kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

দিল্লির চিঠি

উভয়সংকটে বিজেপি সরকার

জয়ন্ত ঘোষাল

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উভয়সংকটে বিজেপি সরকার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি আসছেন ৩ অক্টোবর। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকা গিয়ে আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয় নিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেনি। বেসরকারিভাবে কূটনৈতিক ট্র্যাক-টু কৌশল অবলম্বন করে ঢাকা-নয়াদিল্লির সঙ্গে অবশ্য কথা বলছে নিরন্তর। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকেও হাসিনাকে অভয়বাণী দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) নিয়ে সিদ্ধান্ত বদল তো করেনি। শেখ হাসিনা দিল্লি এলে মোদির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে—এমনটা ধরে নেওয়া যায়।

এর আগে আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম এ বিলটি নিয়ে। তখন বলেছিলাম, দেশের ভেতর বিজেপির মতাদর্শগত অবস্থান এ ব্যাপারে যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশকে অসন্তুষ্ট করা কখনোই ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে না। আমরা আজ আবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। কিন্তু কেন? করছি কারণ ইতিমধ্যে আসাম নামক রাজ্যটিতে এই নাগরিকপঞ্জি নিয়ে তুলকালাম শুরু হয়ে গেছে। আসামের বিজেপি রাজ্য সভাপতি সাংবাদিক বৈঠক করে ঘোষণা করেছেন, নাগরিকপঞ্জি থেকে এভাবে নাম বাদ দেওয়াকে বিজেপি সমর্থন করছে না। কী আশ্চর্য! এদিকে আসামের সব মুসলিম সংগঠন একত্র হয়ে নাগরিকপঞ্জি থেকে ১৯ লাখ লোকের নাম বাদ যাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। এ তো অদ্ভুত কাণ্ড! কেন এমন হলো? সংবাদে প্রকাশ, প্রথম দফায় যে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ গেছে, তার মধ্যে ১২ লাখ কিন্তু হিন্দু। মুসলমান নয়। আর এক লাখ গোর্খা। এই তথ্য প্রকাশের আগেও বিজেপি এমনটা প্রত্যাশা করেনি। মনে করা হয়েছিল আসামের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে অনেক বেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মুসলিমদের নাম পাওয়া যাবে। বাস্তবে রিপোর্টটি প্রকাশের পর দেখা গেল তা কিন্তু হয়নি। আবার প্রশ্ন কেন? বিজেপির কিছু নেতা এখন বলছেন, বহু অনুপ্রবেশকারী মুসলিম এসেই তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের সাহায্যে রেশন কার্ড এবং ভোটার তালিকায় নাম ঢুকিয়ে নেয়। রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল শাসকদলের। আর হিন্দু ‘শরণার্থী’, তারা নাগরিকত্ব নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কারণ তারা হিন্দু বলে তাদের নিরাপত্তার কোনো অভাববোধ ছিল না।

এখানে পাঠকদের জানানো প্রয়োজন যে আসামের নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজটি কিন্তু রাজ্য সরকার করেনি। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারও করেনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি হয়েছে NRC কর্তৃপক্ষ। এই কর্তৃত্বের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত সরকারি প্রশাসক বা আমলা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগুই নিজে আসামের বাসিন্দা। তিনি নিজেও এই নাগরিকপঞ্জি তৈরিতে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনিই আগস্ট মাসের মধ্যে সরকারকে তালিকা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন আর সে কারণে অমিত শাহ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে এই তালিকা আদালতের কাছেও জমা দিতে হয়। যেহেতু অবৈধ অনুপ্রবেশ কংগ্রেসের চেয়েও বিজেপির কাছে অনেক বড় বিষয়, সে জন্য মোদি-অমিত শাহ এখন কার্যত বাঘের পিঠে চেপেছেন। বাঘের পিঠ থেকে নামেন কী করে?

দেখুন, সোজাসাপ্টা বলি, এই নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজটি কিন্তু মোদি জামানায় এবং আসামে বিজেপি জামানায় শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল কংগ্রেস জামানায়। তখন মনমোহন সিংহ দেশের প্রধানমন্ত্রী। তখনো আদালতের নির্দেশে এই কাজ শুরু হয়।

অতএব বিষয়টি প্রাচীন কিন্তু বিজেপির মনে হয়েছিল এটি দেশজুড়ে প্রচার হলে বিজেপির ভোট সুসংহত হবে। কারণ আজ পৃথিবীজুড়েই ইমিগ্রেশন এক মস্তবড় ইস্যু। ইউরোপ, লন্ডন এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকায় এখন এই বেআইনি অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্ব বড় নির্বাচনী ইস্যু। এ হলো দক্ষিণপন্থী পপুলিস্ট রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য। এই নাগরিকপঞ্জি গঠনের ফলে কিন্তু বিজেপির সমর্থককুল খুবই আহ্লাদিত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মহলেরও এক জনসমাজ মনে করছে, মোদি-অমিত শাহর হিম্মত আছে। ৩৭০ উচ্ছেদ যেমন তারা করে দেখিয়েছে, ঠিক সেভাবে এই নাগরিকপঞ্জি নিয়েও গোটা দেশ তারা বিল এনে কার্যকর করেই ছাড়বে। মমতা যেমন বাঙালির বিষণ্নতাকে রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাইছে, তেমনি বিজেপি জানাতে চাইছে ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি মুসলমানদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

আসামের মধ্যেও বিভিন্নতা আছে। ভারত বড় বিচিত্র এক দেশ। বৃহৎ দেশ। প্রচুর জনসংখ্যা। কাছাড় উপত্যকা, যা শিলচর বলে পরিচিত অতীতে যাকে বলা হতো শ্রীহট্ট। শ্রীচৈতন্য দেব থেকে বিপিন চন্দ্র পাল নামক বাঙালির স্মৃতিবিজড়িত স্থান এই এলাকায় বঙ্গসন্তান নাগরিকরা কিন্তু বাংলাদেশি নয়, তারা হলো ভারতীয় শিলেটি। তারা কিন্তু বাংলাদশিদের চেয়ে কম উদ্বিগ্ন নয়। বহু ভারতীয় বাঙালি শিলেটির বার্থ সার্টিফিকেট নেই। কারণ অতীতে প্রাচীনপন্থী পরিবারে তখন নাগরিকত্ব নিয়ে এমন সচেতনতা ছিল না। কী করা যাবে? তখন অনেকেই বার্থ সার্টিফিকেট করাননি। অনেকে স্কুল পরীক্ষার সময় অ্যাডমিট কার্ড পেয়েছিল। তাতে জন্ম সাল, তারিখ ও জন্মস্থান আছে। যাদের নেই? তারা কী করবেন? এ তো কেলেঙ্কারি! কদিন আগে আমি কলকাতা গিয়েছিলাম। ব্যক্তিগত কাজে দমদম পুরসভায় গিয়ে দেখি বিরাট লাইন। কী ব্যাপার? খুব ভিড়। এরা রেশন কার্ড করাতে এসেছে। কলকাতার বহু পুরসভায় এখন রেশন কার্ড নবীনকরণ বা যাদের জন্ম নথিপত্র নেই, তারা নতুন করে রেশন কার্ড করাচ্ছে। রেশনে চাল, গম নেওয়ার জন্য নয়। কারণ হলো নাগরিকপঞ্জির আতঙ্কে। অমিত শাহ ১ অক্টোবর কলকাতা গিয়ে এক সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা করবেন, সরকার আসলে কী ধরতে চাইছে? ১ অক্টোবর অমিত শাহ কলকাতার নেতাজি ইনডোরে নাগরিকপঞ্জি নিয়ে সম্মেলন করছেন, আর ৩ অক্টোবর শেখ হাসিনা আসছেন দিল্লি। এক লাখ গোর্খার নাম বাদ যাওয়ায় দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদের বিনয় তামাং মামলা করতে চলেছেন সরকারের বিরুদ্ধে।

এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকা গিয়ে তড়িঘড়ি করে হাসিনাকে বলে এসেছেন, উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে ঢাকার সমস্যা হয়। শেখ হাসিনা সরকার কিন্তু জানিয়ে দিয়েছে, আসাম থেকে একজনকেও বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশ সরকার এদের বাংলাদেশি বলে মনেই করছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকা মানবতাবাদী অবস্থান নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। উল্টো ভারত সরকার ওই বোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদীদের পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে। কাজেই এখন শেখ হাসিনা নিজেও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন।

একটা বিষয় বুঝতে হবে, এ ঘটনায় হাসিনা সরকার ক্ষুব্ধ। শেখ হাসিনা নারাজ। ঠিক এভাবে বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া অবৈজ্ঞানিক। বুঝতে হবে বাংলাদেশের জনসমাজ ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস যদি ভারত আবার হারায়, তাতে যদি হাসিনা সরকারবিরোধী জনমত তীব্র হয়, যদি পাকিস্তানপন্থী উগ্রপন্থীরা তার সুযোগ নেয়, তাতে ভারতের লাভ কী? পাকিস্তান এ সমস্যায় জামায়াতদের মদদ  দেবে এ তো একটা বাচ্চা ছেলেও বলে দেবে। যে ১৯ লাখের বেশি  বাসিন্দার নাম বাদ গেল, তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বিদেশি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে, যার সামনে রয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই। জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে যে আশ্বাস দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান যখন বলেছেন এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তাই আমরা এ বিষয়ে মন্তব্য করব না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমিনা মহসীন কিন্তু বলেছেন বাংলাদেশের এখনই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার আর প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার আছে।

একটা কথা বলি, ভারত এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ। সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘে পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান বিরোধের ছায়া পড়ছে। কাশ্মীর নিয়ে দুনিয়াজুড়ে তুলকালাম চলছে। এখন পাকিস্তান দুনিয়ার সামনে কাশ্মীরে নাশকতামূলক কাজকর্ম করার জন্য একেবারে মরিয়া। চীন-পাকিস্তান অক্ষ ভাঙা কঠিন। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড করাটা কিন্তু ভুল কূটনীতি। সাধু সাবধান!

লেখক: নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা