kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

ভিন্নমত

গ্রামীণফোনের শেয়ার এবং বিনিয়োগকারীদের দুঃখ

আবু আহমেদ

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গ্রামীণফোনের শেয়ার এবং বিনিয়োগকারীদের দুঃখ

ফজলুল হক আমার সরাসরি ছাত্র নয়, সে পড়েছে বাণিজ্য অনুষদে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে আর আমি পড়িয়েছি অর্থনীতি বিভাগে দীর্ঘ ৪০ বছর। তবে ফজলুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে অনেক আগে, সে যখন একটা ব্যক্তি খাতের ব্যাংকে বেশ উঁচুতে চাকরি করত। মতিঝিলে কোনো কাজ থাকলে কাজ সেরে সময় পেলে আমি সেই ব্যাংকে গিয়ে বসতাম।  ফজলুল হকও এসে কতক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে যেত। আর আমিও এক কাপ চা পান করে ওই ব্যাংক থেকে প্রস্থান করতাম। ফজলুল হক জানত আমার শেয়ারবাজার এবং শেয়ার বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ আছে। তাই সে যে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট আমার সঙ্গে কথা বলত, তা শেয়ারবাজারকে নিয়েই আবর্তিত হতো। ফজলুল হক শেয়ারের ভ্যালুয়েশন তথা বিনিয়োগ-যোগ্যতা নিয়ে জানতে চাইত। আমিও আমার জ্ঞান এবং বিশ্লেষণের ক্ষমতা অনুযায়ী তাকে আমার মতামত দিতাম। ওই সব আলোচনায় অন্য দু-চারজন ব্যাংকারও থাকতেন, সবাই আলোচনায় আগ্রহ নিতেন এবং যাঁর যাঁর জ্ঞান অনুযায়ী কথা বলতেন। ফজলুল হক এখন অবসরে গেছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ আছে। সেই দিন এক ব্রোকার হাউসে তার সঙ্গে আমার দেখা। দেখা হতেই সালাম দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, গ্রামীণফোনের শেয়ারের কী হবে।’ আমি বললাম, তুমি যা চিন্তা করছ তা-ই হবে। তোমার মতো সবাই গ্রামীণফোনের শেয়ার নিয়ে এক ধরনের বিপদে আছে। তারা বুঝতে পারছে না তাদের শেয়ারের দর শেষ পর্যন্ত পড়ে কোথায় গিয়ে ঠেকে। ফজলুল হক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এভাবে হাজারো বিনিয়োগকারীও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

সাধারণত একজন বিনিয়োগকারী তখনই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় যখন সে যে কম্পানির শেয়ার কিনেছে, সেই কম্পানি যদি ব্যবসা খারাপ করে। কিন্তু গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। এ ক্ষেত্রে কম্পানির ব্যবসা আগের মতোই আছে। বরং ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ারই কথা। কিন্তু গ্রামীণফোনের শেয়ার নিয়ে সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। রেগুলেটর বিটিআরসি যেন এই ফোন কম্পানিকে বেশি ব্যবসা করতে দিতে অনিচ্ছুক। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রেগুলেটর এক ফরমান জারি করল যে এই কম্পানি মোট বাজার ব্যবসার ৪০ শতাংশের বেশি ব্যবসা করতে পারবে না। এর বেশি ব্যবসা করলে কম্পানিকে বাড়তি কর দিতে হবে। এমনকি বেশি ব্যবসা করতে চাইলে নতুন প্রডাক্টস-নতুন বিনিয়োগকারীদের ওপরও বাড়তি বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে। কেন এসব বিধি-নিষেধ? খবর নিয়ে জানা গেল, রেগুলেটর গ্রামীণফোনকে  SMP (Significant Market Power) হিসেবে চিহ্নিত করে এসব বিধি-নিষেধের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা আশ্চর্য হয়ে গেল। হঠাৎ তারা দেখতে পেল এত দিন যে শেয়ারকে বিনিয়োগের জন্য তারা উত্তম মনে করে আসছিল, সেই শেয়ার যেন হঠাৎ করেই বিনিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত হতে শুরু করল। তারা ক্ষোভ ও দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করল তাদের শেয়ারের বাজারমূল্য অতি দ্রুত পড়তে লাগল, SMP-এর বিধি-নিষেধের ফলে জিপির শেয়ার ৫১৫ থেকে পড়ে একপর্যায়ে ৪০০ টাকার নিচে চলে এলো।

এদিকে শুধু যে জিপির শেয়ারের মূল্য পড়েছে, তা নয়। এই বছরের এপ্রিল মাস থেকে পুরো শেয়ারবাজারই পড়তে শুরু করল। বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, জিপির শেয়ারের মূল্যপতনই এই বাজারকে বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। মূল্যপতনে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর এক অংশ অনেকটা ক্ষোভে-দুঃখে অনেকে বিও হিসাব বন্ধ করে শেয়ারবাজারই ত্যাগ করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন খবর হতে লাগল শেয়ারবাজার পড়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা দুঃখে আছে। কিন্তু ওই সব সংবাদে কোনো কাজ হয়নি। বাজার আস্থার সংকটে পড়ে অনেকটা নীরব হয়ে এক জায়গায়ই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফজলুল হক আফসোস করে বলল, একটা বিদেশি কম্পানি, যে এই দেশের অর্থনীতিতে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে চায়, যে কম্পানি আমাদের অর্থনীতিতে ডিজিটাইজেশনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই কম্পানির ব্যবসার ওপর এত বিধি-নিষেধ আসবে কেন? ফজলুল হক এরপর জিপির কাছে সরকারের ১২ হাজার কোটি বা তারও বেশি পাওনার বিষয় তুলল। বলল, এ ক্ষেত্রে তো জিপির অবস্থান ন্যায্য। ওরা বলছে, রেগুলেটর এত টাকা পাবে না। তারা সালিসে যেতে চায়। আর রেগুলেটর বলছে, তারা সালিস মানে না, এটা কী ধরনের যুক্তি! যেকোনো বিবাদ তো আমাদের আইনেই আছে সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। এটাই যদি রেগুলেটরের অবস্থান হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কী মেসেজ দিচ্ছি? তাদের কি মনে হবে না যে বাংলাদেশ বলে এক, পরে করে আরেক।

একটা পাবলিক কম্পানি, যে কম্পানির শেয়ারে ৪০ হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেছে, রেগুলেটর তথা সরকারের দায়িত্ব কি এটা নয় যে এদের স্বার্থটাও দেখা? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রেগুলেটর মহোদয় কানে তুলা দিয়েছে, কোনো যুক্তি শুনতেই নারাজ। এদিকে গ্রামীণফোনের কাছে পাওনার কথা বলে রেগুলেটর বিটিআরসি এমন এক নোটিশ জারি করল, যা সাধারণ্যের পূর্বাহ্নে বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। এখন শুনি টাকা না দিলে রেগুলেটর নাকি জিপির লাইসেন্স বাতিল করে দেবে। এটাই যদি ঘটে, তাহলে আমাদের শেয়ারের কী হবে? বিষয়টা ভাবতেই গায়ে শীত লেগে যায়। ফজলুল হক আরো বলল, প্রথমে যখন SMP-এর আওতায় জিপির ব্যবসার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলো তখন পিজির শেয়ারমূল্য ৫১৫ থেকে ৪০০ টাকার নিচে নেমে এলো। আর এরপর পাওনার কথা বলে যখন লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা হলো তখন এই শেয়ারের বাজারমূল্য ৩০০ টাকারও নিচে নেমে এলো। বিষয়টা কি কেউ দেখছে না? একটা বহুজাতিক কম্পানির শেয়ার কিনে তাহলে কি বিনিয়োগকারীরা ভুল করল? ফজলুল হকের আরো ক্ষোভ হলো, বিষয়টা নিয়ে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি-ই বা বাদ থাকবে কেন। এই সংস্থা তো জিপির বিষয়টাতেই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের দিকটা তুলে ধরে সরকারকে একটা প্রতিবেদন দিতে পারত। ফজলুল হকের কথা হলো, তারা তো কোনো দিন চিন্তাও করতে পারেনি যে শেয়ারবাজারের কোনো ভালো কম্পানির ক্ষেত্রেও এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এসে যেতে পারে। তাহলে বিনিয়োগকারীরা কাকে বিশ্বাস করবে, কোন কম্পানিকে বা কোন রেগুলেটরকে বিশ্বাস করবে?

একটা হতাশার মধ্যে শেয়ারবাজার চলতে পারে না। একে তো ভালো শেয়ারের প্রচণ্ড অভাব, এরপর দু-চারটি ভালো শেয়ার যা আছে, তার ওপরও এই ধরনের আঘাত। ফজলুল হকের অন্য কথা হলো, ‘এসব দেখে তো আমাদের বাজারে যে যৎসামান্য বিদেশি বিনিয়োগ আছে, তা-ও তারা তুলে নেবে। তাহলে আমরা কি শুধু ব্যাংকিং বা মুদ্রাবাজারকে ব্যবহার করে আমাদের অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জোগান দেব?’ ফজলুল হকের কথায় আমিও একমত। ফজলুল হককে বললাম, তোমার কথাগুলোই ঠিক। আমরা এমন অনেক কাজ করছি, যেগুলো শুধু বিনিয়োগবিরোধী নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও ভুল মেসেজ দিচ্ছি। আমি তো মনে করি গ্রামীণফোনের বিষয়টা সব দিক বিবেচনা করে সরকারের এই পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপ করা উচিত। তারা নিজেও গ্রামীণফোনের শেয়ারে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে—সেটা করেছে টিসিবি ও সাধারণ বীমা করপোরেশনের মাধ্যমে। সরকার নিজে এই বিনিয়োগ সম্পর্কে অবহিত কি না? সরকারকে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব এটা বুঝতে যে শেয়ারবাজারের একটা সমর্থন ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। বিশ্বের কোনো বাজার অর্থনীতিই শুধু ব্যাংক অর্থায়নের মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে যেতেও পারেনি এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতেও পারেনি। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এটা বুঝতে হবে যে এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে। আজকে যেভাবে সরকারি ব্যয়ের অপচয় হচ্ছে, একদিন এই অবস্থা থাকবে না, অর্থের অভাব তখন অনেক প্রকটভাবে অনুভূত হবে, যেভাবে এখন অন্য অনেক অর্থনীতি অনুভব করছে, আর্থিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে ভালো প্রবৃদ্ধি কিছুদিন অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলা আমাদের একদিন আঘাত হানবেই। ফজলুল হককে আজকে আমি চা খাওয়ালাম। সে আমাকে সালাম দিয়ে বিদায় নিল।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা