kalerkantho

জীবনের সমগ্রতা ধারণ করতে চান তিনি

মফিদুল হক

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জীবনের সমগ্রতা ধারণ করতে চান তিনি

আহমদ রফিক ধারণ করেন বহুবিধ পরিচয়, কর্ম ও সৃজন উভয় বিচারেই। দীর্ঘ জীবনে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি চলেছেন, ভাগ্যের অমোঘ টান তাঁকে কখনো স্থিতি দেয়নি, যদিও বাহ্যিকভাবে তাঁকে দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। বাইরে তিনি সদা পরিপাটি স্থিতধী তুষ্ট ব্যক্তিত্ব, ভেতরে তাঁর উত্তাল মেঘনা। ১৯২৯ সালে মেঘনাতীরের শাহবাজপুর গ্রামে সম্পন্ন গ্রামীণ পরিবারে তাঁর জন্ম।

বাল্যেই তাঁর পারিবারিক জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়, বাউলিয়ানা ও দুর্ঘটনা মিলেমিশে জন্ম দেয় ট্র্যাজেডির। আহমদ রফিক বাউলসত্তার নিরিখেই দেখেছেন পরিবারে মরমি-চিন্তার টান এবং তাঁর পিতার মৃত্যু।

আহমদ রফিকের বড় ভাই তখন ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে পড়েন, মেজো ভাই শ্যামগ্রাম স্কুলের ছাত্র আর আহমদ রফিক পাড়ার কানাই পালের পাঠশালা ছেড়ে সবে ভর্তি হয়েছেন এক মাইল দূরের নাসিরাবাদ স্কুলে। পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর বড় ভাইকে ধরতে হয় সংসারের হাল, লেখাপড়ায় ক্ষান্তি দিয়ে তিনি চাকরি নেন যশোর জেলার দুর্গম নড়াইল মহকুমায় জেলা বোর্ডের কনিষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবে। ১৯৩৭ সালের মাঝামাঝি গ্রামের পাট চুকিয়ে গোটা পরিবার স্থান পাল্টে ঠাঁই নেয় নড়াইল শহরে। এ এক ধরনের উদ্বাস্তুতাই, বলা যেতে পারে দেশাভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হওয়া, যে উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতা থেকে আহমদ রফিকের কখনোই মুক্তি ঘটেনি। তিনি নড়াইলে এসে পেয়েছিলেন উদার সাংস্কৃতিক পরিবেশ, বই পড়ার এন্তার সুযোগ এবং উত্তাল চল্লিশের বাম পন্থার সঙ্গে পরিচয়।

প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার প্রবল বাসনা মনে পোষণ করেছিলেন আহমদ রফিক—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে যে ফলাফল তিনি অর্জন করেছিলেন তাতে এটা স্বাভাবিকভাবে ঘটার ছিল। তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় মেজো চাচার কর্মস্থল মুন্সীগঞ্জে। দেশভাগের কারণে তিনি সবে বসিরহাট থেকে কর্মস্থল বদল করে এসেছেন মুন্সীগঞ্জে। কলেজে পড়ার জন্য চিত্রাতীর ছেড়ে তাঁকে আসতে হয় ধলেশ্বরী তীরে। আবার তিনি উদ্বাস্তু হলেন কৈশোর ও উদ্গত যৌবনের স্মৃতিময় শহর নড়াইল থেকে, এলেন মুন্সীগঞ্জে।

আহমদ রফিক স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই বরণ করেছিলেন বামপন্থী মতাদর্শ, সেই সঙ্গে ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান, সেটা প্রায় যেন স্বভাবগত; এভাবে অন্তরে বাউল এবং বাস্তবে উদ্বাস্তু এক যুবক পা বাড়িয়েছিল জীবনের পথে। মুন্সীগঞ্জে কলেজের পাঠ সাঙ্গ করে তিনি আসেন ঢাকায়, ভর্তি হন মেডিক্যাল কলেজে। আপাতদৃষ্টিতে সফলতার সোপানে পা রাখলেন বটে, কিন্তু নিরাশ্রয়ী হয়ে রইলেন আগের মতোই। শুরু হলো তাঁর ভাষায় ‘ঠিকানাবিহীন ঢাকায় বোহেমিয়ানের’ জীবন।   

১৯৪৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যাঁরা ভর্তি হয়েছিলেন, জীবন তাঁদের বৃহত্তর এক সমৃদ্ধির জোগান দিয়েছিল। কেননা পূর্ববাংলার জনজীবনে তখন তৈরি হচ্ছিল ভিন্নতর আলোড়ন এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সব কিছু; জন্ম দিয়েছিল প্রায় যেন এক নতুন পৃথিবীর। সে আলোড়ন স্রোতের কুটার মতো ভাসিয়ে নিয়ে গেল আহমদ রফিককে, একই সঙ্গে অসাধারণ সব জীবনাভিজ্ঞতায় তিনি পুষ্ট হলেন।

ব্যক্তিজীবনে এমনি নানা টানাপড়েনের মধ্যে চলেছেন আহমদ রফিক, পাশাপাশি সাহিত্য সৃজনে তিনি খুঁজে ফেরেন মুক্তি। রাজনীতি তাঁকে যে মুক্তি দেয়নি, তা তিনি খুঁজে পান সাহিত্যে, জীবনভর যে সাহিত্য সাধনায় তিনি নিমগ্ন রয়েছেন এবং বিস্তার ও গভীরতার অনন্য উদাহরণ মেলে ধরেছেন। তাঁর সৃজনসাধনার দিকগুলো যে কাউকে বিস্মিত করবে এবং নানা পরিচয়ে তাঁকে আমরা এখানে পাই। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তিনি রচনা করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীর মমত্ব এবং গবেষকের নিস্পৃহতা নিয়ে।

ভাষা আন্দোলন কিংবা দেশভাগ বিচারকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার গুরুত্ব তিনি নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছেন। মার্ক্সবাদী পণ্ডিতরা যখন পাশ্চাত্যের ফর্মুলায় ফেলে জাতীয়তাবাদকে হেয় ও বাতিল হিসেবে দাখিল করতে সক্রিয়, তখন তিনি বাংলার সংঘাতের ইতিহাসের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির শক্তি হিসেবে দেখেন জাতীয়তাবাদকে, ইতিহাস ও বাস্তবতার সৃষ্টিশীল বিচার তাঁকে করে তোলে বিশিষ্ট। একই বিশিষ্টতা আমরা দেখি তাঁর রবীন্দ্রবিচারে, রবীন্দ্রনাথকে সমগ্রতায় দেখার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য সব প্রবন্ধ আমাদের উপহার দিয়েছেন। অন্যদিকে পতিসর ঘিরে কর্মী রবীন্দ্রনাথকে সবার সঙ্গে পরিচিত করে দিয়েছেন তিনি। নানামুখী গুরুগম্ভীর চিন্তাশীল গ্রন্থগুলোর রচয়িতা এই মানুষটি আবার লেখেন কবিতা, বাউল মাটিতে পড়ে থাকে তাঁর মন। জীবন তাঁকে করেছে উদ্বাস্তু, আর জীবনভর চলেছে তাঁর সাধনা মাটির গভীরে শিকড় জারিত করার, জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংলগ্ন হওয়ার। আমরা বুঝি জীবনের সমগ্রতা তিনি ধারণ করতে চান, আর সেই সমগ্রতার ছাপ মেলে তাঁর রচনাসম্ভারে। বঞ্চনার হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হয়েছেন তিনি, বাইরে তুষ্ট সদাশিব ব্যক্তি, অন্তরে বেদনার ঝড়, ঝড়ো মেঘনায় তিনি বেয়ে চলেছেন জীবনতরি, শক্ত হাতে ধরেছেন হাল, পিতার জলরেখা অনুসরণ করে, পিতাকে ছাপিয়ে, কখনো পরাভব না মেনে।

এটাই বুঝি ব্যক্তি, কর্মী, প্রাবন্ধিক ও কবি আহমদ রফিকের বৈশিষ্ট্য। আর এখানেই তিনি অনন্য।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, ট্রাস্টি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

 

মন্তব্য