kalerkantho

তথ্য-প্রযুক্তি খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন

ড. মো. নাছিম আখতার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তথ্য-প্রযুক্তি খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন

ডিজিটালবাংলাদেশ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধারায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রধান হাতিয়ার। নাগরিকসেবাগুলোকে ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় আনলে সেবাদান সহজ ও নিরাপদ হবে। এর মাধ্যমে দেশে বসেই ধনী দেশগুলোর কাজ করে দেওয়া সম্ভব। ফলে বাড়বে কর্মসংস্থান। কিন্তু ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় যদি দুর্বলতা থাকে, তাহলে  ডিজিটাল প্রযুক্তি দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতি ক্ষেত্রেই দেশ পরিচালনার বিষয়গুলো ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী তথ্যভাণ্ডার সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক চৌকস জনবলের অভাব এর প্রকৃত কারণ। ফলে ঘটছে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। দেশ কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শুধু ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না, এর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা বিধান ও পরিচালনার জন্য দরকার আত্মবিশ্বাসী চৌকস গ্র্যাজুয়েট।

তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলোতে শুধু বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর না করে দেশের তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক জনসম্পদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার প্রকৃত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও সিস্টেম প্রগ্রামিং দক্ষতার উন্নয়ন। ডাটার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য আমরা যে ফায়ারওয়াল ব্যবহার করি তা দুর্ভেদ্য কিন্তু মোটেও অভেদ্য নয়। হ্যাক করে ডাটা চুরি করার মতো বহু ডাকসাইটে আনএথিক্যাল হ্যাকার রয়েছে পৃথিবীতে। তাই নিজেদের কোর প্রগ্রামিংয়ের সক্ষমতা না বাড়াতে পারলে তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা দুরূহ।

আমাদের দেশে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইসিটি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটিতেই সিএসই বিভাগ রয়েছে। জানা মতে, কোনো কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিস্টারে সিএসই বিভাগে ৯০০ শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন কম্পানি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যখন দক্ষ জনবল খোঁজা হয় তখন দক্ষ লোক পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কেন এ অবস্থা—কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি?

ঈদুল আজহার পরদিন বেড়াতে গিয়ে একটি বহুজাতিক সফটওয়্যার কম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে দেশের দক্ষ জনসম্পদ নিয়ে অনেকক্ষণ কথা হলো। কথার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘অন্য সাবজেক্ট নিয়ে বলতে পারব না, কিন্তু তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করছেন তাঁদের বিষয়ে বলতে পারি, তাঁদের কোনোভাবেই বেকার থাকার কথা না।’ তাঁর কথার যথার্থতা বোঝাতে গিয়ে তিনি একটি বাস্তব ঘটনা বললেন, তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, সম্প্রতি সেখানে চাকরি মেলায় অংশ নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘যাদের সিজিপিএ ন্যূনতম তিন আছে, তাদের তিন মাস ইন্টার্নশিপ করানোর পরে বহুজাতিক কম্পানিতে ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি দেওয়া হবে।’ তাঁর ভাষ্যমতে, কথাটি শুনে অনেকেই পিছিয়ে গেল। কারণ তারা মোটেও আত্মবিশ্বাসী ছিল না। অনুষ্ঠান শেষে ছাত্ররা তাঁকে বলল, প্রগ্রামিং তাদের কাছে খুব কঠিন লাগে, তাই সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতু্যুত্তরে কোমল হৃদয়ের ওই ইঞ্জিনিয়ার বললেন, ‘ঠিক আছে চাকরি কোরো না, কিন্তু যেহেতু তোমরা বলছ তোমরা প্রগ্রামিংয়ে দুর্বল, তাই তিন মাসের ইন্টার্ন করো। এতে মাসে ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা পাবে, সঙ্গে সঙ্গে প্রগ্রাম ভীতিও কেটে যাবে। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে ছাত্ররা সবাই সাড়া দিয়েছিল এবং ইন্টার্ন করছিল। এর পরের ঘটনা—ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ ব্যাচের ন্যূনতম তিন পাওয়া ছাত্রের আটজন বাদে সবাই প্রথম চান্সেই সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে বহুজাতিক কম্পানিতে যোগদান করেছে। বাকি আটজনও পরবর্তী ধাপে যোগদান করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। যারা ভয়ে ইন্টার্নই করতে চায়নি তাদের পক্ষে এটা কিভাবে সম্ভব হলো! তারা আন্তর্জাতিক মানের প্রগ্রামিং অ্যাপটিচিউট টেস্টের তিনটি ধাপ পেরিয়ে কিভাবে চাকরি পেল! রূপকথার সোনার কাঠি বা রুপার কাঠির স্পর্শে নয়, আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের বদৌলতেও নয়, বরং এটা সম্ভব হয়েছে প্রগ্রামিংয়ের গভীরে প্রবেশের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ওই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পরিশ্রমের ফলে।

প্রগ্রামিংয়ে ছাত্রদের কেন এত অনীহা এবং ভীতি? আমার মতে, প্রগ্রাম করতে গিয়ে শিক্ষানবিশ যখন প্রগ্রামিংয়ের ব্যাকরণ ও যুক্তিগত ভুলের কারণে প্রগ্রাম রান করতে গলদঘর্ম হয়, তখন তার মধ্যে একধরনের দিশাহারা অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ থেকেই ধীরে ধীরে প্রগ্রামিংয়ের প্রতি অনীহা ও ভীতি জন্ম নেয়। অনীহা বা ভীতি কাটাতে প্রগ্রাম পোস্টমর্টেম বা ডিবাগিং করার পদ্ধতি শুধু ভাসা ভাসা নয়, গভীরভাবে শেখাতে হবে। যাতে একজন শিক্ষানবিশ নিজের ভুল নিজেই সংশোধন করতে পারে। প্রগ্রাম ডিবাগিংয়ের অপশনগুলো ভালোভাবে জানলে কেউ প্রগ্রামিংয়ে আগ্রহ হারাবে না। তার মধ্যে তৈরি হবে প্রগ্রামের প্রতি ভালোবাসা। ফলে দেশ পাবে দক্ষ তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক জনবল।

সফটওয়্যার শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয় একটি কার্যকর প্রশিক্ষণমূলক ইন্টার্নশিপ চালু করতে পারে। যার মাধ্যমে সিস্টেম প্রগ্রাম ও প্রগ্রামিং লজিকের দক্ষতার যে ঘাটতি আছে তা দূর করা সম্ভব হবে। অন্যথায় ডিজিটাল সিস্টেমগুলোকে সুরক্ষিত রাখা এবং সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল কখনোই তৈরি হবে না। প্রগ্রামে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট গড়ে তুলতে না পারলে চারদিকে থাকবে গ্র্যাজুয়েটের ছড়াছড়ি, কিন্তু প্রয়োজনে সঠিক মানুষটি খুঁজে পাওয়া হবে দুষ্কর। ডিজিটাল বাংলাদেশ ধাপে ধাপে গড়ে উঠছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য দক্ষ তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক প্রকৌশলী। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়। অন্যথায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ডিজিটাল অবকাঠামো হয়ে পড়বে ভঙ্গুর ও অরক্ষিত। পরিণামে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আস্বাদনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ডুয়েট, গাজীপুর

 

মন্তব্য