kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহর নতুন ধারার রাজনীতি

জয়ন্ত ঘোষাল

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহর নতুন ধারার রাজনীতি

চল্লিশ দিন টানা চলার পর শেষ হয়েছে অযোধ্যার বিতর্কিত জমির মামলার শুনানি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেরোতে পারে রায়। অযোধ্যায় মন্দির হবে, না মসজিদ হবে, নাকি পৃথক পৃথক জমিতে কাছাকাছি দুটিই সম্ভব? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য গোটা দেশ এখন তাকিয়ে আছে। আবার লখনউ-এর আদালতেও চলছে আরেক মামলা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে অভিযুক্তদের শাস্তির মামলা।

এসবের মধ্যেই দেখছি দেশজুড়ে, বিশেষত উত্তর প্রদেশের সাধুসন্ত তথা সংঘ পরিবার, বিজেপি সমর্থক, হিন্দুত্ববাদী রামভক্ত জনসমাজ এই আশায় বসে আছে যে সুপ্রিম কোর্ট রামমন্দির নির্মাণের পক্ষেই রায় দিতে চলেছেন। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য রাজস্থান ও গুজরাট থেকে পাথর আনা শুরু হয়েছে। করসেবকপুরামে এক মডেল রামমন্দির নির্মাণ হয়ে গেছে। অযোধ্যার কাছেই এ এলাকায় কাতারে কাতারে মানুষ আসছে এই মন্দির দেখার জন্য। সরযূ নদীর তীরে এই অযোধ্যার নাম একদা ছিল কৌশল দেশ। হিন্দু বিশ্বাস, এখানেই রামচন্দ্রের জন্মভূমি। রামচরিত মানসে তুলসীদাস সে কথা লিখে গেছেন। কিন্তু সে কলিযুগের কথা নয়, ত্রেতা যুগের কথা। আরো বলা হয়েছে, ১৫২৮ সালে এই স্থানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বিতর্ক নিয়ে মামলা তো বহু প্রাচীন। ১৮৮৫ সালে এ মামলা আদালতে যায়। ২০০৯ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টে তার রায়ে এই এলাকাকে তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ হিন্দুদের, অন্য ভাগ মুসলিমদের দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এই রায় সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হলে শীর্ষ আদালত এলাহাবাদের রায় খারিজ করে দেয় ২০১১ সালে।

বাবরি মসজিদ ভাঙার পর নরসিমা রাও সরকার ফের এই বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, বিজেপি এবং কংগ্রেসের বিতর্ক এড়ানোর জন্য নরসিমা রাও সুপ্রিম কোর্টের কাঁধে বন্দুক রেখে সময় অতিবাহিত করে রাজনৈতিক উত্তাপ কমাতে চেয়েছিলেন। তবে রাও এই সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ছিলেন না।

এত বছর পর নরেন্দ্র মোদি জামানায় তফাত একটাই। সুপ্রিম কোর্টের ওপর চাপ দিয়ে সরকারপক্ষ বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চাইছে। কংগ্রেস নেতা ভি এন গ্যাডগিল আমাকে একবার বলেছিলেন, কংগ্রেসের সাবেকি রণকৌশল হলো ‘ঠাণ্ডা করকে খাও’। একটা মজার উদাহরণ দিয়েছিলেন গ্যাডগিল। তিনি বলেছিলেন, আমরা মারাঠিরা কিভাবে গরম চা খাই, দেখেছ? খুব গরম চা সরাসরি খেতে গেলে জিব পুড়ে যায়। তাই চা-টা প্লেটে ঢেলে ধীরে ধীরে সুপ-সুপ শব্দ করে খাই। অযোধ্যা ইস্যুতেও কংগ্রেস এই কৌশল নেয়। মোদি জামানায় প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা এ জন্য কয়েক শ গুণ বেশি যে বিজেপির দর্শন, বিজেপির যে কর্মসূচি তা কার্যকর করতে মোদি-অমিত শাহ দুজনেই বদ্ধপরিকর। দেখুন, ৩৭০ ধারা অবলুপ্ত করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে। মনে হতে পারে এ সিদ্ধান্ত ভুল। মনে হতে পারে মোদি-অমিত শাহ এর ফলে বড্ড ঝুঁকি নিয়েছেন। মনে হতে পারে, এর ফলে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবোধ আরো তীব্র হয়ে উঠবে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে এই যে ৩৭০ ধারার বিলোপ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং রামমন্দির নির্মাণ—এগুলো মোদি আর অমিত শাহর সৃষ্ট কোনো আকস্মিক ইস্যু নয়। এ তো আরএসএস জনসংঘের আমল থেকে দলের প্রধান তিনটি কোর মতাদর্শগত ইস্যু। তাহলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি যখন দু-দুবার ভোট জিতল, তারপর দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারের কর্মসূচির বাস্তবায়ন, এ তো মোদি-অমিত শাহর প্রতিশ্রুতি পূরণ। অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। এনডিএ সরকার এবং শরিক দলগুলোর মতাদর্শগত অবস্থানও আলাদা ছিল। তাই পদে পদে শরিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হতো বাজপেয়িকে। তার মানে এটা ভাবার কারণ নেই যে বাজপেয়ির মতাদর্শ অন্য কোনো মতাদর্শ ছিল।

অনেকে বলেন, গোধরা কাণ্ডের পর মোদির ওপর বাজপেয়ি বেদম ক্ষুব্ধ হন। তিনি চেয়েছিলেন মোদি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিন। আদভানির তীব্র আপত্তিতে মোদিকে সরাতে বাজপেয়ি সক্ষম হননি। ওই সময়ে কী হয়েছিল, আমি তার সাক্ষী। বিজেপির কর্মসমিতির বৈঠক। বৈঠকে মোদির ইস্তফা চেয়ে একটা অংশ সক্রিয়। এই গোষ্ঠীতে যশোবন্ত সিংহ এবং বাজপেয়ি-ঘনিষ্ঠ বেশ কিছু নেতা ছিলেন। বৈঠক শুরুর দিন সকালবেলা সব টিভি চ্যানেলে খবর চলছিল, চন্দ্রবাবু নাইডুর দাবি, গোধরা কাণ্ডের জন্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা দিন। মুখ্যমন্ত্রীর সেই জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকটি হচ্ছিল বেঙ্গালুরুতে। হোটেলের ঘরে সবে ঘুম থেকে উঠে টিভি দেখছি। চন্দ্রবাবুর দাবি, এদিকে বিজেপির মোদিবিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয়। ফোন করলাম আদভানিকে। সাতসকালে। তখন মোবাইল ছিল না। হোটেলের ল্যান্ডলাইন থেকে আদভানির হোটেলের ঘরের ল্যান্ডলাইনে। আদভানি শুধু দুটি কথা আগাম বলেছিলেন। প্রথমত, মোদির ইস্তফার কোনো প্রশ্নই উঠছে না। দ্বিতীয়ত, দলের অবস্থান এটাই। কোনো পার্থক্য নেই। বিকেল ৩টার সময় জেনা কৃষ্ণমূর্তি সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করে এ কথা তোমাদের জানিয়ে দেবে। সেদিন আমার রুমমেট ছিল সতীর্থ সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ি। ও পাশের খাটে ঘুমাচ্ছিল। এই কথোপকথনে ওর ঘুম ভেঙে গেল। বলল, আরে এর মানে তো মোদি থাকছেন। আমরা খবরের কাগজে কাজ করতাম দুজনে। তাই তখনই খবরটা ধরানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। তা ছাড়া আদভানি বললেও আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর দেখলাম, জেনা কৃষ্ণমূর্তি সত্যি সত্যি ঘোষণা করলেন যে মোদি ইস্তফা দেওয়ার সংবাদ অসত্য। অমূলক। তাহলে সেদিন বৈঠকে বাজপেয়ি নীরব ছিলেন কেন?

রাম জন্মভূমি আন্দোলন নিয়ে দলের কর্মসমিতির বৈঠকে হিমাচল প্রদেশে বাজপেয়ি প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু দল রামমন্দির আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে, সেই আন্দোলন বিজেপিকে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে আসে এবং জোট সরকারের সর্বসম্মত চরিত্র বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হন। আর একটা ঘটনা মনে পড়ছে। গোধরার পর বাজপেয়ি মোদিকে ডেকে পাঠান। দীর্ঘ বৈঠক হয় প্রধানমন্ত্রীর নিবাসে। তারপর সেদিনই মোদি বৈঠক করে আহমেদাবাদ চলে যান। বৈঠকের পরই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে চ্যানেলে-চ্যানেলে খবর হয় বাজপেয়ি ক্ষুব্ধ। মোদিকে তিনি ইস্তফা দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন দপ্তরের কেউ আমাদের এ খবর জানান যে বাজপেয়ি ক্ষুব্ধ। আমরা বলতাম, বাজপেয়ির স্পিন ডক্টর। সেদিন সন্ধ্যায় মোদিকে ফোন করলাম আমেদাবাদে। তিনি অবাক হয়ে যান এ খবর শুনে। কারণ বাজপেয়ি কখনোই তাঁকে আসলে এ ধরনের কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি।

সময়টা বদলে গেছে। এখন মোদি ও বিজেপির প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। শুধু তা-ই নয়, এই গুরু-শিষ্যের মধ্যে কিন্তু একটা ‘কারেজ অব কনভিকশন’ আছে। মোদি যা মনে করেন তা-ই করেন। একটা মত আছে, এভাবে স্টিমরোলার দিয়ে মতামত চাপানোর চেষ্টা গোটা দেশের ওপর, এটা গণতন্ত্রের নৈরাজ্য। মোদি দেশের আর্থিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার না দিয়ে কাশ্মীর বা অযোধ্যা, হিন্দুত্ব বা পাকসন্ত্রাসের বিষয় নিয়েই ব্যস্ত। এর ফলে কী হচ্ছে? এর ফলে দেশের অগ্রগতি হচ্ছে না। দেশের মানুষকে হিন্দুত্বের অ্যাড্রিনালিন দেওয়া হচ্ছে। চিরকাল এভাবে চলতে পারে না। অদূর ভবিষ্যতে একদিন না একদিন এই কৃত্রিম কর্তৃত্বের সৌধ তাসের ঘরের মতোই ভেঙে লুটিয়ে পড়বে।

গণতন্ত্রে ভিন্নমতের পরিসর আছে কিন্তু এখানে আমার প্রশ্ন হলো, রাজনীতিতে বিরোধী পরিসর থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু সেই বিরোধী পরিসর কোথায়? রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস প্রধান প্রতিপক্ষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মহারাষ্ট্র হরিয়ানায় বিধানসভা নির্বাচনেও তো কংগ্রেসের মতো বিরোধী শক্তিকে খুঁজেই পাচ্ছি না।

উল্টো যদি সত্যি সত্যিই সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতায় মোদি জামানায় অযোধ্যার মতো বিতর্কের অবসান হয়, তবে তার জন্য মোদিকেই তো অভিবাদন দিতে হবে। অনেকে বলতে চাইছেন, এ এক নতুন মিডিয়া যুগ। নতুন মিডিয়া-সংস্কৃতি, সিটিজেন সাংবাদিকতা হচ্ছে। মোবাইলে ছবি উঠছে। টুইট। হোয়াটসঅ্যাপ। সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্য। বিরোধীরা বলছেন, মোদি এই পরিকাঠামোকে কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু এ তো গোটা দুনিয়ারই এক নতুন প্রক্রিয়া। এর সুযোগ তো রাহুল গান্ধী, কেজরিওয়ালসহ সব বিরোধী নেতারও পাওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ফৈজাবাদে গিয়েছিলেন মোদি। সে জেলার নাম তখনো অযোধ্যা হয়নি। তবে সে দফায় রামলালা দর্শন করেননি মোদি। এবার ভোটের আগেও অযোধ্যার বিতর্কিত স্থলের ধারেকাছে ঘেঁষেননি তিনি। ত্রিশ কিলোমিটার দূরে জনসভা করে ফিরে এসেছেন। দুবার জয় শ্রীরাম ধ্বনি তুলেছেন। কিন্তু মন্দির নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। বিজেপি ও স্থানীয় সাধুসন্তদের প্রত্যাশা, রামমন্দির নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজ করবেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।

সব মিলিয়ে মোদি-অমিত শাহর রাজনীতির কলাকৈবল্যটা বুঝতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে একটা সূত্র আছে মোদি জামানায়। সেটা না বুঝলে প্রতিপক্ষের পক্ষেও সম্ভব হবে না এই কর্তৃত্বের মোকাবেলায়।

 

লেখক: নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা