kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময়ের প্রতিধ্বনি

হায় আবরার! হায় ছাত্ররাজনীতি!

মোস্তফা কামাল

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হায় আবরার! হায় ছাত্ররাজনীতি!

একবার বইমেলায় এক লেখককে সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, আপনি সায়েন্স ফিকশন লেখেন না?

জবাবে লেখক বললেন, ‘আমাদের দেশে লেখার এত এত রসদ থাকতে অন্য গ্রহে যাব কোন দুঃখে? তার কি কোনো প্রয়োজন আছে?’

আমার মনে হয়, লেখকের জবাবটা মন্দ নয়। ঘটনাবহুল দেশ বাংলাদেশ। সর্বত্র খবর আর খবরের ছড়াছড়ি। এত খবর! কোনটা রেখে কোনটা ছাপি—এ রকম অবস্থা! লেখার রসদেরও কোনো অভাব নেই। একটা বড় ঘটনা হয়তো আজ ঘটল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটা বড় ঘটনা ঘটছে। এতে  আগের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় ফলোআপ করারও সময় পাওয়া যায় না।

দেশে এমন এমন ঘটনা ঘটছে, যা কল্পনাও করিনি কখনো। মানুষ ভয়ংকর নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। প্রতিহিংসার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সামান্য স্বার্থের জন্য আপনজনকেও খুন করে ফেলে। একসঙ্গে চলাফেরা ও এক খাটে ঘুমিয়েও শত্রু-মিত্র চেনা যায় না। এই মুহূর্তে হয়তো বন্ধু, পরমুহূর্তেই ভয়ংকর শত্রু হয়ে উঠছে। এর পেছনে রয়েছে মানুষের সীমাহীন লোভ। লোভ-লালসা এতটাই বেড়েছে যে স্বার্থের জন্য যেকোনো অপকর্ম মানুষ করতে পারে।

সর্বক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশা। পাগলের মতো টাকার পেছনে ছুটছে মানুষ। এটা যে অসুস্থতা, তা কেউ বুঝতে চায় না। একটা বাড়ি করেছে, তো আরেকটা করতে হবে। একটা ফ্ল্যাট আছে, আরেকটা কিনতে হবে। একটা প্লট আছে, আরেকটা না কিনতে পারলে জীবন বরবাদ। কাজেই যে যেভাবে পারছে হরিলুট করছে। কি আমলা, কি ব্যবসায়ী কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ! সবাই যেন সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এসব কী চলছে দেশে? কেন মানুষ দিন দিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা কি কোনো সভ্য দুনিয়ায় সম্ভব? ১৯ ‘ছাত্র নামের কলঙ্ক’ নরপশু অসহায় ছাত্র আবরারকে পৈশাচিকভাবে পিটিয়েছে। থেমে থেমে চার ঘণ্টা ধরে পশুত্ব ফলিয়েছে অসহায় ছেলেটার ওপর। এরাই নাকি ছিল তার সহপাঠী! আবরার পা ধরে প্রাণভিক্ষা চাইলেও কোনো লাভ হয়নি। ওরা কি ইয়াজিদ কিংবা সিমারের বংশধর! তা না হলে এতটা নির্দয় হলো কী করে ওরা?

আবরার কী দোষ করেছিল? কেন তাকে নিয়ে শুধু শুধু সন্দেহ? তার পুরো পরিবার আওয়ামী ঘরানার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। গত নির্বাচনেও আবরারের বাবা কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের পক্ষে কাজ করেছেন। তাহলে কি একটি স্ট্যাটাস দেওয়াই তার অপরাধ? স্ট্যাটাসটি আমি খুব ভালো করে পড়েছি। সেখানে ভুল কিছু লেখেনি। যথার্থই লিখেছে। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ছিল সেই স্ট্যাটাস। কোনো রকম উগ্রবাদী মন্তব্য ছিল না।

আবরারের পড়ার টেবিলে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি ছিল। কোনো প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার মানুষ কি এই বই পড়ার টেবিলে রাখবে? কাজেই আবরারকে শিবির সন্দেহ করার কোনো যুক্তি নেই।  

যে মা-বাবা তাঁদের ছেলেদের মানুষ হওয়ার জন্য বুয়েটে পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা কি জানতেন তাঁদের ছেলেরা কতটা অমানুষ হয়ে গেছে! জানলেই বা তাঁরা কী করতে পারতেন? একটা সময় তো সন্তানদের ছেড়ে দিতে হয়। যে ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তাকে তো আর ঘরে আটকে রাখা যায় না। আর মা-বাবার কাছে যখন ছিল তখন নিশ্চয়ই অমানুষ ছিল না! তাহলে অমানুষ বানাল কে? বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি রাজনীতি?

যে রাজনীতি একটা মানুষকে অমানুষ বানায়, সেই রাজনীতি আমরা চাই না। যে রাজনীতি সিট দখল, হল দখল করে, যে রাজনীতি মানুষ হত্যা করে, যে রাজনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করে, সেই রাজনীতি আমাদের প্রয়োজন নেই।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নেই। সেখানে আছে ছাত্রসংসদ। ছাত্রসংসদই শিক্ষার্থীদের ভালোমন্দ দেখভাল করে। সেসব দেশে কি রাজনৈতিক নেতা তৈরি হয়নি? আমাদের দেশেই শুধু এর ব্যতিক্রম। ছাত্ররাজনীতি ছাড়া নাকি নেতা তৈরি হয় না। এসব বলে বলে রাজনীতিকে কলুষিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করেছেন।

অথচ এই ছাত্ররাজনীতিই একসময় আদর্শের রাজনীতি ছিল। দেশের বড় বড় সংকটে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে এ দেশের ছাত্রসমাজ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন,  ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার পরও স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা অস্বীকার্য। সেই ছাত্রসমাজ আজ আদর্শচ্যুত। রাজনীতির নামে তারা অসুস্থ রাজনীতি চালু করেছে। নেতা হলেই হঠাৎ বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যায়।

আসলে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই কলুষিত হয়েছে। পদ-পদবি এখন টাকা দিয়ে কেনা যায়। আগে নেতৃত্বের গুণ দেখে পদ-পদবি দেওয়া হতো। আবার ভোটের মাধ্যমেও নেতা নির্বাচিত হতেন। এখন তার আর বালাই নেই। এখন টাকা দিয়ে নেতা হওয়া যায়। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য লাগে প্রচুর টাকা। ফলে অবৈধ পথ বেছে নিতে হয়।

আমার বন্ধুস্থানীয় কয়েকজন সংসদ সদস্য কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, এখন সংসদ সদস্য নির্বাচন করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। আগে এমনটি ছিল না। দলীয় মনোনয়ন পেলে অল্প খরচে নির্বাচন সম্পন্ন করা যেত। এখন সে অবস্থা নেই। কেউ টাকা ছাড়া নড়ে না। সংগত কারণেই রাজনীতিতে ব্যবসায়ীরা জেঁকে বসেছেন। তাঁরা দলকেও টাকা দেন আবার নিজেও বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে ভোটে জিতে আসেন। রাজনীতিতে এই অসুস্থ খেলা বন্ধ না হলে ছাত্ররাজনীতিতেও সুস্থতা আসবে না।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। শুধু তা-ই নয়, বিনা অনুমতিতে বুয়েটে ক্লাব করাও নিষিদ্ধ। অথচ ছাত্রসংগঠনগুলো দিব্যি সক্রিয় রাজনীতি করে গেছে। বুয়েট কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কেউ কখনো বলেনি যে বুয়েটের আইনে ছাত্ররাজনীতি বা সংগঠন করা নিষিদ্ধ। কেন বুয়েটে রাজনীতি ঢোকানো হলো? কারা কিভাবে ঢোকাল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলছেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে নেতা তৈরি হবে না। ফলে আগামী দিনের রাজনীতি সংকটে পড়বে। আবার অনেকেই বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির কোনো প্রয়োজন নেই। সেখানে ছাত্রসংসদ থাকবে। তারাই শিক্ষার্থীদের ভালোমন্দ দেখভাল করবে। এর মধ্য দিয়েই নেতা তৈরি হবে। 

আমার ব্যক্তিগত মত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিগত বছরগুলো ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কারণে উচ্চশিক্ষার মান ব্যাপকভাবে নিচে নেমে গেছে। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ছিল। এখন এক হাজারের মধ্যেও নেই। এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? দায়ী শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি।

শিক্ষকদের মধ্যে দুটি ধারা সৃষ্টি হওয়ায় মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকরা অবহেলার শিকার। সংগত কারণেই শিক্ষকরা ক্লাসের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির দিকে। তাঁরা নিয়মিত ক্লাস নেন না। আবার ক্লাসে গেলেও প্রস্তুতি নিয়ে যান না। এ জন্য কাউকে জবাবদিহিও করতে হয় না।

রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অদক্ষ-অযোগ্য শিক্ষকরা দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য হয়েছেন। তাঁদের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধুঁকেছে এবং এখনো ধুঁকছে। উচ্চশিক্ষার মান প্রতিনিয়ত নিচের দিকে নামছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। এর উত্তরণ ঘটাতে হলে শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতির রাশ টানতেই হবে। আশা করি, সবাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে কথা বলবেন, মন্তব্য করবেন।

পরিশেষে বলতে চাই, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছেন। তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে নির্দেশ না দিলে খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকত। পরে বলা হতো, আবরার গণপিটুনিতে মারা গেছে। তা ছাড়া অতীতে দেখেছি, ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্র মারা গেলে তার কোনো বিচার হয়নি। ক্যাম্পাসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন বৈধতা পাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজের দল দেখেননি। তিনি অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করেছেন। এটা নিশ্চয়ই শুভ লক্ষণ। আমরা আশা করছি, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। 

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক  

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা