kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে

মিল্টন বিশ্বাস

৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করার সময় আমরা মাঝেমধ্যে দেখি যে উইপোকা খেয়ে ফেলে। এখন এই উইপোকাগুলো ধরা এবং তাদের বিনাশ করা এবং জনগণের কষ্টার্জিত টাকা যেন সঠিকভাবে ব্যবহার হয়, তার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’ দুর্নীতি ও দুঃশাসনে নিজের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান শুরু করেছি। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং এই অভিযান আমরা অব্যাহত রাখব। সে যে-ই হোক না কেন, এখানে দল-মত-আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই। যাঁরা এসবে সম্পৃক্ত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ উল্লেখ্য, শুধু কথায় নয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্ম মাসজুড়ে (সেপ্টেম্বর) দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান সাধারণ জনগণকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আশান্বিত করে তুলেছে। ক্যাসিনো কিংবা জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং যুবলীগে শুদ্ধি অভিযান এখন সবার কাছে প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষুব্ধ হওয়ার মূল কারণও ছিল দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে ওই নেতারা জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। এ জন্য তাঁদের পদত্যাগও করতে হয়েছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩ জানুয়ারি নিজের কার্যালয়ে প্রথম কার্যদিবসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত এবং এর অর্জনগুলো সমুন্নত রাখতে সরকার দুর্নীতিবিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখবে।’ এর পরই ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকদের অবস্থান নিতে আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘ঘুষ যে নেবে ও দেবে দুজনই সমান অপরাধী; বরং যে দেবে সে বেশি অপরাধী। এটা মাথায় রেখেই কাজ করতে হবে।’ ১৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানেও একই কথা পুনঃ উচ্চারণ করেন—‘যে ঘুষ খাবে সে-ই শুধু অপরাধী নয়, যে দেবে সে-ও সমান অপরাধী। এ বিষয়টা মাথায় রেখে পদক্ষেপ নিলে এবং এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ হলে অনেক কাজ আমরা দ্রুত করতে পারব।’

চতুর্থ মেয়াদে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে ১২ জুন সংসদে প্রশ্নোত্তরপর্বে শেখ হাসিনা দুর্নীতির প্রতি তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। পুনরায় বলেন, দুর্নীতি ও অপরাধ যে করবে এবং যে প্রশ্রয় দেবে—তারা সবাই অপরাধী। ঘুষ নেওয়া যেমন অপরাধ, দেওয়াটাও সমান অপরাধ। অপরাধী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অপরাধ করে ছাড় পাচ্ছেন না। তিনি মনে করেন, শুধু আইন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে দুর্নীতি ও অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়; এ জন্য সামাজিক সচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে। টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের কল্যাণ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। এ জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দুদক এখন শক্তিশালী একটি সংস্থা। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিনিয়ত তাত্ক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছে। এতে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির প্রবণতা কমে এসেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দুর্নীতির মাত্রাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।

২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ঘোষিত ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারের ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারের মধ্যে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছিল। ইশতেহার ঘোষণাকালে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি নিজে এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের যদি কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, সেগুলো ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি কথা দিচ্ছি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আরো সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব।’ প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার অনুসারে টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দরকার ‘স্বচ্ছ প্রশাসন’। আর সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও সমৃদ্ধির সব সুযোগ এবং সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে তখনই যখন জবাবদিহিমূলক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এ জন্য ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ : এই উপশিরোনামে বলা হয়েছে—‘দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ভবিষ্যতে আরো জোরদার করা হবে।’ এভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের সদিচ্ছার প্রমাণ রয়েছে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে।

মনে রাখা দরকার, বিএনপি-জামায়াত আমলে আমরা দুর্নীতির স্রষ্টাদের দুর্নীতিবিরোধী বয়ান শুনে শুনে আতঙ্কিত হয়েছি। এমনকি দুর্নীতি নিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে অনেক মুখরোচক কথা চালু রয়েছে। কথাবার্তায় আমরা প্রায় সবাই দুর্নীতিবিরোধী হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা দরকার, সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করি না। এমনকি দুর্নীতির নীতিগত উৎসাহদাতা অনেক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা প্রায়শ বলে থাকে দুর্নীতির কারণে এ দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই দুর্নীতির স্রষ্টাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ প্রতিনিয়ত মুক্তবাজার, বেসরকারীকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সরকারি সেবাগুলোর ওপর ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করার জন্য এবং দেশের রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে রাজনীতিবিদদের ক্রয়-বিক্রয়ে মেতে উঠছে অনেকেই—এ সম্পর্কেও রাজনৈতিক দলকে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক গবেষকই বলে থাকেন, মুক্তবাজারের প্রতিযোগিতাকে অবাধ করার অর্থই হলো দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। মুক্তবাজার নিজেই দুর্নীতির স্রষ্টা, এটাকে বজায় রেখে যাঁরা ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ ধরার প্রচেষ্টা চালান, তাঁরা অনেকটা জল ঘোলা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ খুঁজে ফেরেন। তাঁরা চান অর্থনৈতিক সক্ষমতায় দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে নামমাত্র পুতুল সরকার বজায় রেখে বিশ্বব্যাপী ধনী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে। ১/১১-এর সময় দেশ থেকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হটানোর যে হঠকারী আয়োজন হয়েছিল, সে ঘটনাও মনে রাখা দরকার। ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ১/১১-এর মতো যেন হঠকারিতা এই রাষ্ট্রে আর না হয়। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে এমনভাবে যেন তারা মনে না করে টাকা থাকলেই সমাজ সম্মান করবে। কারণ লেখাপড়ার উদ্দেশ্য যদি ভালো চাকরি পাওয়া হয়, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি কখনো উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু আমরা জানি যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিধি রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে গ্রেপ্তার করতে হবে। ফলে ‘দুদক’-এর কাজে এসেছে চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যেকোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কমেছে। মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য অনিয়ম ও দুর্নীতি করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—এ প্রত্যাশা সবার অতীতের অনিশ্চয়তা, সংকটের চক্রাবর্ত এবং অনুন্নয়নের ধারা থেকে বের করে এনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিপথে পুনঃ স্থাপিত করতে হলে তো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ,

তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা