kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রুখতে হবে

ফরিদুর রহমান

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রুখতে হবে

কিছুদিন আগে খ্যাতিমান অভিনেতা, আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে কলকাতার একটি হাসপাতালের আইসিইউতে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বাংলাদেশের এক তরুণী প্রিয় অভিনেতার রোগমুক্তি কামনা করে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘হে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন, আমার প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে তুমি দ্রুত সুস্থ করে দাও। তুমি তাঁকে আরো দীর্ঘ জীবন দান করো, আমরা আরো অনেক দিন এই প্রিয় মানুষকে আমাদের মাঝে দেখতে চাই।’

তরুণীর ফেসবুক স্ট্যাটাস আমাকে বিস্মিত করেনি; বরং মনে হয়েছে, এই তো আমার বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িকতা বলতে আমি যা বুঝি, তা এই আবেগঘন কয়েকটি বাক্যে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিদিনই গভীর বেদনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছি, যে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ বিস্তৃত মরুভূমিতে মরীচিকার মতো প্রতিদিনই দূরে সরে যাচ্ছে।

কয়েক বছর ধরেই সারা দেশে, বিশেষ করে মফস্বল শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মন্দির ও পূজা মণ্ডপে কখনো রাতের অন্ধকারে আবার কখনো ক্ষমতাবানদের প্রত্যক্ষ মদদে প্রকাশ্যে দিনের বেলায়ই একদল দুর্বৃত্ত মূর্তি ভাঙার কাজে নেমে পড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে মনে হয়, এ বছরও শারদীয় দুর্গোৎসব সামনে রেখে দুর্বৃত্তের দল মূর্তি ভাঙার মহোৎসবে মেতে উঠেছে। বিগ্রহ বা মূর্তি ভাঙার আসল উদ্দেশ্য যে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করা বা সমাজের কতিপয় পাপীষ্ঠের পুণ্য অর্জনের ব্যবস্থা করা নয়, তা বুঝতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। এর পেছনে প্রধান কারণ ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং শক্তি প্রয়োগ করে কিছু মানুষকে তাদের পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উত্খাত করে কৌশলে তাদের ভূ-সম্পত্তি দখল করা।

১৯৫১ সালের জনগণনা অনুসারে সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা ছিল শতকরা ২২ জন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ১৪ শতাংশে। বছরের পর বছর সেই সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে ৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। জীবনমান উন্নয়ন, চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য ও উচ্চশিক্ষাসহ নানা কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ দেশান্তরী হয়। ভাগ্যান্বেষণে যাওয়া মানুষ কখনো নিজের দেশে ফিরে আসে, আবার কখনো অভিবাসী হয়ে থেকে যায়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বৈরিতার কারণে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময় গ্রাম পেছনে ফেলে, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব ছেড়ে, জন্মজন্মান্তরের বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে ভিন দেশে পাড়ি দেওয়া যে কত বেদনার, তা যাঁরা দেশ ছেড়ে গেছেন তাঁরাই শুধু উপলব্ধি করতে পারেন। অন্যদিকে যে দেশ থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়, সেই দেশের শাসক ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য তা কতটা লজ্জার তা কি তাঁরা বুঝতে পারেন!   

আমরা আশা করেছিলাম, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তি, সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মী এবং ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ক্রমাগতভাবে এই বিষবৃক্ষ শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি, নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তুলেছে।

গ্রামেগঞ্জে যখন ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু লোক প্রকাশ্যে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সম্পদ লুট, নারীদের ধর্ষণ ও মূর্তি ভাঙাকে উৎসাহিত করে বক্তব্য দেন, তখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নীরবতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা আমাদের বিস্মিত করে। কিছু ‘বুদ্ধিজীবীও’ ইনিয়ে-বিনিয়ে ভারত, মিয়ানমার ও চীনে মুসলিম নির্যাতনের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার ক্ষেত্রে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছেন। ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের  দেশেই মধ্যযুগের একজন কবি এখন থেকে সাড়ে ৬০০ বছর আগে লিখেছিলেন, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ অথচ আজ একবিংশ শতকের দুই দশকের প্রান্তে এসেও আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের একটা বড় অংশ এখনো গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, ধর্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষ হয়ে উঠতে পারেননি।

সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি বহু সংস্কৃতি এবং বহু ধর্ম বিশ্বাসের দেশে নিজের সংস্কৃতি বা বিশ্বাসের কারণে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত বা নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা যে অন্যায় এবং অপরাধ, সেই বিবেচনা বোধ রহিত এক সমাজে এখন আমাদের বসবাস। 

ব্যক্তিপর্যায়ে অসাম্প্রদায়িক জীবনাচরণের চর্চা কোনো তাত্ত্বিক আলাপ-আলোচনা, রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মকাণ্ড এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। শৈশবে পারিবারিক পরিমণ্ডলে ঔদার্য ও পরমত-সহিষ্ণুতার শিক্ষা, মিশ্র সাংস্কৃতিক সামাজিক পরিবেশ এবং শিশুদের জন্য মুক্তচিন্তা ও মানবিক আচার-আচরণের উদাহরণ সৃষ্টি করতে না পারলে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তারা কূপমণ্ডূক ও ধর্মান্ধ হয়ে উঠতে পারে, নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অথবা নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য নিতে পারে হিংস্রতার আশ্রয়।

 

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা