kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

‘শুদ্ধি অভিযান’ চলতেই থাকুক

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘শুদ্ধি অভিযান’ চলতেই থাকুক

এখন অলোচনায় রয়েছে আওয়ামী লীগের ‘শুদ্ধি অভিযান’। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত দলে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চলবে বিধায় সব স্তরের নেতাকর্মীরা কিছুটা নড়েচড়ে বসেছেন। দলের হাইকমান্ড থেকে বারবার বলা হয়েছে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, ইয়াবাখোর ও মাদক কারবারের সঙ্গে দলের কেউ জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিজে দলকে শুদ্ধ করতে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এই শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে পরিবর্তন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের নেতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি যথেষ্ট চাঞ্চল্য পেয়েছে। এরই মধ্যে ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ থেকে শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর পদে থাকার বৈধতা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে যথাযথ তদন্ত করে দেখলে থলের কালো বিড়াল বের হয়ে আসার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। দলের অনেক নেতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের আখের গোছাতে সব সময়ই ব্যস্ত। বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক লাভবান হওয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছেন সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মী। 

সারা দেশে আওয়ামী লীগের যখন জয়জয়কার অবস্থা তখন তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এই শুদ্ধি অভিযানের প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে অনুভূত হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পর্কে সাধারণদের উত্থাপিত নানা অভিযোগের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করেন কিংবা সেগুলো আমলে নেন না। দীর্ঘদিন থেকে এ অবস্থা বিরাজ করায় নানা ক্ষেত্রে সরকারকে বিব্রত হতে হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি এবং দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগের ফলে এ বিষয়ে সব স্তরের সাংগঠনিক কমিটিগুলো কিছুটা সচেতন হয়েছে।

দলের ভেতর বিভেদ সৃষ্টিকারী, বিদ্রোহী, অনুপ্রবেশকারী রয়েছে অনেক। ছাত্রলীগ, যুবলীগের মতো আওয়ামী লীগের মূল দলের তৃণমূল পর্যায় নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীরাই অনেকাংশে দায়ী। সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের আধিপত্য, দখলদারি প্রভৃতি নিয়ে প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে সংবাদ লক্ষ করা যায়। আর সেগুলো সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘কর্তৃপক্ষ নয়, হল চালাচ্ছে ছাত্রলীগ!’ শিরোনামে প্রতিবেদনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীরা কিভাবে হলে সিট বাণিজ্য ও আধিপত্য বিস্তার করছেন এবং এতে প্রশাসনের ভাবমূর্তি কতটুকু ক্ষুণ্ন হচ্ছে তার প্রমাণ কিছুটা পাওয়া যায়। এমন অবস্থার ফলে সরকারের ভাবমূর্তি প্রতিনিয়ত খর্ব হচ্ছে। এসব ঘটনার কোনোটি গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পারি, আবার কোনোটি গণমাধ্যমে আসে না।

বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের অনেক অগ্রযাত্রা থাকলেও তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কিছু সরকারদলীয় নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডে যথাযথ সুশাসন বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। সরকার যদি প্রকৃতপক্ষেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাতে হবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বারবার হুঁশিয়ারি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যথাযথভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে না ।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানাবিধ অনিয়ম ও অন্যায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন কিংবা অনিয়মের কথা শোনা যায়। সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয় না। এমনকি সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মী অনেক ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচার ব্যবহার করে চলেছেন। কিন্তু এসবের প্রতিকার হচ্ছে না। বহু প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ার অজুহাতে তাদের পদে বসিয়ে রাখা হয়েছে। যিনি নৈতিক যোগ্যতা হারাবেন, তাঁর কি পদে থাকার যোগ্যতা আছে? এসব ক্ষেত্রে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে সেটিও শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ এসব বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই পরবর্তীকালে অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের মূল স্লোগান হলো সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে সুবিধাবাদী এবং সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারীরা। দীর্ঘদিন থেকে শুনে আসছি, দেশব্যাপী শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে। কিন্তু আদৌ এ বিষয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা লক্ষ করিনি।

গত বছরের ৭ এপ্রিল কালের কণ্ঠে ‘জামায়াত-শিবির থেকে আওয়ামী লীগে পদধারী’ শিরোনামে একটি শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে জামায়াত-বিএনপির লোকেরা আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ পদও লাভ করেছে। প্রায়ই গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে কিংবা যুবলীগে এমন অনুপ্রবেশকারীর গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। যারা দীর্ঘদিন থেকে মূল সংগঠনে আছে, তাদের বাদ দিয়ে কোনো ক্ষেত্রে এমন অনুপ্রবেশকারীদের পদ পাওয়ার বিষয়টি প্রকৃত আদর্শের মানুষদের ব্যথিত করছে। এসব ইস্যুতে প্রায়ই দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। যারা পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধাচরণসহ দলের নেতাকর্মীদের নানাভাবে শোষণ করার চেষ্টা করেছে, তাদের অনেকেই এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে। ইদানীং বিভিন্নভাবে শোনা যায়, অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কিংবা এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে পদ বাণিজ্য হচ্ছে। ওই সব হাইব্রিড নেতাদের নিয়ে, দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। মূলত সাত দশকে দলটির গৌরব, ঐতিহ্য, সাফল্য ও অর্জনের অজস্র ইতিহাস ও স্মারক থাকলেও নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অন্য দল থেকে এসে কমিটিতে পদ পাওয়া অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে দলে বেশ সংকট রয়েছে। এ ধরনের সুবিধাবাদী নেতার কারণে সারা দেশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েছে; বেড়েছে সংঘাত-সহিংসতা। মূলত গুটিকয়েক বিতর্কিত লোকের জন্য সরকারের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই এসব বিতর্কিতের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা