর রাহমানও একইভাবে দুই বছর বয়সী ছোট্ট বোন নেহারের আকস্মিক মৃত্যুতে তার নিথর দেহ দেখে বেদনমথিতচিত্তে সাদা কাগজের বুকে ঝরিয়ে দিয়েছিলেন ব্যথার শব্দমালা। সত্যেন্দ্রনাথের ‘ছিন্ন মুকুল’ কবিতার প্রভাব তাতে থাকলেও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক তরুণ সেদিন অকালপ্রয়াত বোনকে স্মরণ করে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আমি লিখবই।’ আর তখনই তাঁর কবিত্ব মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলেছিল বাংলা কাব্যের আকাশে। না, এখানেই শুরু নয়, আরো পেছনে যেতে হবে। শিশু শামসুর রাহমানের মন পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে উড়ে বেরিয়েছে মাহুতটুলী থেকে পুরান ঢাকার অলিগলিতে। ঐতিহ্যবাহী ঢাকার নবাব-বাহাদুরদের পুরনো আস্তানা থেকে ঢাকাই সর্দারদের যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছেন। মূলত ঐতিহ্যবাহী ঢাকা নগরীর বিচিত্র অনুষঙ্গ থেকেই তিনি সংগ্রহ করেছেন কবিত্বের রসদ। বাড়ির বয়স্করা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির গল্প শুনিয়ে তাঁর কল্পনার জগেক প্রসারিত করেছেন। স্কুলশিক্ষক বিনয়বাবুর কাছ থেকে পেয়েছেন ‘রামায়ণ’-‘মহাভারতে’র গল্পের বিচিত্র বিবরণ। শুধু কি তাই? তাঁর মাধ্যমেই শামসুর রাহমান পেয়েছিলেন ‘শিশুসাথী’ পত্রিকা, যা তাঁর শিশুমনে সাহিত্যের বীজ অঙ্কুরিত করেছিল।

১৯৪৩ সালের মন্বন্তর কিশোর শামসুর রাহমানের চিত্তজগতে শক্ত ঝাঁকুনি দিয়েছিল। আকালের ছবি, আকালের কঙ্কাল, ভুখা মানুষের মুখ, কঙ্কালসার মানুষের আর্তচিৎকার, তাদের কোটরগত চোখ—এসব তাঁর অনুভূতিকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল। আকাল নিয়ে তিনি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। নবম শ্রেণিতে উঠে লিখলেন ‘এক টুকরো কয়লার আত্মকাহিনী’। ১৯৪৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ হাতে পেয়ে তাঁর প্রতিভার রাজপুত্র যেন বল্গাহীন ঘোড়ার মতো যাত্রা শুরু করে। কেমন ছিল সেই ‘গল্পগুচ্ছ’ পাঠের অনুভূতি? শোনা যাক তাঁর নিজের কাছেই : “কোনো দিন ভুলব না উনিশ শ পঁয়তাল্লিশের সেই বিকেলের কথা। ঘুম-ভাঙা চোখে দেখলাম একফালি রোদ এসে পড়েছে আমার ঘরে। যেন রূপকথার দেশ থেকে এসেছে এই রোদ—এত মধুর, এত রূপসী। সারা মন গুনগুনিয়ে উঠল রোদের সোনালি তারের সাড়া পেয়ে। রোদ থেকে চোখ স’রে আসতেই দেখলাম, বিছানায় পড়ে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’। দ্বিতীয় খণ্ড।...আমি যেন স্বর্গের এমন এক বাগানে পৌঁছে গেলাম, যার প্রতিটি গাছ সুন্দর, প্রতিটি ফুল অনন্য।” ‘গল্পগুচ্ছ’ পাঠের পর তাঁর পড়ার ক্ষুধা আরো বেড়ে গেল। ছুটলেন বইয়ের সন্ধানে। একদিন হাজির হলেন পাটুয়াটুলীর রামমোহন লাইব্রেরিতে। এরপর শুরু হলো পড়া আর পড়া; ‘রবীন্দ্র-রচনাবলি’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বসুমতী’সহ নানা পত্রিকা আর দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্বের নানা বই।

এরই মধ্যে সাতচল্লিশে দেশভাগ হয়ে গেছে। নতুন উদ্দীপনায় জেগে উঠেছে ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গন। তাঁর প্রথম কবিতা ‘১৯৪৯’ প্রকাশিত হয় নলিনীকিশোর গুহের সোনার বাংলা পত্রিকায়। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, হাসান হাফিজুর রহমান, শহীদ কাদরীসহ অনেক কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধন। বিভিন্ন পত্রিকায় একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা কবিতা, সম্পাদকীয় কিংবা উপসম্পাদকীয়। সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক, মজলুম আদিব প্রভৃতি ছদ্মনাম তিনি ব্যবহার করতে থাকেন। বিষয়বৈচিত্র্য, ভাবের গভীরতা, দেশি-বিদেশি সাহিত্য-পুরাণের ব্যবহারে এবং শৈল্পিক পরিমিতিবোধে তাঁর কবিতা হয়ে উঠতে থাকে অনন্য। স্বাধিকার চেতনা, স্বাজাত্যবোধ, নাগরিক জীবনের চালচিত্র, ঐতিহ্য অন্বেষা, সমকালীন যুগচৈতন্য এবং মানবহূদয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ তাঁর কবিতার বিষয়বৈভবকে করে পরিপুষ্ট। যুগচিত্রকে ধারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘উনিশ শ বিয়াল্লিশ, তেতাল্লিশ দুর্ভিক্ষের ছায়া,/ব্যক্তিগত নানাবিধ ক্ষুধা,/এবং দ্বিতীয় বিশ্ব সমরকালীন ঝিকমিক মালুম ইত্যাদি শব্দাবলি;...।/এবং হিরোশিমার নিদারুণ লণ্ড-ভণ্ড ল্যান্ডস্কেপ, দ্বি-খণ্ডিত বঙ্গ,/সংখ্যাহীন উদ্বাস্তের মুখ...।’ যুগের এই জটিল আবহ তাঁর সংবেদনশীল কবিমনকে বেদনাবিদ্ধ করে। নাগরিক জীবনের জটিলতা দেখে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘শহর প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী ঝড়ের সাথে।’ যুগের জটিল রূপ অবলোকন করে তিনি লেখেন, ‘বাঘ-ভালুকের ভয় নেই, বিষাক্ত সাপের চেয়ে/ঢের বেশি বিষধর মানুষ এখানে।/... অসহায় মানবতা/কাঁটার মুকুট পড়ে নুয়ে থাকে ক্রুশ কাঁধে নিয়ে;/অনেক হূদয়ে আজ আঞ্ছিত গোলাপ দিগ্বিদিক।’    

শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্য ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, চারটি উপন্যাসসহ নাটক-প্রবন্ধ-আত্মস্মৃতি-অনুবাদসহ নানা গ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো, ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩), ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ (১৯৬৭), ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ (১৯৬৮), ‘নিজ বাসভূমে’ (১৯৭০), ‘বন্দি শিবির থেকে’ (১৯৭২), ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’ (১৯৭৩), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ (১৯৭৪), ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’ (১৯৭৪), ‘এক ধরনের অহংকার’ (১৯৭৫), ‘আমি অনাহারী’ (১৯৭৬), ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’ (১৯৭৭), ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে’ (১৯৭৭), ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’ (১৯৭৮), ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৮১), ‘ইকারুসের আকাশ’ (১৯৮২), ‘মাতাল ঋত্বিক’ (১৯৮২), ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ (১৯৮৩), ‘কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি’ (১৯৮৩), ‘নরকের ছায়া’ (১৯৮৩), ‘আমার কোন তাড়া নেই’ (১৯৮৪), ‘যে অন্ধ সুন্দরী কান্দে’ (১৯৮৪) প্রভৃতি। শামসুর রাহমানের কবিতায় রাজনৈতিক অনুষঙ্গ অতিমাত্রায় থাকলেও তাঁর শিল্পকুশলতা ঈর্ষণীয়। কবিতার শব্দব্যবহার, ছন্দবৈচিত্র্য এবং অলংকারনৈপুণ্যে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। দেশীয় শিল্পনন্দনের পাশাপাশি তাঁর কবিসত্তা হানা দিয়েছে ইউরোপীয় দর্শন ও নন্দনতত্ত্বের জগতে।

চর্যাপদ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা গীতিকবিতার যে দীর্ঘ পথপরিক্রমা এবং ত্রিশোত্তর কবিদের থেকে এর যে আলাদা বাঁক-বদল ও চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের শিল্পবাস্তবতায় শামসুর রাহমান স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। সর্বোপরি বাংলাদেশের কবিতায় আপন কবিত্বের বলেই শামসুর রাহমান নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতা পাঠককে যেমন স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি শিল্পরসিকের বোধের জগেকও করে পরিশীলিত। সমকালীন কবিরা যেমন তাঁর প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারেননি, তেমনি উত্তরসূরিদের অনেকেই শিরোধার্য করেছেন তাঁর প্রভাবকে। এখানেই তাঁর কবিত্বের গৌরব। সাহিত্য-সাধনার জন্য লাভ করেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। এই পুরস্কার-সম্মাননাতেই শুধু তাঁর কবিত্বের ঐশ্বর্য নয়, চিরকালের রসিকজন করবে এর বন্দনা। 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা