kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অভিশংসনের মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প!

শামীম আল আমিন

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অভিশংসনের মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প!

রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় বারবারই কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই চলছে সেই পরীক্ষা। একের পর এক সামনে এসেছে বিচলিত হওয়ার মতো নানা পরিস্থিতি, যা প্রেসিডেন্ট হওয়ার বৈতরণী পেরিয়ে যাওয়ার পরও থামেনি। তৈরি হয়েছে আরো জটিল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি। কিন্তু কখনোই ভেঙে পড়তে দেখা যায়নি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা তা নিয়ে মানুষকে রীতিমতো দ্বিধায় ফেলে দিয়ে এগিয়েই চলেছেন তিনি।

সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কেউই কিন্তু আঁচ করতে পারেনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। অথচ গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রিপাবলিকান প্রার্থী ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত এই ‘হঠাৎ রাজনীতিবিদ’কে নির্বাচনে জেতাতে রাশিয়ার হাত ছিল, ওঠে এমন অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও বলা হয়, হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য রাশিয়া গোপন কোনো ষড়যন্ত্র করেছিল। বিষয়টি নিয়ে এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি তদন্ত শুরু করলে একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকেই বরখাস্ত করে বসেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল অনেকটা মৌচাকে ঢিল ছোড়ার মতো। নানা সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে শুরু করেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাট, এমনকি অনেক রিপাবলিকানের দাবির মুখে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক রবার্ট মুলারকে ‘রাশিয়া আঁতাত’ অনুসন্ধানে স্পেশাল কাউন্সিল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা দেশের রাজনীতিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। প্রেসিডেন্ট অভিযোগ অস্বীকার করে বলতে থাকেন, এসবই ‘উইচহান্ট’।

কিন্তু এবার হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে একটু বেকায়দায় পড়ে গেছেন তিনি। তাঁর সামনে এখন অভিশংসনের খড়্গ। হয়তো ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে যাচ্ছেন তিনি।  অভিযোগ উঠেছে, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট মনোনয়নপ্রত্যাশী জো বাইডেনকে ঘায়েল করতে বাঁকা পথ বেছে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাট মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ওবামার সময়কার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অনেকখানি এগিয়ে। বিভিন্ন জরিপের ফল অন্তত সে কথাই বলছে। ফলে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

গত ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক ফোনালাপে জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার জন্য চাপ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক গোয়েন্দা তথ্যে বিষয়টি প্রকাশ পায়। ফোনালাপের কয়েক দিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের ৪০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা আটকে দিয়েছিলেন। বাইডেন ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যাপারে দর-কষাকষির অংশ হিসেবেই ট্রাম্প এমনটি করেছিলেন বলে দাবি সমালোচকদের। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের স্বার্থে অন্য একটি রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের পথ করে দিয়েছেন বলে কড়া অভিযোগ তুলেছে ডেমোত্র্যাদ্ধটরা। যদিও জুলাইয়ে আটকে দিলেও পরে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তার অর্থ ছাড় করেছে মার্কিন প্রশাসন।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ট্রাম্প-জেলেনস্কির ওই ফোনালাপ গোপন করতে চেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আর তার সূত্র ধরেই কংগ্রেশনাল কমিটিগুলো এবার প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের তদন্তে নেমেছে। এতে অবশ্য বেজায় চটেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আরেকটি ‘উইচহান্ট’ শুরু করেছে বলে পাল্টা অভিযোগও করেছেন এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট।

ডেমোক্রেটিক নেতা এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য শক্ত প্রতিপক্ষ বাইডেনকে নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপ করার কথা স্বীকার করলেও কোনো ষড়যন্ত্র করেননি বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। অভিশংসন তদন্তকে ‘ধাপ্পাবাজি’ ও ‘দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জালিয়াতি’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিপক্ষের শক্তি ও সামর্থ্যের কথা টের পেয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনটা করছেন বলে অভিযোগ বিশ্লেষকদের।

অভিশংসনের মুখে পড়লেও নিজের মুখ বন্ধ রাখছেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বরং এবার চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করার। ট্রাম্পের অভিযোগ, জো বাইডেন এবং তাঁর ছেলে হান্টার ইউক্রেন ও চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ব্যবসাসংক্রান্ত চুক্তি করার সময় দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন; যদিও ট্রাম্প তাঁর দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেননি।

২০১৪ সালে হান্টার বাইডেন ইউক্রেনের প্রাকৃতিক গ্যাস কম্পানি ‘বুরিসমা’তে যোগ দেন। ওই সময়ই বাবা-ছেলের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। তার পর ইউক্রেনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জো বাইডেনই ইউক্রেনে মূল ভূমিকায় ছিলেন। বলা হয়, ২০১৬ সালে জো বাইডেন ইউক্রেন সরকারকে তাদের শীর্ষ প্রসিকিউটর ভিক্টোর শোকিনকে বরখাস্ত করতে বাধ্য করেন। শোকিনের বাহিনীই ‘বুরিসমা’ গ্যাস কম্পানির মালিকের বাণিজ্যিক নথিপত্র যাচাই-বাছাই করছিল। ট্রাম্প ও তাঁর মিত্রদের অভিযোগ, বাইডেন আসলে তাঁর ছেলেকে রক্ষা করতে এ কাজ করেছেন। যদিও সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শোকিনের উত্তরসূরি বলেছেন, ‘জো বাইডেন বা হান্টারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নেই।’

চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ সুবিধা নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের ‘ভারসাম্যহীন’ বাণিজ্য চুক্তির দায়ও বাইডেনের বলে মনে করেন ট্রাম্প। কিন্তু এসব অভিযোগের কিছুই প্রমাণিত হয়নি। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের স্বার্থে বিদেশি রাষ্ট্রকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের পথ দেখাচ্ছেন—এমন অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। 

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নেমেছে হাউস ডেমোক্র্যাটরা। ইউক্রেনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যোগাযোগে যুক্ত ছিলেন হোয়াইট হাউসের সাবেক এমন দুই কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য দিতে ডেকেছে কংগ্রেশনাল কমিটি। ফোনালাপসংক্রান্ত নথি চেয়েছে হোয়াইট হাউসের কাছে। সেই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের কাছে কোনো তথ্য আছে কি না, তাও তলব করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় হয়তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি করা যাবে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হবে না। কারণ হাউস প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ বা অভিশংসিত করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে না। এটি হচ্ছে অনেকটা দোষী সাব্যস্ত করার মতো। কিন্তু ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে হলে অবশ্যই সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট লাগবে। 

হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট ভোট দিয়ে ট্রাম্পের অভিশংসনপ্রক্রিয়া শুরু করলেও সিনেটের শুনানি ও ভোটে তা আটকে যেতে পারে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে ট্রাম্প সমর্থকের পাল্লা ভারী হওয়ায় অভিশংসনপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত মাত্র দুজন প্রেসিডেন্ট ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের একজন এন্ড্রু জ্যাকসন। অন্য জন বিল ক্লিনটন। হাউসে দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হলেও চূড়ান্ত বিচারে তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরানো যায়নি। কেননা সিনেট তাঁদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। এ ছাড়া রিচার্ড নিক্সন ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে ইম্পিচ করার কথা ওঠে। তার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্ট হয়ে নিক্সনকে ‘পারডন’ করে দেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি করাও হয়, তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না। এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ করার জন্য অনেকটা সময় লাগে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্টের মেয়াদই অনেক সময় শেষ হয়ে যায়। তার ওপর সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের কথাটাও মাথায় রাখতে হবে। তবে সব শেষ কথাটা হচ্ছে, অভিশংসনের বিষয়টি লেখা থাকে ইতিহাসের পাতায়, যা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ভালো কিছু নয়। ইতিহাস তাঁকে সেভাবে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে।

লেখক : কালের কণ্ঠ’র উত্তর আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা