kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গুরুত্বহীন মানুষের চলাচল প্রসঙ্গে

ফরিদুর রহমান

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুরুত্বহীন মানুষের চলাচল প্রসঙ্গে

কয়েক মাস আগের কথা। বিজয় সরণির মোড়ে ২৫ মিনিটের বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরে যখন ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে, তখন অটোরিকশা থেকে নেমে দায়িত্বে থাকা পুলিশের কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম—‘সমস্যা কী? এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন?’ ন্যূনতম সৌজন্য না দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘সে কৈফিয়ত আপনাকে দিতে হবে নাকি?’ আমি পুলিশ কর্তার উত্তরের জবাবে প্রায় তাঁর সঙ্গে একটা বচসায় জড়িয়ে যাচ্ছিলাম, এ সময় পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন ট্রাফিক পুলিশ বেশ ভদ্রভাবেই বললেন, ‘ভিআইপি মুভমেন্ট চলছে। আপনি গাড়িতে বসেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’ আমি গাড়ি পাব কোথায়! প্রচণ্ড গরমে ঘামতে ঘামতে সিএনজি অটোরিকশায় বসে রইলাম আরো মিনিট দশেক। অবশেষে ৪০ মিনিট পরে ছাড়া পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকা অসংখ্য যানবাহন পরবর্তী সিগন্যালে দাঁড়ালে খোঁজ নিয়ে জানা গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় কোনো একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবেন, সে কারণে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের।

আমি লক্ষ করেছি অন্তত দুটি অ্যাম্বুল্যান্স এবং স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী বহন করে এমন একাধিক গাড়ি এই প্রতিবন্ধকতায় পড়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে ছিল। যেহেতু পুলিশের সব বড় কর্তা, ছোট কর্তার চাকরির পদোন্নতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সে ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা মন্ত্রী মহোদয়ের চলাচলে একটু বাড়তি সতর্কতা দেখাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল-কলেজে দেরিতে পৌঁছাল কি না, অফিসে যাওয়ার জন্য যাঁরা বেরিয়েছেন তাঁরা তাঁদের চাকরি বাঁচাতে পারছেন কি না এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে রোগীর মৃত্যু হলো কি না—কেউ কি তার খোঁজ নিয়েছেন?

ভিআইপির অপেক্ষায় ফেরি ছাড়তে বিলম্ব হওয়ায় অ্যাম্বুল্যান্সে রোগীর মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। শুধু প্রকাশিত সংবাদে নয়, তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কিশোর তিতাসের মৃত্যুর ঘটনার সূত্রে মহামান্য হাইকোর্ট ভিআইপি সম্পর্কিত একটা নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে শুনেছি। এই নির্দেশনা আসলে কী এবং কোথাও কী এর কোনো প্রয়োগ হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের জানা নেই।

নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং অবাধ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের স্বার্থে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সব ভিভিআইপি বা অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রটোকলের ব্যাপারে সচেতন নাগরিক হিসেবে কারো কোনো বক্তব্য নেই। রাষ্ট্র ও সরকারের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অমূল্য সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং একই সঙ্গে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা অবশ্যই  অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থা, দায়িত্বে সচেতনতা এবং মানবিক বিবেচনা বোধের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব না হলে তা অবশ্যই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সংগত কারণেই মানুষের ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিককালের দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করে অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

পরিবাগ ক্রসিংয়ের দুই পাশে অপেক্ষা করা শতাধিক মানুষ যখন ভিআইপি আগমনের জন্য অপেক্ষা করছেন, ঠিক সেই সময়ে হঠাত্ করেই শুরু হলো বৃষ্টি। আশপাশে মাথা বাঁচিয়ে দাঁড়ানোর কোনো জায়গা না থাকায় অনেকেই ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ ঠিক লাঠিপেটা না করলেও উপস্থিত সবাইকে ঠেলাধাক্কা দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নামিয়ে দিয়েছে। ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে চলাচল নিষেধ এবং ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়ানো নিষেধ, এ অবস্থায় বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা অসহায় মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জেগেছিল, এই শহরের বাসিন্দা, এই দেশের নাগরিকদের এই দুর্ভোগ নিরসনের উপায় কী? মিনিট দশেক পরে বৃষ্টি ও ভিআইপি একই সঙ্গে বিদায় নিলে পথচারী এবং পুলিশ সবার মধ্যেই স্বস্তি লক্ষ করা গেছে।

অতি সম্প্রতি একদিন রমনা পার্কে হাঁটাহাঁটি শেষে প্রাতর্ভ্রমণকারীরা দেখলেন পার্কের উত্তর দিকের গেটটি বন্ধ। আবার উল্টো পথে হেঁটে পূর্ব দিকের গেটে যাওয়ার পরে দেখা গেল গেট খোলা কিন্তু গেট দিয়ে বেরোনোর পরে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা নিষেধ। ফলে গেটের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষের জটলার সঙ্গে শুরু হলো পুলিশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক! পথচারীদের যদি হাঁটা নিষিদ্ধ হয় সে ক্ষেত্রে ভিআইপি প্রস্থানের আগ পর্যন্ত গেটগুলো বন্ধ রাখাটাই ভালো ছিল।

আজকাল ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা উত্সব অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল ব্যাপক হারে বেড়েছে বলেই মনে হয়। বেইলি রোডের সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে অফিসার্স ক্লাবের মোড়, বিশেষ করে গেজেটেড অফিসার্স হোস্টেল পর্যস্ত রিকশা চলাচল মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও প্রায় সব সময়ই চালু ছিল। বিশেষ করে ছুটির দিনে এই রাস্তাসহ ভিআইপি সড়কেও চলাচলের কোনো বাধা থাকে না। হঠাত্ এক দিন সন্ধ্যায় দেখা গেল রিকশা প্রবেশ নিষেধ। অতি তত্পর আনসার বাহিনীর সদস্যরা শুধু রিকশার চাকা ফুটো করে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি। প্রায় চলত্শক্তিহীন একজন বৃদ্ধাকে জোর করে নামিয়ে দেওয়ার পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ট্রাফিক সার্জেন্টকে জিজ্ঞেস করে বিষয়টা জানা গেল—অফিসার্স ক্লাবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ভিআইপিদের যোগদান নির্বিঘ্ন করতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একজন বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদানকে কোনো অসুস্থ অশীতিপর বৃদ্ধার ঘরে ফেরার চেয়ে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন, তাঁদের বিবেচনাবোধ সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়।

ঢাকা শহরের মতো একটি জনবহুল এবং যানজটে স্থবির শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচলের বিষয়টির পদ্ধতিগত এবং কৌশলগত বিষয়গুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করে সময় ও গুরুত্বের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারাটা একধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল তথা শ্রম ও কর্মঘণ্টার অপচয় বাড়ছে, পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউতে সময়মতো উপস্থিত হতে না পারায় হতাশা বেড়েছে, ভেঙে পড়ছে কর্মস্থলে নিয়মানুবর্তিতা, কমছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর যথাসময়ে উপস্থিতি এবং তাত্ক্ষণিক চিকিত্সার অভাবে বাড়ছে পথেই মৃৃত্যুবরণকারী রোগীর সংখ্যা। গুরুত্বপূর্ণদের পাশাপাশি শহরের গুরুত্বহীন মানুষের চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার এখনই সময়।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা