kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি : সত্য কী?

মোহাম্মদ এ আরাফাত

১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি : সত্য কী?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সফর এবং ভারতের সঙ্গে কতগুলো চুক্তিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বা বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা হয়েছে। কিছু দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমও বিভ্রান্তিমূলক খবর প্রকাশ করেছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশবিরোধী একটি গোষ্ঠী পানি ঘোলা করে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।

তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবীও টিভি টক শোগুলোতে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই সত্য গোপন করেছেন। এ ধরনের কাজকে আমি বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বলি।

সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ঘোষণাটি পড়েই দেখেননি; বরং মিথ্যা প্রচারণাগুলো থেকে তাঁদের ভুল ধারণাগুলো তৈরি হয়েছে। ব্যাপারটি অনেকটা এ রকম হয়েছে—‘ভারতের সঙ্গে গোলামি চুক্তি/মানি না, মানব না। কী চুক্তি হয়েছে বলেন তো? সেটা তো জানি না।’

এই বাস্তবতায় যে বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সঠিক তথ্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছেন আর তাঁর কন্যা দেশ বিক্রি করে দেবেন—এ কথা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের বিশ্বাস করার কথা নয়। মোংলা বন্দর ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে—এ রকম অপপ্রচার চালাচ্ছে দেশবিরোধী একটি চক্র। এই অপপ্রচারের ফাঁদে পড়ে কিছু সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশই ভারত, নেপাল, ভুটানকে মোংলা বন্দর ব্যবহার করার জন্য আমন্ত্রণ করেছিল। নেপাল, ভুটান যেন মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য ভারত যেন তাদের ট্রানজিট দেয়, তা আমরাই চেয়েছি এবং ভারত তা এরই মধ্যে দিয়েছে। এর কারণ হলো, আমরা যদি ভারত, নেপাল, ভুটানকে দিয়ে মোংলা বন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করাতে পারি, তাহলে আমাদেরই লাভ। কারণ সে ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মোংলা বন্দরের আয় বাড়বে।

বিমানবন্দর যেমন আন্তর্জাতিক হয় সমুদ্রবন্দরও তেমন আন্তর্জাতিক হয়। হংকং সমুদ্রবন্দর ট্রানজিট হিসেবে বিশ্বের অন্যতম বড় ট্রানজিট বন্দর। বিভিন্ন দেশের জাহাজ সেটি ব্যবহার করে। মোংলা বন্দর যদি অন্য দেশ ব্যবহার করে, তবে মোংলা বন্দরই আন্তর্জাতিক ট্রানজিট বন্দর হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে সবারই লাভ।

প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশ ভারতে কোনো প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করবে না। বিবিসি একটা নিউজ করেছিল যে ‘ভারতকে প্রাকৃতিক গ্যাস দিচ্ছে বাংলাদেশ’। এটি খবর নয়, গুজব। এই গুজবটি ভালোভাবে ছড়ানোর পর বিবিসি দুঃখ প্রকাশ করেছে। সত্যটা হলো, বাংলাদেশ ভারতের কাছে প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, লিকুইড গ্যাস রপ্তানি করবে।

বাংলাদেশের যা প্রাকৃতিক গ্যাস আছে তা আমাদের নিজেদের জন্যই অপ্রতুল। যে কারণে আমরা বিদেশ থেকে এলএনজি বা লিকুইড গ্যাস আমদানি করব। তবে এলএনজি বা লিকুইড গ্যাস মন চাইলেই আমদানি করা সম্ভব নয়। কারণ এলএনজি বা লিকুইড গ্যাস আমদানি করে দেশে আনতে সমুদ্রের পারে এবং ভূমিতে কিছু বিশেষ ধরনের অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশ এত দিন ধরে এই অবকাঠামো তৈরি করেছে। এখন বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজন মেটাতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে এলএনজি বা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস আমদানি করতে পারবে।

ভারতের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে, তা হলো আমরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে এলএনজি রপ্তানি করতে পারব। এতে করে বাংলাদেশের লাভ হবে। যেহেতু আমাদের এলএনজি আমদানি করার জন্য যে অবকাঠামো দরকার তা প্রস্তুত হয়ে গেছে। এখন আমরা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে কিছু এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করে ভারতে রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারব।

উপকূলীয় এলাকায় রাডার স্থাপন বিতর্ক

উপকূলীয় এলাকায় রাডার স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়েছে। কিছু মানুষ এতে বিভ্রান্তও হয়েছে। এর কারণ হলো বেশির ভাগ মানুষ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ঘোষণাটি পড়েই দেখেনি। বেশির ভাগ মানুষ এ বিষয় নিয়ে অপপ্রচারমূলক লেখা এবং খবরগুলো বেশি দেখেছে। এর কারণ হলো বাংলাদেশবিরোধী একটি গোষ্ঠী এবং কিছু জ্ঞানপাপী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এই অপপ্রচার করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার কাছে সুনিপুণভাবে মিথ্যা তথ্য পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় রাডার স্থাপন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ঘোষণায় কী বলা আছে—

Both Prime Ministers welcomed the initiatives for development of closer Maritime Security Partnership, and noted the progress made in finalization of an MoU on Establishment of Coastal Surveillance Radar System in Bangladesh and encouraged both sides for early signing of the MoU.

পুরো  Surveillance Radar Szstem বাংলাদেশেই বসবে এবং বংলাদেশের হাতেই থাকবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই রাডারের মাধ্যমে আমাদের উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি করবে।

আমরা যেমন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরি করতে ফ্রান্সের সহযোগিতা নিয়েছি এবং উৎক্ষপণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়েছি; কিন্তু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা আমাদের হাতেই আছে বা একইভাবে যেমন মেট্রো রেল তৈরি করতে জাপানের ঋণ নিচ্ছি এবং তাদের প্রযুক্তি কিনছি; কিন্তু মেট্রো রেল তো আমরাই ব্যবহার করব এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একইভাবে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় স্থাপনের জন্য আমরা রাডার কিনব এবং এগুলো স্থাপনে তাদের সহযোগিতা নেব। রাডারগুলো বাংলাদেশই নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ব্যবহার করবে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই রাডারগুলো দিয়ে নজরদারির মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় আমাদের নিরাপত্তা সুরক্ষা করবে।

তিস্তা চুক্তি বনাম ফেনী নদীর পানি

তিস্তা আর ফেনী নদীর বিষয়টি একপাল্লায় মাপাটাই মিথ্যা প্রচারণার অংশ। তিস্তা নিয়ে পানিবণ্টন চুক্তির খসড়া প্রস্তুত হয়ে আছে ২০১১ সাল থেকেই। শেখ হাসিনার উদ্যোগেই এটি হয়েছে। এখন সই করার অপেক্ষায়। তিস্তার বিষয়টি হাজার হাজার কিউসেক পানিবণ্টনের বিষয়, যে কারণে এটি অনেক জটিল। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময়ই এটি স্বাক্ষর করতে রাজি ছিল এবং আছে। কিন্তু বাগড়া দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার পানিবণ্টন প্রশ্নে রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারে না। সেখানেই সমস্যা হচ্ছে। পদ্মা নদীর পানি চুক্তিও কিন্তু শেখ হাসিনাই করেছিলেন—এটা ভুলে গেলে চলবে না।

 ফেনী নদীর পানির নিয়ে পানিবণ্টন চুক্তি হয়নি। সেখানে মাত্র ১.৮২ কিউসেক পানি ভারতীয় অংশের নদী থেকে খাবার পানির জন্য নেওয়া হবে। এটি পানিবণ্টন চুক্তি নয়। ফেনী নদীর সর্বনিম্ন পানিপ্রবাহ ৭৯৪ কিউসেক। ১.৮২ কিউসেক পানি হলো ফেনী নদীর সর্বনিম্ন পানিপ্রবাহের মাত্র ০.২৩ শতাংশ এবং বাৎসরিক গড় পানিপ্রবাহের ০.০৯৬ শতাংশ। সাধারণভাবে মাথা খাটালেই তো বোঝা যায়, এতে কতটুকু প্রভাব পড়বে।

এ ছাড়া ত্রিপুরার এই সাবরুমেই মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের অনেক মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই উপজেলা শহরের মানুষ আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, পানিসহ বিভিন্নভাবে আতিথেয়তা দিয়েছিল।

কাজেই আমরা সামান্য কিছু পানি দিয়ে তাদের উপকার করছি, এখানে আমাদের কোনো ক্ষতিই হবে না। এখন আমরা বলতে পারব যে আমরা মানবিকতা দেখিয়েছি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের ইতিবাচক ইঙ্গিত বা সংকেত দেওয়ার প্রয়োজন আছে।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা