kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে ব্রিটেন

অনলাইন থেকে

৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গত কয়েক দিনে বহুবার সমঝোতা করেছেন। অন্তত তাঁর দাবি তেমনটাই। নতুন ব্রেক্সিট প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তিনি। সম্প্রতি ম্যানচেস্টারে দলীয় সম্মেলনে তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে তিনটি সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। আরো চারটি সমঝোতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনকে (ইইউ) লেখা চিঠিতে। আরো দুটির প্রসঙ্গ এসেছে গত বৃহস্পতিবার ওয়েস্টমিনস্টারে এমপিদের সামনে দেওয়া ভাষণে।

এগুলো উদ্দেশ্যমূলক হলেও পুরোপুরি সুনির্দিষ্ট নয়। গত বছর টেরেসা মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যে প্রস্তাবটি নিয়ে আসেন, তা জনসনের কনজারভেটিভ পার্টির ব্রেক্সিটপন্থী অংশ প্রত্যাখ্যান করে। ওই প্রস্তাবটি নিয়ে ইইউ ও ব্রিটেনের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমানোর উদ্দেশ্য থেকেই এবারের প্রস্তাবটি পেশ করেছেন জনসন। মের আনা প্রস্তাবের পক্ষে অবশ্য গত মার্চে জনসন নিজেই ভোট দিয়েছিলেন। এ সত্যকে এক পাশে সরিয়ে রেখে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ব্যাকস্টপ প্রসঙ্গে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে নতুন এই প্রস্তাব দিয়েছেন জনসন।

যদিও নতুন প্রস্তাবটি ইইউয়ের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়। এই সংস্থার সঙ্গেই তিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছতে চাইছেন। এই প্রস্তাব মূলত ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সঙ্গে একটি সমঝোতা। মের তুলনায় ডিইউপিকে আরো বেশি ছাড় দিতে চাইছেন জনসন। তিনি ওই দলের সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন, দলের নেতাদের ডাউনিং স্ট্রিটে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এমনকি যুক্তরাজ্য থেকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে আলাদা করার বিবেচনা ঠিক হবে না বলে তারা যে দাবি জানিয়েছে, তা-ও পূরণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ডিইউপিকে সন্তুষ্ট করার জন্য জনসন এখন বলছেন, পুরো আয়ারল্যান্ডের জন্য একটি আলাদা নিয়ম সীমিত সময়ের জন্য তৈরি করা যেতে পারে; যার অর্থ হলো, যুক্তরাজ্য ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ভিন্ন নিয়মের মধ্যে অবস্থান করবে। দীর্ঘ মেয়াদে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যেও শুল্কব্যবস্থার অংশ হবে বলে ডিইউপির যে দাবি জনসনের বর্তমান অবস্থা তার প্রতিও সমর্থন প্রকাশ করেছে। তবে তারা শুধু নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করছে। আয়ারল্যান্ডের বৃহত্তর রাজনীতি, ব্রিটেন অথবা ইইউয়ের সঙ্গে তাদের এ নিয়ে মতবিনিময় হচ্ছে না।

তিনটি বড় ইস্যু এড়িয়ে গেছেন জনসন। প্রথমটি হচ্ছে, ডিইউপি নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জন্য কথা বলছে না। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের মানুষ ২০১৬ সালের গণভোটে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল। জনমত জরিপগুলোতে নিয়মিত দেখা যায়, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের মানুষ এখনো ব্যাকস্টপকে সমর্থন করে। তারা চায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এবং সর্ব আয়ারল্যান্ড অর্থনীতি সমুন্নত রাখতে আগ্রহী তারা। জনসন ডিইউপির কথা এমনভাবে শুনছেন, যেন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সরকার এই দল গঠন করেছে। ডিইউপির ব্রেক্সিটপন্থী অবস্থানের বিপরীতে যারা রয়েছে, তাদের কথা ভাবছেন না জনসন। এর মধ্য দিয়ে ডিইউপির কর্তৃত্বও ধীরে ধীরে খর্ব হচ্ছে। এভাবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাজি হলেও নিজের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারবেন না জনসন।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো, জনসনের পরিকল্পনাগুলো নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের শান্তিপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে না। মে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাতে বেলফাস্ট বা গুড ফ্রাইডে চুক্তি অটুট রাখার কথা বলা হয়েছিল। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের শান্তিপ্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি এটি। ইইউ থেকে প্রত্যাহারের ব্যাপারে ব্রেক্সিটের পরও যুক্তরাজ্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো ‘বিশেষ কাঠামো’ নির্মাণ করবে না বলেও সম্মত হয়েছিল। এ ব্যাপারে ইইউয়ের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল ব্রিটেন। এর আগের প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়নি তার অন্যতম কারণ টেরেসা মের সরকার এই প্রতিশ্রুতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিল। টোরি পার্টির বর্তমান ও অতীত বহু সদস্যের মতো জনসনও এসব দায়বদ্ধতার তোয়াক্কা করেন না। তাঁর পরিকল্পনাও একইভাবে ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎপরিণতির তোয়াক্কা করে না।

আর শেষ সমস্যাটি হচ্ছে, জনসনের পরিকল্পনার অনিশ্চয়তা ইউরোপের একক বাজারে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করবে। তিনি সমাধানের জন্য কার্যকর কোনো প্রস্তাব দেননি। বাণিজ্যব্যবস্থার মূলনীতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের যেকোনো ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক। আবার একেবারে শিথিল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ক্রেতাস্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে। জনসন ও তাঁদের কট্টরপন্থী সহযোগীরা এই বাস্তবতার কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।

এই বাস্তবতাগুলো অপরিবর্তনীয়। আয়ারল্যান্ডের জনগণের প্রতি ব্রিটেনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্রিটেনের নৈতিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এর কোনোটিই সরকারের নতুন প্রস্তাবে প্রকাশ পায়নি। আইরিশ বা ইউরোপের প্রতি ব্রিটেনের যে আচরণ, তাতে বিশ্বস্ততা প্রকাশ পায় না। জনসনের দৃষ্টিতে এটিই সমঝোতা; কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে একে বলা হয় বিশ্বাস ভঙ্গ।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা