kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তুরস্কের আসল উদ্দেশ্য সিরীয় ভূমি দখল করা

সারাহ আবেদ

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গত শুক্রবার মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল তুরস্ক। ‘দুর্ঘটনাবশত’ একটি মার্কিন অবজারভেশন পোস্টে হামলা চালিয়েছিল তারা। তুরস্ক অবশ্য হামলার কথা অস্বীকার করেছে। হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তুরস্ক বলেছে, ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’-এর লক্ষ্য সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা; সন্ত্রাসের করিডর গঠন প্রতিহত করা; কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) ও এর বিভিন্ন সিরীয় সহযোগী, যেমন—পিপলস প্রটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি), ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি (পিওয়াইডি) ও সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসকে (এসডিএফ) সন্নিহিত অঞ্চলের গণতান্ত্রিক কাঠামো বিনষ্ট করা থেকে নিবৃত্ত করা; সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা; সিরীয় উদ্বাস্তুদের সন্ত্রাসমুক্ত এলাকায় পুনর্বাসন করা; পিকেকে, ওয়াইপিজি ও পিওয়াইডির মাদক কারবার নির্মূল করা এবং শিশুসেনা সংগ্রহ বন্ধ করা।

যা হোক, অভিযানকালে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহরের আবাসিক এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে; বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে, বিশৃঙ্খলা, ভয়, সন্ত্রাস বাড়ছে। আর্মেনিয়া সরকার সিরীয় আর্মেনীয়দের কামিশলি ছেড়ে আর্মেনিয়ায় চলে যেতে বলেছে; কিন্তু অনেকে বলেছে, তারা দেশ ছেড়ে যাবে না।

তুরস্ক উদ্বিগ্ন—জ্বালানি করিডরের আড়ালে সন্ত্রাসের করিডর বানানো হচ্ছে। কুর্দি মিলিশিয়ারা জ্বালানি উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা দখলকৃত তেল-গ্যাস হাতাই হয়ে ভূমধ্য সাগর দিয়ে পাচার করতে চায়। দুই পক্ষ থেকেই ডজন ডজনবার মর্টার ও রকেট ছোড়া হয়েছে; কয়েক শ নিরীহ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। তুরস্ক বলছে, পিকেকে, ওয়াইপিজি ও পিওয়াইডি বেসামরিক লোকদের সন্ত্রস্ত করছে এবং তাদের কর্তৃত্ব মানতে অনিচ্ছুক আরব, কুর্দি ও তুর্কমেনদের ঘরছাড়া করছে। তারা ভূমি রেজিস্ট্রি ভবনও গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তুরস্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন সিরিয়ার বিভিন্ন বাহিনী অভিযোগ করছে, তুর্কি বাহিনী বাড়িঘর, দোকানপাট দখল করছে, রাস্তা থেকে তরুণ-যুবকদের তুলে নিচ্ছে, তুর্কি মিলিশিয়া বাহিনীগুলোতে জোর করে যোগদান করানো হচ্ছে। অ-কুর্দিদের ওপরও অবৈধ কর আরোপ করছে তারা। তুরস্ক বলছে, তারা ওই অঞ্চল থেকে সব সন্ত্রাসী গ্রুপকে নির্মূল করতে চায়। কিন্তু তাদের সমর্থনপুষ্ট জঘন্য মিলিশিয়া ও সন্ত্রাসী সংগঠন ফ্রি সিরিয়ান আর্মি এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর ব্যাপারে তাদের মুখে রা নেই। তারা শুধু কুর্দি মিলিশিয়াদের নির্মূল করতে চায়।

তুরস্কের আগের দুটি সামরিক অভিযান অপারেশন ইউফ্রেটিস শিল্ড ও অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চের উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কের চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত থেকে কুর্দিদের বিতাড়ন। চলমান অভিযানে তারা ফোরাতের পূর্ব পারের ৪৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা মুক্ত করে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আরেকটি উদ্দেশ্য কুর্দি মিলিশিয়াদের মাদক কারবার ধ্বংস করা। তাদের দাবি, ওই অঞ্চলে পিকেকে, ওয়াইপিজি ও পিওয়াইডির মাদক উত্পাদন কেন্দ্র রয়েছে। ওই সব মাদক ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করা হয়। তুরস্কে অবস্থানরত ৩৬ লাখ সিরীয় শরণার্থীর ১০ থেকে ২০ লাখকে সেখানে পুনর্বাসন করতে চায় তারা এবং জোর করে ওই এলাকার জনমিতি বদলে দিতে চায়; আগেও করেছে।

মনে রাখতে হবে, সিরিয়া তুরস্ককে এসব অভিযান চালানোর অনুমতি দেয়নি। কুর্দিরা বা যুক্তরাষ্ট্র যদি ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ সিরীয় বাহিনীকে দিয়ে দিত, তাহলেও তুরস্কের অবৈধ অভিযানের পক্ষে কোনো যুক্তি থাকত না।

রাস আল-আইন ও হাসাকার কামিশলিতে এবং রাক্কার উত্তরাংশে আইন ইসাতে যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে তুরস্ক; গোলন্দাজ হামলা চালাচ্ছে। খবরে প্রকাশ, অভিযানের অঞ্চল থেকে ১০০ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে; তারা ইরাকে গেছে। রুমাইলানের মার্কিন ঘাঁটি থেকে ১০ জন মার্কিন কর্মকর্তা ইরাকে চলে গেছেন।

ডিরেক্টরেট জেনারেল ফর অ্যান্টিকিটিজ অ্যান্ড মিউজিয়ামস (ডিজিএএম) বলেছে, সিরিয়ার উত্তরে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কিছু স্থান নব্য প্রস্তরযুগের, যেখানে কয়েক হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা পর পর কয়েকটি সভ্যতার স্মারক রয়েছে। ডিজিএএমের মহাপরিচালক সিরিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্য ক্ষতিকর আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, শিক্ষাবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইউনেসকোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সেখানে তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরনো প্রত্নস্থান রয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাবে শুক্রবার পর্যন্ত এক লাখ বেসামরিক লোক এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে; ৩৪২ জন কুর্দি নিহত হয়েছে; উত্তরাঞ্চলের বড় শহরগুলো আক্রান্ত হয়েছে; বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও আক্রান্ত হয়েছে। বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তুরস্ককে আগ্রাসন বন্ধ করতে বললেও ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ বন্ধে লক্ষণীয় কিছু করা হয়নি।

 

লেখক : সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার

সূত্র: গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা