kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার

মোফাজ্জল করিম

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার

তরুণ বন্ধুরা আমার, আমি জানি তোমাদের সবার মন খুব খারাপ। যারা আবরার ফাহাদের কাছের বন্ধু ছিলে, ছিলে তার অন্তরঙ্গ আপনজন, তারা যেমন; তেমনি যারা আগে কোনো দিন তার নামও শোনোনি, তারাও শোকে মুহ্যমান এমন একটি নিরীহ নিরপরাধ বিরল প্রতিভার অধিকারী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মত তরুণের মর্মান্তিক তিরোধানে। বিশেষ করে এখন যখন বাংলাদেশে শান্ত সুবোধ নির্বিরোধ অথচ অসাধারণ মেধাবী মানুষের রীতিমত আকাল চলছে। হ্যাঁ, এখন ভালো মানুষের আকালই তো। আমরা যারা রাষ্ট্র-তরণীর হাল ধরার দায়িত্বে আছি, যাদের হাতে লগি-বৈঠা, তারা তো তোমাদের ভালো মানুষ হবার শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা তো একেকজন রাগবি খেলোয়াড়, আমরা জানি শুধু কী করে ছলে-বলে-কৌশলে ডিম্বাকৃতি বলটি বাগিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। আমরা আমাদের জীবন থেকে আইনকানুন শৃঙ্খলা নিয়মনীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে, একটি-দুটি করে সিঁড়ি ভেঙে নয়, এক লাফে বিশ তলা দালানের ছাদে ওঠার কৌশল বা অপকৌশল রপ্ত করতে ব্যস্ত। তোমরা তরুণরা আমাদের এই ভানুমতীর খেল দেখে চমত্কৃত। ফলে দেশটা ছেয়ে গেছে লুটেরা জুয়াড়ি চাঁদাবাজ ধান্দাবাজ দখলবাজ বাজপাখী ও তাদের লেজধরা চেলাচামুণ্ডাতে। এখনকার সহজ পাঠ : ‘লিখিবে পড়িবে মরিবে দুখে/চোঙ্গা ফুঁকিবে, অস্ত্র ধরিবে, থাকিবে সুখে’। কথাটা ঠিক কি না? লেখাপড়া শিখে বেকার-তালিকায় নাম লিখিয়ে সারা জীবন ছেঁচা-গুঁতা খেয়ে খেয়ে ‘হায় হাসান হায় হোসেন’ করে বুক চাপড়াবে, নাকি উঠতি বয়সেই ‘ইয়া আলী’ বলে কোনো বড় ভাই, বড় নেতা, পাতি নেতার হয়ে চোঙ্গা ফুঁকবে, সেই চয়েস যখন সামনে আসে, তখন অনেক তরুণই কিছু নগদ নারায়ণ ও ভবিষ্যতে এক লাফে ছাদে ওঠার আশায় চোঙ্গা ফোঁকার চাকরিটাই বেছে নেয়। আর এই কাজে ‘শুধু জয়-জিন্দাবাদই’ নয়, অতি দ্রুত ঢিল ছোঁড়া গ্রেনেড ছোঁড়া ছিনতাই ইত্যাদির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ডবল প্রমোশন পেয়ে মেধা ও তেলবাজির জোরে চাঁদাবাজি দখলবাজি টেন্ডারবাজি ক্যাসিনোবাজি সন্ত্রাস ইত্যাদিতে গ্র্যাজুয়েশন, মাস্টার্স ও কেউ কেউ পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করে। এরা তখন সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। জীবনের শুরুতে পাড়ার কাউকে সালাম দিয়ে এরা জবাব পেত না, ছিল এতই তাচ্ছিল্যের পাত্র, আর সমাজপতি হয়ে তারা দশটা সালাম পেলে একটার জবাব দেয়, তাও কেবল মাথা নেড়ে!

যারা বিদ্যাশিক্ষা চর্চার আলোকোজ্জ্বল পথ ছেড়ে অন্ধকার পাপ পঙ্কিল পথে পা বাড়ায়, তাদের কারো কারো পরিণতি হয় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামক এক অত্যাধুনিক স্থলযুদ্ধে, যা আবিষ্কারের কৃতিত্ব এই উন্নয়নের মহাসড়কের অভিযাত্রী বাংলাদেশের! অথবা ঠিকানা হয় কাশিমপুর আর না হয় কেরানীগঞ্জের মেহমানখানা। এটাই তাদের অমোঘ নিয়তি বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। ফলে এই সব অপকর্ম ও সন্ত্রাসের বটবৃক্ষের পতনে কেউ বিচলিত বোধ করে না, মানুষ বরং বিস্ময়বোধ করে, যখন দেখে এদের বেশির ভাগই আইনকানুনকে কলা দেখিয়ে সমাজপতি হয়ে সমাজের ঘাড়ে চড়ে বসে আছে। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে মানুষ অবশ্য এটাই বিধিলিপি বলে মেনে নিয়েছে। চিন্তার জগতে একটা বড় রকমের ভূমিকম্প না হলে তারা এই হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না।

২.

কিন্তু হিসাব মেলানো যায় না তখনই, যখন দেখি যেসব তরুণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টির উজ্জ্বলতম পরিবেশে অবস্থান করে, সর্বোপরি মেধা-মননের বিকাশে আশৈশব চরম উৎকর্ষের পরিচয় দেওয়ার পরও আচার-আচরণে একজন অতি নিম্নস্তরের অপরাধীর মত কাজ করছে। একজন অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, হতদরিদ্র অপরাধীকে কেউ হয়ত আইনসিদ্ধ না হলেও নির্দোষ বলবেন এই বলে যে বেচারা লেখাপড়া জানে না, মূর্খ, গরিব। কিন্তু জীবনের শুরু থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সোপানগুলোতেও যাদের ‘বিজয় মুকুট...সূর্যরাগে ঝলমল,’ মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, এমনকি সমগ্র দেশবাসী যাদের মেধা নিয়ে, সাফল্য নিয়ে গর্ব করে, তারা যদি বিশ-বাইশজন মিলে একজন নিরীহ নিরস্ত্র সতীর্থকে রাত্রির নির্জনতায় একটি ছাত্রাবাসের কামরায় ডেকে নিয়ে গিয়ে লাঠিসোঁটা, ক্রিকেট স্টাম্প, হকিস্টিক ইত্যাদি দিয়ে পিটিয়ে, অনবরত কিলঘুষি মেরে হত্যা করে, তখন? তখন কি আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে না?

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামের ২১ বছর বয়সী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কটির প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে সে নিশ্চয়ই বারবার ওই মদোন্মত্ত (বিশেষণটি ব্যবহার করেই মনে পড়ছে খবরের কাগজে দেখেছি, যে কামরায় আবরারকে খুন করা হয়েছে সেখানে কিছু মদের বোতলও পাওয়া গেছে, যা অন্যান্য আলামতের সঙ্গে পুলিশ জব্দ করেছে) সতীর্থদের হাতে-পায়ে ধরে বলেছে, ‘ভাই, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমাকে আর মেরো না, আমি মরে যাচ্ছি। তোমরা যদি মনে কর আমি কোনো অন্যায় করেছি তা হলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ ...হায় মানবতা, হায় মনুষ্যত্ব, হায় দয়ামায়া, তোমরা কি মরে গেছ? ত্রিশ লক্ষ শহীদের সঙ্গে খানসেনারা কি একাত্তরে তোমাদেরও হত্যা করেছে? জবাব দাও। তা না হলে বুয়েটের ওই ‘মেধাবী হত্যাকারীদের’ হাত একটুও কাঁপল না কেন? সেই হন্তারক মেহেদী হাসান রাসেল গংদের প্রতি আমার প্রশ্ন, ওটা যদি আবরার না হয়ে তোমরা কেউ হতো, কিংবা তোমাদের কোনো ভাই, তা হলে? ও যখন ‘মাগো মাগো’ বলে আর্তচিৎকার করছিল তখন একবারও কি তোমার নিজের স্নেহময়ী মায়ের মুখচ্ছবি তোমার মনে পড়ছিল না? আচ্ছা বল তো, দলিত মর্দিত নিষ্পিষ্ট মানুষটির লাশটিকে—যে মানুষটি একটু আগেও ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের একজন, যে ছিল তোমার মা-বাবার মত অন্য দুজন মা-বাবার নয়নের মণি, আশা-স্বপ্নের প্রতিভূ—বারান্দায় ফেলে রেখে তোমরা কিভাবে নিচে গিয়ে একটি হোটেলে জম্পেশ আড্ডায় মেতে রাতের খাবার খেতে পারলে? কী করে তোমাদের গলা দিয়ে ভাতের লোকমা নামল? তারপর নাকি তোমরা টিভি রুমে বসে খানিকক্ষণ টিভিও দেখেছ। তোমরা পারলে? তোমাদের সব অনুভূতি কি মরে গেছে? নাকি তোমরা ভবিষ্যতে প্রকৌশলী না হয়ে জল্লাদের চাকরি করবে বলেই মনস্থির করেছ?

আবরারের হত্যাকাণ্ডের বিবরণের পাশাপাশি আজকের (৮.১০.১৯) প্রায় সব ক’টি কাগজে সে যে বুয়েটের কত মেধাবী, কত ভদ্র, শান্ত ও নির্বিরোধ একজন শিক্ষার্থী ছিল সে খবরও ছাপা হয়েছে। এই বয়সেই সে একজন ধর্মপরায়ণ মানুষ ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ত। লেখাপড়ায় ছিল খুবই সিরিয়াস। রাজনীতির ধারে-কাছেও ছিল না সে। কিন্তু তার পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া ও দু-একবার তাবলিগ জামাতে যাওয়া দেখে হত্যাকারীদের মনে হয়েছে সে শিবিরের কর্মী। তাহলে বাংলাদেশে যে কোটি কোটি মানুষ নামায-রোযা করে, তাবলিগে যায়, দাড়ি রাখে, তারা কি সবাই জামায়াত-শিবির করে? খবরে প্রকাশ, কুষ্টিয়া শহরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ সাহেবের পেছনের বাসাই হচ্ছে আবরারদের। তাদের পরিবারের বাপ-চাচা-দাদা সকলেই সক্রিয় রাজনীতি না করলেও আওয়ামী লীগের সমর্থক। এমনকি গত নির্বাচনে আবরারের আব্বা বরকতুল্লাহ সাহেব নাকি হানিফ সাহেবের পক্ষে কাজ করেছেন। আর নিয়মিত নামায-রোযা তো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি রাজনৈতিক দলের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা-নেত্রীরাই করেন। আবার অনেকেই করেন না। এটা তাঁদের যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটার জন্য শাস্তি পেতে হবে? তাহলে ধর্মকর্ম করা এ দেশে নিষিদ্ধ করে দিলেই হয়।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে আবরারের ফেসবুকচর্চা। মৃত্যুর আগের দিন বোধ হয় বাংলাদেশ-ভারতের অতি সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো নিয়ে সে ফেসবুকে তার মতামত প্রকাশ করেছিল। দেশের অগণিত মানুষের মত চুক্তিগুলো নিয়ে ছিল তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এতেই নাকি বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ‘মালিক-মোখতার’ বলে দাবিদার ছাত্র সংগঠনটির কতিপয় নেতা কুপিত হন। হ্যাঁ, তা তারা হতেই পারেন। সবাই যে বিষয়টি একভাবে দেখবেন তা তো নয়। আপনাদের ক্লাসে যখন কোনো একটি পাঠ্য বিষয় নিয়ে আপনারা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন কিংবা হলের ডাইনিংয়ের খাবার নিয়ে কেউ বলেন মাংসে ঝাল বেশি হয়েছে, কেউ বলেন কম, তখন কী করেন? নিশ্চয়ই ক্লাস রুমে বা ডাইনিং হলে তা মারামারির পর্যায়ে গড়ায় না। গড়ানো কাম্যও নয়। দেশে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃস্টান-চাকমা-মগ-মুরং-গারো-সাঁওতাল ইত্যাদি কত জাতি, কত ধর্মের মানুষ আছে। আমরা সবাই আবহমান কাল ধরে কেউ কারো ধর্ম বিশ্বাসের ওপর চড়াও না হয়ে অতুলনীয় সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করছি। আমরা তো বলি না, তোমার ধর্ম আমি মানি না, অতএব তুমি ধর্ম পরিবর্তন করে আমার ধর্মে আস। তাহলে ভারতের সঙ্গে চুক্তি যদি কারো মনঃপূত না হয় তাহলে তার ওপর চড়াও হতে হবে কেন? আর শুধু চড়াও হওয়া নয়, মারতে মারতে মেরে ফেলতে হবে? আবারও বলছি, এটা অবিশ্বাস্য, এটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এটাই কি আমাদের দেশে বাকস্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা?

৩.

আবার ফিরে যাই সেই গোড়ার কথায়। এই তরুণদের নষ্ট করেছি আমরাই, আমাদের রাজনীতি। আমাদের মিটিং-মিছিলে-নির্বাচনে এদের ছাড়া আমাদের চলে না। উত্তেজনাময় যে কোনো কিছুতে আসক্ত হয়ে পড়া তরুণ বয়সের ধর্ম। সে কারণে তরুণরা লেখাপড়া চাঙ্গে তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। সেই সঙ্গে থাকে তাত্ক্ষণিক প্রাপ্তিযোগ ও ভবিষ্যতের রঙিন খোয়াব—অমুক ভাইয়ের লেজ ধরে তার মতো নেতা হব, মন্ত্রী-মিনিস্টার হব। ঠিক আছে। সো ফার, সো গুড। এসব উন্মাদনা তাহলে বাবা শিক্ষাঙ্গনের বাইরেই রাখো। তা না, ছাত্রছাত্রী সবাইকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে, এক মতে, এক পথে চলতে হবে সবাইকে, নো ভিন্নমত। ব্যস, অমনি শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার। শিক্ষাঙ্গনের পবিত্র অঙ্গনও দূষিত হয়ে পড়ে বাইরের রাজনীতির অনুপ্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির নামে যেসব অনাচার চলছে তার প্রেক্ষিতে এসব রাজনীতি বন্ধ করা উচিত কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে একটি নিরপেক্ষ কমিশন হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা ও অপরিহার্যতা কতটুকু তাও বিবেচনা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, বহুদিন ধরে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় মানের দিক থেকে বিশ্বের এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও স্থান পাচ্ছে না। ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি কি এর দায় এড়াতে পারবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের কোনো কল্যাণে আসে না; বরং জন্ম দেয় হিংসা-জিঘাংসার, সেই লেজুড়বৃত্তির অপরাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

এবার একটা দারুণ নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের প্রসঙ্গে আসি। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরও দুই দিন নাকি মাননীয় উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম শেরে বাংলা হলে যাওয়ার সময় পাননি! এমনকি ছেলেটির লাশও দেখেননি, জানাযায়ও অংশগ্রহণ করেননি!! হায়, এ জীবনে এও দেখতে হলো! একজন শিক্ষকের কাছে আমরা এই সামান্য মনুষ্যত্বটুকুও আশা করতে পারি না? আমি বলব এটা অবিশ্বাস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী উপাচার্য মহোদয়ের সন্তানের মত। সন্তানের এই করুণ মৃত্যুর পরও...। এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই তিনি একটি ব্যাখ্যা দেবেন। তা না হলে পাবলিক বলতে বাধ্য হবে, আমাদের মাননীয় উপাচার্যদের হলো কী? (তালিকায় আছেন গোপালগঞ্জ, জাহাঙ্গীরনগর ইত্যাদি বিদ্যাপীঠের মাননীয়রা।)

কর্তৃপক্ষের কাছে সবিনয় নিবেদন: কুষ্টিয়ার আবরার, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী, ঢাকার সাগর-রুনি, কুমিল্লার তনু, বরগুনার রিফাত এবং এ রকম আরো অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘা হয়ত একদিন শুকিয়ে যাবে; কিন্তু শুকাবে না আঘাত, থামবে না হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। সেটা কি কারো জন্য মঙ্গলজনক হবে? হবে না বলেই কবি ও ছড়াকার রোমেন রায়হান ফেসবুকে লিখেছেন: দুমড়ে মুচড়ে স্বপ্নের মালা, আকাশ-ছোঁয়ার সাধ/প্রিয় বাবা তুমি প্রস্তুত করো তোমার চওড়া কাঁধ।/আগে চড়েছিল ছোট্ট আমিটা, এবার আমার লাশ/মুখোশে মুখোশে মানুষের সাথে শুয়োরের বসবাস। (ভয় পাচ্ছি, কারণ আবার ফেসবুক। কবি হিসেবে রোমেন রায়হানের ও উদ্ধৃতিকারী হিসেবে আমার না আবার ডাক পড়ে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে! আল্লাহ, তুমি রক্ষা করো, তোমার পানাহ্ চাই মাবুদ!!)

সেই সঙ্গে আজ থেকে ৮৮ বছর আগে মহান সৃষ্টিকর্তার সমীপে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্নটিও আজকের বাস্তবতায় নতুন করে রাখতে চাই: ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?।’ (প্রশ্ন; কাব্যগ্রন্থ : পরিশেষ, পৌষ ১৩৪৮)।

পুনশ্চ : কুষ্টিয়ার ছেলে আবরারের জন্য আমি এত বিচলিত বোধ করার, আমার মনটা কাঁদার একটি বিশেষ কারণও আছে। কারণটি হলো, এই ছোট্ট জেলাটির জন্য আমার অন্যরকম এক অনুভূতি, অন্যরকম ভালোবাসা। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসের এক শনিবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে ডেকে বললেন, তুমি আজই কুষ্টিয়া গিয়ে ডিসির দায়িত্ব নাও। কুষ্টিয়ার অবস্থা খুবই খারাপ।...আমি তখন জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বিমান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুদিন পর মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর আমি কুষ্টিয়া গিয়ে ডিসি হিসেবে যোগদান করি। ওটাই আমার প্রথম জেলা। মাই ফার্স্ট লাভ। এরপর যথাসাধ্য চেষ্টা করে সেই উত্তাল দিনগুলোতে সকলের সাহায্য-সহায়তা নিয়ে, বিশেষ করে কুষ্টিয়ার সর্বস্তরের মানুষের ও সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতায় বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলতে সক্ষম হই। ওই সময় অনেক তরুণ প্রাণকে অকালে ঝরে যেতে দেখেছি। মধ্যবিত্ত পরিবারের অত্যন্ত মেধাবী যুবক কুষ্টিয়া শহরের হাদী, চুয়াডাঙ্গার বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্টু ইত্যাদি রাজনৈতিক কারণে হিংসার পথে চলে গিয়েছিল। এদেরই কেউ ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে এই কুমারখালী শহরে ঈদের জামাতে তখনকার স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব গোলাম কিবরিয়াকে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে হত্যা করে। ১৯৭৫-এর ১৭ মার্চ মেহেরপুর মহকুমার প্রশাসকের অফিস ভবন, ট্রেজারি ও বাসস্থানে রাত ঠিক ১২টায় আক্রমণ চালিয়ে মন্টু বাহিনী আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রায় ৭০টি রাইফেল লুট করে নিয়ে যায় তারা। দৈবক্রমে মহকুমা প্রশাসক আলাউর রহমান চৌধুরী ও তাঁর পরিবার বেঁচে যান। সেই রাতে দুটোর দিকে পুলিশ নিয়ে আমি হাজির হই ঘটনাস্থলে। (প্রসঙ্গত, পুলিশ কনভয়ের সামনে থেকে নিজে জিপ চালিয়ে নেতৃত্ব দিই আমি।) ওই ১৯৭৫ সালেই গাংনী থানা আক্রান্ত হলে রাত ১০টার দিকে আমি নিজে ছুটে যাই সেখানে। এমনি আর কত স্মৃতি।... সব কিছুর ওপরে ছিল লালন সাঁইয়ের দেশের মানুষের ভালোবাসা। সেই আমি কী করে সইতে পারি ছেলেটির এই করুণ পরিণতি।

 লেখক : সাবেক সচিব, কবি

 [email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা