kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

ইয়েমেন এবং মরুর বালুতে সুপ্ত স্বপ্নরাজ্য

পেপি এসকোবার

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইয়েমেন এবং মরুর বালুতে সুপ্ত স্বপ্নরাজ্য

পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে কখনো অবজ্ঞা করতে নেই। করলে কী হয়, যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) সেটাই দেখছেন। সীমাহীন দুর্গতির ঝড় তুলেছে ইয়েমেনি হুতিরা।

সপ্তাহখানেক আগে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানান, কী করে আনসারুল্লাহ তথা হুতি বাহিনী তিনটি সৌদি ব্রিগেড আটক করে। অনেক ভাড়াটে সৈন্য এবং কয়েক শ যুদ্ধযানও আটক করে তারা। আনসারুল্লাহর দাবি, অন্তত ৫০০ সৌদি সৈন্য নিহত হয়েছে (সৌদি কোয়ালিশনের মুখপাত্র তা অস্বীকার করেছেন)। অভিযানটি চালানো হয় সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশে। কর্নেল (অব.) প্যাট ল্যাঙের মন্তব্য, ওই ঘটনা সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

নাজরান ইসমাইলি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। কিছুদিন আগে পর্যন্তও তারা শিয়াবিরোধী সৌদ বংশের বিরোধী ছিল না। অন্যদিকে তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলের শিয়ারা ১২ ইমামে বিশ্বাসী।

বৈরুতে বেশ কিছুদিন হাসান আলি আল-ইমাদের সঙ্গে কথা বলে কাটিয়েছি। তিনি একজন পণ্ডিত, রাজনীতিক; প্রভাবশালী একজন ইয়েমেনি শায়খের ছেলে; গোত্রে জায়দি। তিনি বলেন, মূল নিয়ামক হুতি আন্দোলন, শুধু হুতি গোত্র নয়। হুতি উত্তর ইয়েমেনের অনেক জায়দি গোত্রের একটি। রাজধানী সানাও দখল করে হুতি আন্দোলন, শুধু হুতি গোত্র নয়।

উত্তর ইয়েমেনের বেশির ভাগ গোত্র হুতি আন্দোলনে যুক্ত। ধারণা করা চলে, হুতি আন্দোলন ইয়েমেনের বেশির ভাগ গোত্রকে সৌদ বংশের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করবে। আল-ইমাদ ইয়েমেনের জটিল গোত্রীয় বিন্যাসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সেখানে ঐক্যকরণের একমাত্র নিশ্চায়ক আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই। তিনি বলেন, দক্ষিণ ইয়েমেনে যুদ্ধরত ভাড়াটে সৈন্যরা গণহারে হুতি আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে। ‘কোয়ালিশন’ আরো চ্যালেঞ্জে পড়বে। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে বোমা হামলা চালাচ্ছে কোয়ালিশন। আমিরাত আলোচনার কথা বলেছে, কোয়ালিশন এখন সৌদ বংশে এসে ঠেকেছে।

পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে। হুতিরা ইরানসমর্থিত; তারা রিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ছে। আল-কায়েদা এবং কিছু দায়েশের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে তাদের। সৌদ বংশ একটা ঘোর সৃষ্টি করেছে—তারাও একই ধরনের লড়াই চালাচ্ছে। আসলে তারা কিছু করছে না।

হুতিরা সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) বিরুদ্ধেও লড়ছে। তারা স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন চায়। আবুধাবি তাদের অর্থ ও সমরাস্ত্রের জোগানদাতা। ইয়েমেনে আবুধাবির সুপ্রিমো মহম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) কী স্বার্থ? তিনি আবার এমবিএসের গুরু। স্বার্থ হচ্ছে তেল। কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাব-এল-মান্দেব তাঁর নজরে; এটি আদন উপসাগর ও লোহিত সাগরের সংযোজক প্রণালি। সবটাই তেল-বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি। আদনে ও ইয়েমেনে দৃষ্টি রেখে চীন জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি বসিয়েছে।

মনসুর হাদির ইয়েমেন সরকার আসলে ঠুঁটো জগন্নাথ। তিনি একটি কাজই করতে পারেন, হুতিদের বিরুদ্ধে এসটিসিকে সমর্থন দেওয়া। তিনি তাঁর অভিযানকে পৌরাণিক মা’রিবের দিকে ঠেলছেন। মা’রিব ছিল শেবার রানি বিলকিছের রাজধানী। মা’রিবের দৃষ্টি রাব আল-খালিতে। সেই বিস্তৃত মরুভূমিতে রয়েছে নতুন এক আরব সাম্রাজ্যের স্বপ্ন। নিশ্চিতভাবেই তা দুর্নীতিপরায়ণ সৌদ বংশের জন্য নয়। আমিরাতের দিকে তাকান। মা’রিব শেখ জায়েদের (এমবিজেডের বাবা) পিতৃভূমি। ১৯৭০ সাল থেকে মা’রিবের পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। এমবিজেড বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চান। কিন্তু হুতিরা তাঁকে সফল হতে দেবে না।

সৌদ বংশের শাসকরা সহস্রাব্দ পুরনো মরুসভ্যতার কেন্দ্র অ্যারাবিয়া ফেলিক্সকে (দক্ষিণ আরব) ও তার জ্ঞানভাণ্ডারকে ধ্বংস করতে চায়। প্রকৃত ইয়েমেনিরা এর মাধ্যমেই সব হৃদয়ঙ্গম করে থাকে।

আবকাইকে হামলার পর ইয়েমেনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল মাশাদের মাধ্যমে হুতি আন্দোলন এমবিএসের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু তিনি শুধু বোমা হামলা ‘আংশিকভাবে’ থামাতে রাজি হন। ফলে ইয়েমেনি পক্ষ থেকে আরো বিপর্যয়কর হামলা অনিবার্য ছিল।

আবকাইক হামলা ও অপারেশন নাসরাল্লাহর পর এমবিএস পাল্টা হামলার পাকেচক্রে পড়েছেন, নিস্তার খুঁজছেন—এ কথা বললে কমই বলা হয়। ইয়েমেনে চার বছর ধরে নিরন্তর বোমা হামলা তাঁর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈরুতে বিরোধীপক্ষীয় বিশ্লেষকদের সঙ্গে সৌদি রাজনীতির পাশাখেলা বিষয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে। তাঁরা মনে করেন, এমবিএস হচ্ছেন রিয়াদে ট্রাম্পের প্রতিনিধি; স্বার্থ তেল। সিআইএ সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কথা ভেবে থাকতে পারে, তবে তার স্বার্থরক্ষকদের কর্তৃত্বে রেখে।

অস্থিতিশীলতাই বাস্তবতা। শুধু একটি বিষয় নিশ্চিত, হুতি হামলা সৌদি আরবে ঘটতে থাকবে; যতক্ষণ না এমবিএস যুদ্ধ থামান। অন্যথায় লন্ডনের ওয়ানওয়ে টিকিট কেটে রাখাই তাঁর জন্য ভালো হবে।

 

লেখক : ব্রাজিলীয় সাংবাদিক; এশিয়া টাইমসের লেখক

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

সংক্ষেপিত ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা