kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে দুর্নীতি কমবে

ইসহাক খান

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে দুর্নীতি কমবে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন লিখেছেন, ‘বালিশের রেকর্ড ভেঙেছে বই। বইয়ের রেকর্ড ভেঙেছে পর্দা। পর্দার রেকর্ড ভাঙবে কোন বস্তু?’ তিনি আরো লিখেছেন, রেকর্ড গড়া হয় ভাঙার জন্য। বর্তমানে সর্বকালের রেকর্ড গড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা ফরিদপুর একটি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে যে দাম দেখিয়েছে, সেটি নাকি দুর্নীতির সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। একটি পর্দা কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। একটি স্টেথিস্কোপ কিনতে খরচ হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তিনটি ডিজিটাল ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র কেনা হয়েছে ৩০ লাখ টাকায়। আমি একজন ডাক্তারকে এ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রকৃত মূল্য জানতে চাইলে তিনি সরকারি ক্রয়ের তালিকাটি জানতে চান। আমি সরকারি ক্রয়কৃত মূল্য বলায় তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। জবাব না দিয়ে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকেন।

মহামান্য হাইকোর্ট ছয় মাস সময় বেঁধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ধরনের প্রশাসনিক কাজে হাইকোর্টকে সময় ব্যয় করতে হলে তাঁরা মামলা পরিচালনা করবেন কিভাবে? এমনিতে মামলার জটে উচ্চ আদালতের হিমশিম খাওয়ার জোগাড়। তার মধ্যে প্রশাসনিক চুরিচামারির তদন্ত নিয়ে ভাবলে তাঁদের আসল কাজ তাঁরা করবেন কখন? কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে যারা দুর্নীতি ধরবে তারাই আজ বড় দুর্নীতিবাজ। এই যে স্বাস্থ্য দপ্তরে এত বড় বড় দুর্নীতি হচ্ছে, এর কমিশন কারা কারা পাচ্ছেন? কে এই বিল পাস করেছেন? কে এই কেনাকাটায় এস্টিমেট করেছেন? যাঁরা এর সঙ্গে যুক্ত তাঁরা সবাই এই চুরির ভাগ পেয়েছেন। এতে রুই-কাতলা কেউ বাদ যান না। মন্ত্রণালয়ের মহামান্যরা এর ভাগ পাচ্ছেন। সরকারি কেনাকাটায় ফাইল অনেক টেবিল ঘোরাঘুরি করে। তার মানে সব টেবিলেই কমিশন পৌঁছেছে। না হলে চুরির কথা আগেই জানাজানি হয়ে যেত। এই চুরির ব্যাপারটি জানাজানি হয়েছে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে। বিল না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এর পরই এই সমুদ্রচুরির ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে। আর তাই শুনে আমরা বোকা জনগণ হৈহৈ করতে থাকি। আমরা বুঝতে চাই না, এ দেশে এগুলো সাধারণ ঘটনা। অতীতেও ঘটেছে, বর্তমানেও ঘটছে। ভবিষ্যতেও ঘটবে।

ফরিদপুর হাসপাতালের চুরির ঘটনায় তদন্ত চলছে। আমাদের দেশে তদন্ত একটি অদ্ভুত ব্যাপার। তদন্ত কমিটি হয়, তদন্ত হয়; কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন পাবলিক জানতে পারে না।

আরো একটি দুর্নীতির তদন্তে পুকুরচুরি ধরা পড়েছে। সেটি রূপপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। পূর্তমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, দুর্নীতির কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আজ পর্যন্ত সেই দুর্নীতির কী ফলাফল, সেটি দেশবাসী জানতে পারেনি। আদৌ কোনো শাস্তি তাদের হবে কি না, সেটি মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন।

যখনই একনেকে বড় কোনো প্রকল্প পাস হয় তখনই কেউ কেউ বাতাসে দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে যান। তাঁদের নাক বেশি টাটকা। অল্পতেই তাঁরা বুঝে ফেলেন এখানে অনৈতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। একনেক প্রকল্পে যদি দেশের বাইরে থেকে কিছু কেনাকাটার ব্যাপার থাকে, তাহলে নিশ্চিত কিছু মানুষ কোটিপতি হবেনই। তাঁদের কোটিপতি হওয়া থেকে কেউ থামাতে পারবেন না।

এবার বিআরটিএর দুর্নীতি নিয়ে কিছু কথা। যদিও এই প্রতিষ্ঠান বরাবরই দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। তার পরও নতুন ধরনের দুর্নীতির স্বাদ পাওয়া যাবে এবার। প্রসঙ্গ বিলাসী গাড়ি। ভুয়া কাগজপত্রে নিবন্ধন নিয়ে বিএমডাব্লিউ, আউডি, জাগুয়ারসহ বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি রাজধানীর সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গাড়ি আমদানিকারক থেকে শুরু করে বিআরটিএর কর্মকর্তা-দালালদের তৈরি করা চক্রের মাধ্যমে এই নিবন্ধনপ্রক্রিয়া চলে। জানা গেছে, দফায় দফায় চিঠি দেওয়ার পরও বিআরটিএ এ ধরনের বিলাসবহুল গাড়ির তালিকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে দিতে চায়নি। সর্বশেষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে বিআরটিএ ৮৯১টি বিলাসবহুল গাড়ির তালিকা এনবিআরকে দিয়েছে। তালিকায় ২৫৭টি গাড়ির নিবন্ধনই দেওয়া হয়েছে করদাতার নাম-পরিচয় ছাড়া। এসব গাড়ির দাম এক কোটি থেকে ১০ কোটি বা এর চেয়েও বেশি। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় কমপক্ষে ৫০ হাজার বিলাসবহুল গাড়ি আছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এর বেশি অংশই ভুয়া নথিপত্রে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে এভাবে নিবন্ধন নিয়েছেন গাড়ির মালিকরা। এনবিআর কর্মকর্তারা তদন্তে আরো জেনেছেন, কিছু গাড়ির নিবন্ধনে টিআইএন দেওয়া হলেও আয়কর রিটার্নে তা উল্লেখ করা হয়নি। তাঁরা বলেছেন, এতে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ১১৭ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআরটিএর ঢাকার মিরপুর, ইকুরিয়া, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, পটুয়াখালী, জামালপুর, খাগড়াছড়ি, ফেনী ও কক্সবাজার কার্যালয় থেকে গাড়ির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ভুয়া নথিপত্রে। তদন্তে বের হয়ে আসছে ভুয়া নিবন্ধনে জড়িতদের অনেকের নাম-পরিচয়। যেমন—শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ব্যবহার করা একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি [ভোলা-ঘ-১১-০০-৩৫] ভুয়া আমদানি দলিলাদি দিয়ে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছিল বিআরটিএর ভোলা কার্যালয় থেকে। এ ঘটনায় বিআরটিএর ভোলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আইয়ুব আনছারীকে ওই কার্যালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন পর প্রভাব খাটিয়ে ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি হন। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে বিলাসী গাড়ির অবৈধ নিবন্ধনে ঘুষ লেনদেনের তিনি মূল হোতা। অথচ তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। বুক ফুলিয়ে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। দুর্নীতি করলে যে এ দেশে কারো কোনো শাস্তি হয় না—এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তার প্রকৃত উদাহরণ।

বিআরটিএর দুর্নীতির ফিরিস্তি অনেক লম্বা। লিখে শেষ করা যাবে না। সবখানেই যখন দুর্নীতির মচ্ছব চলছে তখন শিক্ষাঙ্গন বাকি থাকবে কেন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হল এবং প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। এই টাকার কর্তৃত্ব নিয়ে চলছে শিক্ষকদের মধ্যে আন্দোলন। যাঁরা কর্তৃত্ব পাবেন তাঁদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে। ছাত্ররা নেমেছেন রাতের অন্ধকারে গাছ কেটে পরিবেশ ধ্বংস করার প্রতিবাদে। সেখানে গুঞ্জন আছে, ওই টাকা থেকে ছাত্রলীগকে দুই কোটি টাকা দেওয়া হবে। যেন তারা উন্নয়ন [দুর্নীতি] কাজে ঝামেলা না পাকায়।

এভাবে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে দুর্নীতি। পুকুর খননের ট্রেনিং গ্রহণের জন্য ১৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল যাচ্ছে বিদেশে। কী যে হাস্যকর অবস্থা! আমরা এসব অনিয়মের প্রতিকার চাই। এই প্রতিকার চাওয়াটাও হাস্যকর শোনাবে অনেকের কাছে।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা