kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

রঙ্গব্যঙ্গ

ক্যাসিনো যুবকের টাকার বস্তা

মোস্তফা কামাল

৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্যাসিনো যুবকের টাকার বস্তা

ছেলেটির নাম চান মিয়া। বয়স ষোলো-সতেরো হবে। ঢাকা শহরে ফুটপাতে তার জীবন কাটে। জন্মের পর থেকেই সে দেখে আসছে, ফুটপাতই তার ঘরবাড়ি। কাগজ কুড়িয়ে সে জীবিকা নির্বাহ করে। একদিন সকালে কাগজ কুড়াচ্ছিল। হঠাৎ এক যুবক একটি বস্তা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই, এটা ধর।

এটার মধ্যে কী আছে? চান মিয়া জানতে চাইল।

যুবক বলল, ওর মধ্যে কাগজ আছে। নিয়া যা।

চান মিয়া কাগজ মনে করে হাতে নিয়ে বলে, বস্তায় ভইরা কাগজ দিলেন! এই রকম তো কেউ দেয় না!

যুবক ছেলেটি বলল, কেউ দেয় না, আমি দিলাম। নিয়া যা।

এর মইধ্যে অন্য কিছু নাই তো?

অন্য কিছু আবার কী থাকব?

এই ধরেন, টাকা-পয়সা!

টাকা-পয়সা! তোর এইটা মনে হইল কেন?

কেউ নাকি টাকা-পয়সা ঘরে রাখতেছে না। সব টাকা বস্তায় ভইরা ডাস্টবিনে ফালাইয়া দিতাছে।

তাই নাকি!

হ। সবাই নাকি ক্যাসিনোর টাকার ভাগ পাইছে। র‌্যাব সেই টাকার খোঁজে মাঠে নামছে। যার ঘরে বেশি টাকা-পয়সা পাওয়া যাইব, তার আর রক্ষা নাই। ভাই, আপনের ঝামেলা আমার ওপর চাপাইলেন নাকি?

আরে না না! কোনো ঝামেলা নাই। আমি গেলাম। আমার খুব তাড়া আছে।

যুুবক ছেলেটি এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না। সে চলে গেল। তারপর চান মিয়া বস্তার মুখ খুলল। খোলামাত্র তার পিলে চমকানোর মতো অবস্থা হলো। সে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে টাকার দিকে তাকিয়ে থাকে। থরথর করে তার বুক কেঁপে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে সে বস্তার মুখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে এমন কাঁপুনি শুরু হয় যে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। তার ভীষণ পানির পিপাসা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! কাঁপুনিও কমছে না। বসে বসে ভাবে, এত টাকা! এত টাকা নিয়া আমি কই যামু। কী করুম। হায় খোদা! লোকটা আমার হাতে ধরাইয়া দিয়া কই গেল? যেইভাবে র‌্যাবের গাড়ি ঘুরতাছে! যদি দেইখা ফালায়! যদি কয়, এই টাকা ক্যাসিনোর টাকা! তহন তো বিরাট ঝামেলায় পড়মু। এত টাকা লইয়া আমি কই যাই?

চান মিয়া চারদিকে তাকায়। কেউ দেখল কি না দেখে। তারপর টাকার বস্তা কাঁধে চাপিয়ে দৌড় শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর এক পথচারী জানতে চায়, এই! তুই দৌড়াচ্ছিস কেন?

আর কইয়েন না ভাই! একটা যুবক পোলা আমার কাছে ঝামেলা চাপাইয়া পালাইছে। আপনে নিবেন? লইয়া যান। অনেক টাকা!

অরে বাপ রে! ক্যাসিনো যুবকের টাকার বস্তা নিয়া বিপদে পড়ব? না না! তুমি নিয়া যাও।

তাইলে আমারে আটকাইলেন কেন? এমনেই আমি বিপদে আছি!

চান মিয়া আবার দৌড় শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর আরেক বয়স্ক পথচারীর সঙ্গে তার দেখা। সেই পথচারী জিজ্ঞেস করল, এই ব্যাটা, দৌড়াচ্ছিস কেন? কী সমস্যা?

টাকার বস্তার সমস্যা।

মানে!

টাকার বস্তা লইয়া বিপদে আছি। আপনে কি আমারে বিপদ থেইক্যা উদ্ধার করবেন?

কেন? চুরিচামারি করে নিয়া আসছিস নাকি?

না না! একটা যুবক পোলা আমারে দিছে।

তার মানে ক্যাসিনোর টাকা?

জানি না। হইতে পারে।

বলিস কী! তাইলে তো সত্যি সত্যিই বিপদ! না রে বাবা না। আমি ওই বিপদ সামলাইতে পারব না।

চান মিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, হায় রে! কেন যে আমি বস্তা নিতে রাজি হইলাম!

চান মিয়া আবার দৌড় শুরু করল। এখন তার দৌড়াতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আর খুব কষ্ট করে সামনে পা ফেলছে। এবার এক মহিলা পথচারী চান মিয়ার পথ আগলে দাঁড়াল। তার কাছে জানতে চাইল, কী রে, সমস্যা কী?

ঘাড়ে সমস্যা।

মানে!

টাকার বস্তা ঘাড়ে নিয়া তিন মাইল দৌড়াইলাম। আর পারতেছি না।

টাকার বস্তা!

জে। একটা যুবক পোলা টাকার বস্তাটা আমার হাতে ধরাইয়া দিয়া ভাগছে।

যুবক পোলা দিছে? তার মানে ক্যাসিনোর টাকা! দে দে! আমারে দে। আমি তো ক্যাসিনোর টাকা খুঁজতেই বের হইছি।

কন কী! আপনে জানলেন কেমনে এইডা ক্যাসিনোর টাকা?

আরে! র‌্যাবের অভিযানের ভয়ে ক্যাসিনোর টাকা কেউ এখন আর ঘরে রাখতে পারছে না। কেউ রাস্তায়, ডোবা-নালায় ফেলছে। আবার কেউ বন্ধুবান্ধবকে দিচ্ছে। কেউ কেউ বিদেশে পাচার করারও চেষ্টা করছে। আমি খুব সমস্যায় আছি। চাকরিবাকরি নেই। ঘরে খাবার নেই। হাজব্যান্ড মাদকাসক্ত। বাইরে বের হইলে একটা ব্যবস্থা হবে। ক্যাসিনোর টাকা যেভাবে উড়ছে!

খুব ভালো। আপনে নিয়া যান। আমি আর বিপদ সামলাইতে পারতেছি না। এইবার আপনে সামলান!

চান মিয়া মহিলার কাছে বস্তা দিয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

 

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা