kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

ত্রিদেশীয় সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ

ইকরামউজ্জমান

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ত্রিদেশীয় সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ

বৃষ্টির সাহায্য পেয়েও শেষ পর্যন্ত শোচনীয় টেস্ট পরাজয় ঠেকানো সম্ভব হয়নি। সুযোগ হয়েছিল ১৮.৩ ওভার টিকে থাকলে ড্র করার, সেই শেষ সুযোগটাও কাজে লাগাতে ব্যাটসম্যানরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এঁদের নামের পেছনে কিন্তু অলরাউন্ডার ও ব্যাটসম্যান তকমা আছে। টেস্ট ম্যাচে রান করার দরকার নেই, শুধু উইকেট কামড়ে পড়ে থাকলেই হবে—সেটাও সম্ভব হয়নি আফগানিস্তানের বিপক্ষে, যাঁরা ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্ত সংস্করণ টেস্ট ম্যাচ তৃতীয়বারের মতো খেলতে নেমেছিলেন চট্টগ্রামে। আফগানরা প্রতিটি সেশন ‘ডমিনেট’ করে স্বাগতিক দলকে অনায়াসে পরাজিত করেছে ২২৪ রানে। যেটা তাঁরা আগে চিন্তাও করতে পারেনি। নতুন দল আফগানিস্তান টেস্ট ক্রিকেট যে মেজাজ, মনঃসংযোগ, আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য নিয়ে খেলতে হয় সেভাবেই খেলেছে। আর স্বাগতিক দল দেশের মাটিতে ১১৫তম টেস্ট কিভাবে খেলেছে—তার প্রমাণ হলো বড় রানের ব্যবধানে শোচনীয় পরাজয়। এটিকে পরাজয় বললে ভুল হবে, রীতিমতো আত্মসমর্পণ। আফগান দল এই টেস্টে একটি মাত্র ভুল করেছে, আর তা হলো তারা যদি চতুর্থ দিনের একটি পর্যায়ে যে ‘লিড’ নিশ্চিত করে ফেলেছিল, সেটা নিয়েই যদি স্বাগতিকদের চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে আহ্বান জানাত, তাহলে পঞ্চম দিন এত টেনশনে থাকতে হতো না! আগামী দিনে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লাগবে।

ম্যাচ বাঁচানোর জন্য যখন শক্ত করে হাল ধরতে হবে, ভাবতে হবে দেশের ক্রিকেটের সম্মানের কথা, তখন স্বয়ং অধিনায়ক এবং অন্য ক্রিকেটাররা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রচণ্ড স্নায়ুবিশিষ্ট দুর্বলতায় ভুগেছেন। ১৯ বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁদের জন্য তো এটি অমার্জনীয় অপরাধ। ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন করে দেখা গেছে কোনো লাভ হয়নি। কালো কালোই থেকে গেছে।

একমাত্র টেস্ট শুরুর দিন আমার কলামে লিখেছিলাম, আফগান স্পিনারদের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে এত ভয় আর মানসিক চাপে ভুগলে তো স্বাভাবিক নির্ভার ক্রিকেট খেলা সম্ভব হবে না। ক্রিকেটে চাপ থাকবে, যতটুকু সম্ভব সামাল দিয়েই খেলতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটে তো বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা শ্রীলঙ্কার মুরালিধরন, অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্নের মতো সেরা স্পিনারদের বিপক্ষে খেলেছেন, সেঞ্চুরিও করেছেন। রশিদ খান, নবী, জহিররা তো তাঁদের মতো অভিজ্ঞ নন, ভয়ংকরও নন। নবী, রশিদ, জহিরদের তো বিপিএলে খেলা ছাড়া এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপে খেলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। মানসিক দুর্বলতা বড় বেশি ক্ষতিকর। বনের বাঘে কামড় দেওয়ার আগে মনের বাঘে কামড় দিয়ে দেয়। আফগানদের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে সেটাই লক্ষ করেছি। ক্রিকেটে মানসিক শক্তি আর নিজের খেলার ওপর বিশ্বাসের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ কয়েক মাস পর আবার টেস্ট খেলতে নেমেছিল। বিশ্বকাপের পর পর একেবারে সময় পায়নি। দল খেলতে গেছে শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরে আসার পর আফগানদের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ। বেশির ভাগ খেলোয়াড় সতেজ হয়ে উঠতে (তামিম ইকবাল নিজ থেকে বিশ্রাম নিয়েছেন) পারেননি। বিশ্বকাপে এবং শ্রীলঙ্কায় ওয়ানডের ঘোর কাটিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের চাহিদার সঙ্গে এত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি ক্রিকেটাররা। ফিল্ডিংয়ে দুর্বলতা সব সময় চোখে পড়েছে। ক্যাচ ও রান-আউট সুযোগের খেসারত ভালোভাবেই দিতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার আগে ভালো প্রস্তুতি খুবই জরুরি। প্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা বাঁ এবং ডানহাতি ‘রিস্ট স্পিনার’দের খেলে অভ্যস্ত নন। প্র্যাকটিসে এ ধরনের স্পিনার এনে কিছু খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্র্যাকটিস আর ম্যাচে খেলা তো এক নয়। হেড কোচসহ সব কোচিং স্টাফ নতুন। তাঁরা এখনো খেলোয়াড়দের বুঝতেই পারেননি। আফগানদের বিপক্ষে ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থা আঁচ করতে পেরে হেড কোচ বলেছেন, মুক্তমন নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করতে হবে।

এখানে আবার প্রশ্ন উঠেছে, তা হলো চারজন স্পিনার কেন নেওয়া হয়েছিল? একজনও পেসার হয়নি। অধিনায়ক বলেছেন, এশিয়ার কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের পেসাররা কার্যকর নন। তাহলে কি আগামী নভেম্বরে যখন বাংলাদেশ ভারতে যাবে দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে—সেখানে পেসারদের দলে অবস্থানটা কী হতে পারে? ম্যাচ হারার পর অধিনায়ক বলেছেন, ‘কোয়ালিটি’ খেলোয়াড় ছাড়া উপায় নেই। কোয়ালিটি খেলোয়াড় না থাকায় বিভিন্নভাবে জেতা এবং ম্যাচ বাঁচানোর কথা ভাবা হয়। তাহলে কি নির্বাচকরা কোয়ালিটি খেলোয়াড় উপস্থাপন করতে পারছেন না। একটি বিষয় পরিষ্কার, ঘরোয়া নিম্নমানের ক্রিকেটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অনেক বড় ব্যবধান। ঘরোয়া ক্রিকেটে একটির পর একটি ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ করে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ রান করতে গিয়ে খাবি খেতে হচ্ছে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে উইকেট তো তৈরি করেছে গ্রাউন্ড কমিটি। তারা তো একটি ব্রিফিং পেয়েই উইকেট তৈরি করেছে। সব স্বাগতিক দেশ নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার দিকে ভেবেই উইকেট তৈরি করে। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক বলেছেন, তিনি উইকেট বুঝতে পারেননি। অপারেশন কমিটির এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত (১০ সেপ্টেম্বর) চোখে পড়েনি। তাদের দায়িত্বটা কী? খেলায় পরিকল্পনা ছিল কী ছিল না এটা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বলা হচ্ছে ছিল; কিন্তু বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। কে টেস্ট খেলার যোগ্য আর কে টেস্ট খেলার যোগ্য নয়—এসব বিতর্ক তো সব নিজেদের মধ্যে। আর এখন তো পুরোপুরি অর্থহীন। চট্টগ্রামে যেখানে চার দিনের খেলা হয়েছে ‘এ’ দলের, সেখানে আবার টেস্ট ম্যাচ কেন? ‘এ’ দলের খেলা চট্টগ্রামে এই অনুমতি তো বোর্ডের কর্মকর্তারা দিয়েছেন। ‘এ’ দলের হয়ে যেসব আফগান খেলোয়াড় খেলেছেন এঁদের তিনজন তো টেস্ট ম্যাচে খুব ভালো খেলেছেন।

জানি, ক্রিকেট দেশের সংস্কৃতিতে এ বিষয়গুলো নিয়ে আগামী কয়েক দিন আলোচনা হবে। জবাবদিহির কথা উঠবে। হয়তো বোর্ড সভাপতিও আনুষ্ঠানিকভাবে মিডিয়ার সামনে আসবেন—তাঁরও তো দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু কোনো লাভই হবে না—যদি এবারের প্রচণ্ড ধাক্কার পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ উদ্যোগের বিষয়ে না ভাবা হয়, তাহলে ক্রিকেটে সংকট আগামী দিনগুলোতে আরো বাড়বে। ক্রিকেট বোর্ডকে বুঝতে হবে—‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ দিন আর নেই। তাকালেই দেখা যাবে, সচেতন মহল কিভাবে তাকিয়ে আছে।

এবার ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে। আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। প্রতিটি দেশই টি-টোয়েন্টি টিম সেট করা নিয়ে কাজ করছে। একে অপরের বিপক্ষে খেলছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিদেশীয় সিরিজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিদেশীয় সিরিজে পরিষ্কার ফেভারিট আফগানিস্তান। দলটি বাংলাদেশের টেস্ট জিতে আরো বেশি উজ্জীবিত। টি-টোয়েন্টিতে র্যাংকিংয়ে যেখানে বাংলাদেশ ১০ নম্বরে, সেখানে আফগানিস্তান সাত নম্বরে। তারা বর্তমান বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং সাবেক টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে ওপরের আসনে বসে আছে। গত জুনে বাংলাদেশ দলকে তাদের ভেন্যুতে (ভারতের দেরাদুন) আফগানরা ৩-০ তে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করেছে। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত তাদের বিপক্ষে চারটি ম্যাচ খেলে তিনটিতেই হেরেছে। আর জিম্বাবুয়ে তো আফগান দলের বিপক্ষে সাতটি টি-টোয়েন্টি খেলে একটিতেও জিততে পারেনি। জিম্বাবুয়ে অবশ্য বাংলাদেশের বিপক্ষে ৯টি ম্যাচ খেলে পাঁচটিতে হেরেছে। আজ থেকে ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ক্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু হবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে দলের মধ্যে খেলার মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রথম দুই ম্যাচের স্কোয়াডে নতুন বোলার ইয়াসিরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেহেদি মিরাজ বাদ পড়েছেন। তাঁর পরিবর্তে দলে এসেছেন আরেক মেহেদি। সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। আগেও লিখেছি, আবার লিখছি তিনি এই দায়িত্বটি উপভোগ করছেন না! এ বিষয়টি নিয়ে তিনি বোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে চান। আফগানিস্তান দলের স্কোয়াডে বেশ কিছু নতুন মুখ আছেন— তাঁরা কতটুকু কী করতে পারেন, সেটা দেখতে চাইছে আফগান বোর্ড। তাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টির জন্য একটি শক্তিশালী দল গঠন। আফগানরা বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি ঘিরে একটি লক্ষ্য তৈরি করেছে। আর বাংলাদেশ দল এই সিরিজের পর ভাববে ভবিষ্যতে কিভাবে এগোবে। যে দলই জিতুক, ক্রিদেশীয় সিরিজকে ঘিরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দর্শকরা কয়েকটি ভয়ডরহীন উত্তেজনাপূর্ণ খেলা দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর, ঢাকার মিরপুরে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা