kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

ট্রাম্পকে ঠেকাতে হুইসেলব্লোয়ার

ফরিদুল আলম

৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ট্রাম্পকে ঠেকাতে হুইসেলব্লোয়ার

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কায়দামতো ধরার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ মার্কিন ডেমোক্র্যাট শিবিরে সম্প্রতি কিছুটা স্বস্তি এসেছে এক ফোনালাপ ঘিরে। গত ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোডিমির জেলেনস্কির সঙ্গে প্রায় ৩০ মিনিট টেলিফোনে কথোপকথনে তিনি সেখানে একটি পূর্বঘটিত দুর্নীতির তদন্তের জন্য তাঁকে চাপ সৃষ্টি করেন, যেখানে ২০২০ সালের নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের নাম জড়িত আছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, সামরিক সহায়তা বাবদ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ করা ৩৯১ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের অর্থ ছাড়ের শর্ত হিসেবে এই দুর্নীতির তদন্ত আবার শুরু করতে তিনি চাপ সৃষ্টি করেন, যা তাঁদের ভাষায় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছেন একজন রাষ্ট্রপতি। এই তথ্য প্রথম আসে একজন হুইসেলব্লোয়ারের মাধ্যমে, যিনি একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তাঁর নাম যদিও প্রকাশিত হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি একসময় হোয়াইট হাউসে কর্মরত ছিলেন এবং এই ফোনালাপের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। উন্নত দেশগুলোর অনেকখানেই এ ধরনের হুইসেলব্লোয়ারের প্রচলন আছে, যাঁরা যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেন এবং আইনত সব ধরনের সুরক্ষা ভোগ করে থাকেন। স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকল্পে এ ধরনের হুইসেলব্লোয়ার কর্তৃক আনীত অভিযোগ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে সাত কর্মদিবসে প্রতিনিধি পরিষদের নজরে আনার বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি, বরং অনেকটা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির উদ্যোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালক বিষয়টি প্রথমে চেপে গিয়েছিলেন—এমনটি কংগ্রেসের ইন্টেলিজেন্স কমিটির কাছে স্বীকার করে এও বলেছেন যে হুইসেলব্লোয়ার এ ধরনের অভিযোগ করে সিবশ্বাসে সঠিক কাজটিই করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় মনে করা হচ্ছে যে হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ উত্থাপন এবং নিরাপত্তাপ্রাপ্তির বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রাধিকার থাকলেও এ ক্ষেত্রে তাঁর অভিযোগটি যথার্থভাবে মূল্যায়িত হচ্ছিল না এবং পরবর্তী সময়ে জানাজানি হয়ে গেলে তা আমলে নেওয়া হয়। তদন্তপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এদিকটি ক্রমেই সামনে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় রাজনীতি এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার চরিত্র বিশ্লেষণ করলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা যে বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই তা হচ্ছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক দলের কোনোটিই উভয় কক্ষে কখনো নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারে না। ফলে অভিশংসনের মতো গুরুতর অপরাধ করলেও কোনো প্রেসিডেন্টকে যে ইমপিচ করা সম্ভব হবে, সে নিশ্চয়তা নেই। এ ধরনের এক অবস্থায় তাই বিরোধী পক্ষ অনেক সময় সচেতনভাবেই এই পথ পরিহার করে থাকে। কারণ এতে রাজনীতিতে তাদের প্রতি জনগণের এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে। বর্তমান সময়টি বিশ্লেষণ করলেও আমরা যা দেখতে পাই তা হচ্ছে, ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের নির্বাচনের প্রচার চলাকালে ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে রুশ গোয়েন্দারা নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের অনুকূলে নিয়ে আসতে যে গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়েছিল, তা ছিল অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’। এ বিষয় নিয়ে পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাটদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রবার্ট মুলারের নেতৃত্বে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেলেও এমন সময়ের মধ্যে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটে ব্যাপকভাবে রিপাবলিকানদের বিজয় অর্জন প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। যে সময়টিতে তাঁরা মুলারের প্রতিবেদন ঘিরে নিজেদের একাট্টা করার জন্য তৎপর হয়েছিলেন সে সময় ট্রাম্পের নির্বাচনী সাফল্যের সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, বেকারত্ব মোচন এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতগুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো অভিশংসন প্রস্তাব আনতে তাঁদের নিরুৎসাহ করে। এ ধরনের অভিশংসন প্রস্তাব ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সহজে পাস হয়ে গেলেও সিনেটে অনুমোদন পেতে যেহেতু দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ১০০ জনের মধ্যে ৬৭ জন সিনেটরের সমর্থন লাগে, তাই তাঁদের এ ধরনের প্রচেষ্টার ব্যর্থতা প্রকারান্তরে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে আরো দুর্বল করে দিতে পারে ভেবে এত দিন ধরে অভিশংসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এখন আমাদের দেখতে হবে বর্তমান সময়ে এ ধরনের অভিশংসনের চেষ্টা সফল করতে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও ঠিক কী কারণে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। এখন যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হচ্ছে, ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপের এক সপ্তাহ আগে সামরিক সহায়তা বাবদ ৩৯১ ডলার সহায়তা সাময়িকভাবে বন্ধের জন্য ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে ৯ সেপ্টেম্বর হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগের বিষয়টি কংগ্রেসের সামনে এলে এ বিষয়ে তথ্য প্রদানে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অপারগতা প্রকাশ করা হলে এর ভেতর ট্রাম্পের ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে মর্মে সন্দেহের উদ্রেক হয়। এর দুই দিনের মধ্যে ১১ সেপ্টেম্বর সামরিক সহায়তার অর্থ ছাড় দেওয়া হয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে হোয়াইট হাউস বিষয়টি আগেই জানতে পেরেছিল যে এই হুইসেলব্লোয়ার যে এ ধরনের একটি অভিযোগ করেছেন। আর সে জন্যই ধারণা করা যায় যে তড়িঘড়ি করে স্থগিত করা অর্থ ১১ সেপ্টেম্বর ছাড় দেওয়া হয়। ডেমোক্রেটিক দলের পক্ষ থেকে এই ফোনালাপ ঘিরে ট্রাম্পের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং এই ফোনালাপের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি উঠতে থাকলে ট্রাম্প আত্মপক্ষ সমর্থন করে শুধু দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান। সেই সঙ্গে তিনি এও জানান যে এই সামরিক সাহায্যের অর্থ না দিতে তাঁর গড়িমসি করার অর্থ ছিল ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইউক্রেনের বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল করা। পরবর্তী সময়ে তিনি এই আলোচনার বিবরণ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভেবেছিলেন যে এর মধ্য দিয়ে কার্যত জনসমক্ষে ডেমোক্র্যাটদের ভাবমূর্তি তিনি ক্ষুণ্ন করতে পারবেন। সেটি না হয়ে ঘটল ঠিক বিপরীত, তাঁর আলোচনার অনেক জায়গায় তিনি জো বাইডেনের ছেলের কথা উল্লেখ করেন এবং স্পষ্টতই ধারণা পাওয়া যায় যে অর্থছাড়ের বিনিময়ে তিনি ইউক্রেনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সুযোগ নিতে চাইছেন।

বর্তমানে ডেমোক্র্যাটরা এই ফোনালাপের রেকর্ড পাওয়ার পর অনেকটাই আশা করছেন যে শিগগির এই তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিনিধি পরিষদে পাস করানো সম্ভব হবে এবং সেই সঙ্গে ডেমোক্রেটিক অধ্যুষিত এমন কিছু রাজ্য আছে, যেখান থেকে বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকান দলীয় সদস্যরা রয়েছেন, তাঁরাও পরবর্তী নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ মেলাতে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করতে পারেন। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, যেকোনো অবস্থায়ই ৬৭টি ভোট এই অভিশংসনের পক্ষে অর্জন করা শুধু দুরূহই নয়, অনেকটা অসম্ভবও। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই মুহূর্তে ট্রাম্পবিরোধীরা এটিই চাইছেন, যেন আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় অর্জন সহজ না হয়। এত দিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির বিষয় নিয়ে জনমনে দ্বিধাবিভক্তির বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়েছিল। এখন গুরুতর একটি অভিযোগ এমন একজন কর্তৃক উত্থাপিত হলো, যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে সংক্ষুব্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে এ ধরনের ফোনালাপে গুপ্তচরবৃত্তির নিন্দা জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ভোলোডিমির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি এই মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রতি সহানুভূতিশীল, যা প্রকারান্তরে বিষয়টির যথার্থতা তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানকে আরো শক্ত করতে পারে। সব কিছুর ঊর্ধ্বে এই মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের প্রচেষ্টা থেকে এটিই ধারণা করা যেতে পারে যে তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ট্রাম্পকে অভিশংসিত করা নয়, কারণ এটি তাঁদের পক্ষে অত্যন্ত দুঃসাধ্য; বরং এই ইস্যুকে নিয়ে একটি শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া, যা ২০২০ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। বিগত নির্বাচনে রাশিয়ার সমর্থনের বিষয়টি যেমন বর্তমানে স্পষ্ট, এর সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুটির মিশেল করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে ক্ষমতার জন্য ট্রাম্প নিজের জনগণের চেয়ে বহিঃশক্তির ওপর অধিক নির্ভরশীল। এটিকে জনগণের কাছে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরাই হয়তো এই মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের মূলমন্ত্র।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা