kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য প্রসঙ্গে

মোস্তাফিজুর রহমান

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের সম্ভাব্য পরিমাণ ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার, এ প্রাক্কলন বিশ্বব্যাংকের। ২০১৮ সালে বাণিজ্য হয়েছে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের। এ ব্যবধান দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোন পর্যায়ে রয়েছে তার নির্দেশক। বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করতে পারলে ফল কী হতে পারে তা বোধগম্য।

অনেক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে বেশ ভাবিত। ২০১৮ সালে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮.৬ বিলিয়ন ডলার, এটি বাড়ছে। ভারতে রপ্তানির প্রসঙ্গ উঠলে প্রায়ই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অশুল্ক বাধা নিয়ে অভিযোগ করেন। বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও কাউন্টারভেইলিং ডিউটি আরোপ করে রেখেছে দেশটি। এসবের প্রভাব ক্ষতিকর। বাণিজ্য উৎসাহিত করার ও ত্বরান্বিত করার ব্যবস্থার অভাব উভয় পক্ষের জন্যই সবচেয়ে বড় অশুল্ক বাধা।

ভারত থেকে সাধারণত কাঁচামাল আমদানি করা হয় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাতের জন্য, বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের জন্য। এ শিল্পে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পোশাক প্রস্তুত করা হয়। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মোট রপ্তানির ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। এসবের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের মধ্যে রয়েছে তুলা, সুতা ও কাপড়—যা ভারত থেকে আনা হয়। সুখের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত রয়েছে; ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬.১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি নীতিনির্ধারণী মহলে এবং জনমহলে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।

ভারতের বর্ধমান আমদানি বাজারের সুবিধা ঠিকমতো নিতে পারছে না বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ভারতের মোট আমদানি ছিল ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ভারত বিশ্ববাজার থেকে অনেক পণ্য কিনছে, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নয়। একই জাতের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ, কিন্তু ভারতে নয়। নীতিনির্ধারকদের যথাযথ নীতির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর পথে বাধা অবশ্যই দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। এর জন্য নো ম্যানস ল্যান্ডে পণ্য খালাস ও উত্তোলন করতে হয়—এতে একদিকে বিলম্ব ঘটে, অন্যদিকে পণ্যের দাম চড়ে। মিউচুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট না থাকায় দূরবর্তী টেস্টিং সেন্টার থেকে পরীক্ষণ-সমীক্ষণের ফলাফল না আসা পর্যন্ত পণ্য পড়ে থাকে।

ঢাকা-দিল্লি পণ্য পরিবহন খরচ ঢাকা থেকে ইউরোপীয় বা মার্কিন বন্দরে পরিবহন খরচের চেয়ে অনেক বেশি। বাণিজ্য-সংযোগের কার্যকারিতা পরিবহন, বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস কানেক্টিভিটির কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে। সাফটা চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত তার বাজারে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারছে না।

সীমান্তে বাণিজ্য ত্বরান্বিতকরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কাজও চলছে। ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন এবং দুই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অবকাঠামো উন্নত করা হচ্ছে এবং নথিকরণের ঝামেলা কমানো হচ্ছে। ২০১৫ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল মোটর ভেহিকল চুক্তি অনুযায়ী সীমান্ত দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল অনুমোদন পেলে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমবে।

বাংলাদেশ ভারতীয় বেসরকারি কম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও বাগেরহাটের মোংলায় দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা করার কথা বলেছে। রিলায়েন্স পাওয়ার বাংলাদেশে তিন হাজার মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি সই করেছে। উন্নত অবকাঠামো, বাণিজ্য ত্বরান্বিতকরণের ভালো ব্যবস্থা, এসইজেডে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পরিবহন সংযোগ ও জ্বালানি নিরাপত্তা বিনিয়োগকে প্রণোদিত করতে পারে।

নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে এবং বিরোধ নিরসন ব্যবস্থাকে সংহত করতে হবে। সীমান্তে এক পদক্ষেপে যাতে কাজ হয়, সেটা করতে হবে; ইলেকট্রনিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এতে দুই পাশে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সমন্বিত হবে এবং পণ্যবাহী গাড়ির সহজ পারাপার নিশ্চিত হবে। গাড়ি চলাচল, ল্যাবরেটরি টেস্টিং, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি কার্যক্রম এবং টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডস-সংক্রান্ত মিউচুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়া দরকার। এর জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি করাও দরকার।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই ভারত ও চীনের সঙ্গে বিকাশমান অর্থনৈতিক বন্ধনের নিরিখে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। সামগ্রিকভাবে বললে, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ঢাকা যদি সম্পর্কের সম্ভাব্য সুবিধা পুরোপুরি নিতে চায়, তাহলে তাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

 

লেখক : সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো

সূত্র : ইস্ট এশিয়া ফোরামে উত্থাপিত প্রবন্ধের সংক্ষেপিত রূপ

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা