kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাবার খোঁজে

এম এ মোমেন

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাবার খোঁজে

‘যদি টাইম মেশিনে সময়ের ভেতর দিয়ে সফর করতে পারতাম আমি, তাহলে ১৯৪৬ সালে ফিরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাবাকে খুঁজে বের করে তাঁকে একটি কনডম দিতাম।’

জন্মনিরোধকটির নাম উচ্চারণের কারণে বন্ধনীভুক্ত বাক্যটিতে কিঞ্চিৎ অশ্লীলতা কেউ কেউ আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে পারেন; কিন্তু যখন জানবেন উদ্ধৃতিটি আমার তো নয়ই, যেনতেন অন্য কোনো লেখক বা সাংবাদিকেরও নয়, বরং জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা, সে দেশের ফাউন্ডার ফাদার এবং টানা ৩৭ বছরের একচ্ছত্র শাসক সদ্য প্রয়াত রবার্ট মুগাবের, এটি তখন বেশ গুরুত্ব পাবে। প্রায় সবাই বলবেন, মুগাবে তো ঠিকই বলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম না হলেও ভালো হতো।

১৯৪৬ সালে রবার্ট মুগাবের বয়স ২২ বছর আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাবা ফ্রেডরিক ক্রাইস্ট ট্রাম্পের তখন ৪১ বছর। সে সময় দারিদ্র্যপীড়িত মুগাবে পড়াশোনাও করছেন আবার জাম্বিয়া ও ঘানার স্কুলেও পড়াচ্ছেন। সে সময় তিনিও ভাবেননি বিংশ-একবিংশ শতকের দীর্ঘ সময়ের পরাক্রান্ত শাসকদের একজন হবেন। আর ফ্রেডরিক ট্রাম্প যদি সদ্যোজাত ছেলেকে নিয়ে ভেবেও থাকেন তার জন্য রিয়েল এস্টেট ব্যবসাই নিয়তি নির্ধারিত বলে ধরে রেখেছেন।

মুগাবে যে জন্মনিরোধক সরবরাহের কথা বলেছেন, সে বছর তা আদৌ পাওয়া যেত কি না, যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। সরল জবাব পাওয়া যেত। খ্রিস্ট জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগেকার প্যাপিরাসে এই জন্মনিরোধকের বর্ণনা রয়েছে। ষোলো শতকে মৃত জীবজন্তুর মূত্রথলি ও অন্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি হয়। কারণ এগুলো দিয়েই সেই বিশেষ জন্মনিরোধক তৈরি হতে থাকে। কাজেই এর প্রাপ্যতা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কোনো কারণ নেই। রবার্ট মুগাবে সময়ের হিসাবে সামান্য ভুল করেছেন। ডোনাল্ডের মা তো আর সুপারসনিক গতিতে বেড়ে ওঠা সন্তান ধারণ করেননি যে পাঁচ মাস না যেতেই ছেলেটি ভূমিষ্ঠ হবে। দ্রব্যটি সিনিয়র ট্রাম্পের কাছে ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে পৌঁছাতে পারলে হয়তো পৃথিবী এমন একটি দানব দর্শন থেকে রেহাই পেত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনের দিন আগে বা পরে নয়, ভোট দিয়ে মার্কিনরা যখন তাঁকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে ফেলল—একজন সাদা মার্কিন কবি লিখলেন :

 

একটা কিছু গোলমাল হয়ে গেছে

আমি আবহাওয়া থেকে বুঝতে পারছি

আমার প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে ঢুকছে ৫ শতাংশ অক্সিজেন

আর ৯৫ শতাংশ আতঙ্ক।

 

অন্য একজন কবি লিখলেন :

 

যে বল বাউন্স করে আমার চোখে লাগতে পারে

আমি সে বলকে ভয় পাই

টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসা সাপকে আমি ভয় পাই

আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভক্তদের

ভয় পাই।

 

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, পুলিত্জার বিজয়ী লেখক, বেস্ট সেলিং লেখকসহ ৬০০ বুদ্ধিজীবী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ওলে সোয়েংকা ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে মুহূর্তে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করবে আমি আমার গ্রিন কার্ড ছিঁড়ে ফেলব এবং স্যুটকেস গোছাতে শুরু করব।

ডোনাল্ড শুধু জেতেননি, বুদ্ধিজীবীরা যা-ই বলুন, দ্বিতীয়বারও যে তিনি আসি আসি করছেন। কিন্তু ওলে সোয়েংকা কি গ্রিন কার্ড ছিঁড়েছেন?

না, ছিঁড়েননি। আঙুলে টেনে কার্ডটি ছেঁড়া মুশকিল। তিনি তাঁর কার্ডটিকে অকার্যকর করে ট্রাম্পের দেশ ছেড়েছেন। ওলে সোয়েংকা তো আর বাংলাদেশের সেই বুদ্ধিজীবী নন, যিনি বলবেন, থুক্কু, আপনারা কি মসকরাও বোঝেন না? আমি তো ট্রাম্পেরই দলদাস।

ওলে সোয়েংকা এখন আফ্রিকায়।

এমন অপমানের পরও ট্রাম্প স্থির থাকছেন কেমন করে? তাঁর কি ইগো বলে কিছু নেই? এফবিআইকে দিয়ে গুম করিয়ে ফেললে পারতেন না? ওলে সোয়েংকা গুম!

ট্রাম্পের ইগো একটি নতুন মাত্রায় নতুন শব্দে ভূষিত হয়েছে—ট্রাম্পিগো। মানে ট্রাম্পের ইগো। এখানে হাল বুদ্ধিজীবী কিংবা সাবেক বারবনিতা তাঁর ইগোতে তেমন ঘা দিতে পারেন না। কারণ তাঁর ইগো মনুষ্য ঈর্ষার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে।

প্রশ্ন : ট্রাম্প এবং ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

এক জায়গায়ই—ঈশ্বর নিজেকে ট্রাম্প মনে করেন না।

কালো মানুষ রবার্ট মুগাবে কালো মানুষ বারাক ওবামাকেও ছাড় দেননি। ‘কথিত উদারতার দেশ’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা যদি চান আমার দেশে সমলিঙ্গ বিয়ের অনুমতি দেওয়া হোক, তাহলে তাঁকে জিম্বাবুয়ে আসতে হবে, যাতে আমিই প্রথম তাঁকে বিয়ে করতে পারি।

মুগাবে আরেকবার বলেছেন, আমাদের এই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ওবামা আফ্রিকান বাবার ঔরসে জন্ম। তিনি বলেছেন, সমকাম কবুল ও বৈধ ঘোষণা না করলে আমাদের সাহায্য দেবেন না।

আমাদের প্রশ্ন, তিনি কি সমকামপ্রসূত? আমরা আমাদের জাতি অব্যাহত রাখতে চাই। আর তা আসে নারীর কাছ থেকে। পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক থেকে। সমকাম সম্পর্ক থেকে নয়।

৯৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন রবার্ট মুগাবে। স্বাধীনতার মহান নেতা ভয়ংকর স্বৈরাচার হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। আর ক্ষমতাসীন থাকার শেষ বছরগুলোতে জিম্বাবুয়ের নিপীড়িত মানুষও মুগাবের বাবার অনুসন্ধান করেছে। টাইম মেশিনে যদি তাদের কেউ ১৯২৩ সালে ফিরে যেতে পারত, তাহলে রবার্ট মুগাবের বাবা কাঠমিস্ত্রি রবার্ট মাতিবিরির হাতে একই জিনিস একটি ধরিয়ে দিতে পারত।

পাদটীকা-১ : সামাজিক মাধ্যমে কয়েক দিন ধরে ঘুরঘুর করা একটি ট্রাম্প-কৌতুক শোনাতেই হচ্ছে :

নিউ ইয়র্কের এক চৌরাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল যখন গাড়ি থামিয়ে দিল, এক তরুণ আমেরিকান এসে একজন গাড়িচালকের সাহায্য প্রার্থনা করল : এইমাত্র শুনলাম মাফিয়ারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে এবং চার ঘণ্টার মধ্যে তাদের ১০০ বিলিয়ন ডলার না দিলে তাঁর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

নিজে কত দেবেন সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, অন্যরা কেমন দিয়েছেন?

তরুণ বলল, কেউ দুই গ্যালন পেট্রল, কেউ চার গ্যালন।

পাদটীকা-২ : ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জনসমক্ষে ঘোষণা করেছেন, তিনি অনেক বিষয়েই নোবেল পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত এবং তাঁকে পুরস্কার দেওয়া উচিত।

রবার্ট মুগাবে যদি ট্রাম্পের বাবার হাতে সময়মতো ওই দ্রব্যটি পৌঁছাতে পারতেন আমরা সত্যি এমন একজন ‘পটেনশিয়াল নবেল লরিয়েট’-এর দেখা পেতাম না।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা