kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

বেট্রিস লাউ ► রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব

মিয়ানমারকে চাপে রাখতে পারে আসিয়ান

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুই বছর হয়ে গেছে। কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সংকট সমাধানের ধারেকাছেও যেতে পারেনি এশিয়া। শুধু বাংলাদেশে অবস্থান করছে কমপক্ষে ৯ লাখ রোহিঙ্গা। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে পালিয়ে আসা সাত লাখ ৫৯ হাজার। এর আগের সহিংসতাগুলো থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। এটা হলো একটি এশিয়ান সংকট। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে।

এ মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান) সামিটে একত্র হবেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা। ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলার ক্ষেত্রে যে দু-চারটি মাধ্যম সক্ষমতা অর্জন করেছে, এর অন্যতম আসিয়ান। রোহিঙ্গাদের প্রতি আঞ্চলিক নেতাদের অবশ্যই সমবেদনা দেখাতে হবে এবং সহিংসতা, বৈষম্য এবং নিষ্পেষণ বন্ধে মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে, যার জন্য রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যদি তা না হয়, তাহলে এই ট্র্যাজেডি অব্যাহতভাবে চলতেই থাকবে।

মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসাবিষয়ক মানবাধিকার সংগঠন মেডিসিনিস সান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)। এটা করতে গিয়ে এই সংগঠন প্রত্যক্ষ করেছে, রোহিঙ্গারা প্রতিদিন কিভাবে লড়াই করছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের শরণার্থীর মর্যাদা নেই। তাদের প্রয়োজন অস্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য আইনগত বৈধতা। মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করে তাদের দেখা হয় বিদেশি হিসেবে।

এসব রোহিঙ্গা চিকিৎসা নিতে সরকারি হাসপাতালে যায় না। এর কারণ হলো ইমিগ্রেশনে তাদের নিয়ে রিপোর্ট হওয়ার ভয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মশক্তিতে বৈধভাবে শরণার্থীরা যুক্ত হলে সেখানে লাখ লাখ রিংগিত যোগ হতে পারে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে।

এমএসএফ টিম দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশে কিভাবে গাদাগাদি করে আশ্রয়শিবিরগুলোতে অবস্থান করছে রোহিঙ্গারা। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা কাজের মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অক্ষম। কক্সবাজারে তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র মাধ্যম হলো এমএসএফের মতো মানবিক সেবাদানকারী অনুমোদিত সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা এমএসএফ-কে বলেছে, যখন তারা দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন তারা বর্তমানে নিজ দেশে উন্নত জীবনের কোনো পথই দেখতে পাচ্ছে না। মিয়ানমারে পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। উপরন্তু রাখাইন রাজ্যে এখনো অবস্থান করছে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ রোহিঙ্গা। তারা চলাচলের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বিধি-নিষেধ সহ্য করছে। স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এতে তাদের সক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য খুব ব্যয়বহুল ও বড় রকম বিপদের কথা। কারণ এ ক্ষেত্রে তাদের হাসপাতালে যাওয়ার পথে পুলিশ চেকপোস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ জন্য তাদের প্রয়োজন হয় কাগজপত্র। দিতে হয় ঘুষ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান নেতৃত্বাধীন রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশন যেসব সুপারিশ করেছিল তা বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে সমর্থন দেওয়া উচিত আসিয়ানের। এর খসড়ায় যেসব কথা বলা হয়েছিল, তার যদি পূর্ণাঙ্গতা অনুধাবন করা যায় তাহলে সব সম্প্রদায় উপকৃত হবে।

মিয়ানমারের ভেতরে অবস্থানকারী ও পালিয়ে যাওয়াসহ সব রোহিঙ্গার কাছে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হওয়া দরকার, তা হলো তাদের নাগরিকত্বের অধিকার। জন্মনিবন্ধনের মতো ইস্যুগুলোতে একটি টেকনিক্যাল পর্যায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আসিয়ান। পাশাপাশি নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য তাকে চাপে রাখতে পারে।

এ জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বিস্তৃতভাবে আলোচনা প্রয়োজন আসিয়ানের। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এসব আলোচনার মূল অংশ করতে পারে রোহিঙ্গাদের বাদ রাখা ও তাদের প্রতি চালানো বৈষম্যের ইস্যুগুলোকে। আসিয়ানের সামিটে এবং জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের এজেন্ডায় অবশ্যই থাকতে হবে রাখাইন রাজ্য। এসব সামিট বা অধিবেশনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের এক সুরে বলা উচিত যে কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে অঙ্গীভূত করাই হলো এ সমস্যার সমাধান।

লেখক : মেডিসিনিস সান্স ফ্রন্টিয়ার্সের (এমএসএফ) মালয়েশিয়া

মিশনের প্রধান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা