kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গোলমালেই সুবিধা বরিস জনসনের

অনলাইন থেকে

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিরোধী দল ও নিজ দলের ২১ জন এমপির হাতে নাকানি-চুবানি খেয়েছে বরিস জনসনের সরকার। গদিতে বসার ছয় সপ্তাহ পর লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, আইনি কারণে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিতভাবেই ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতে বাধ্য হবেন। এর অভিঘাত মিস্টার জনসনের কাছে যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ টোরি পার্টির কাছে। বিদ্রোহীরা দল থেকে বহিষ্কৃত হবে—হুইপকে সরিয়ে দিয়ে এবং পরবর্তী নির্বাচনে তাঁকে টোরি পার্টির প্রার্থী হতে না দেওয়ার মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করা হবে। ব্রেক্সিট নিয়ে দলে যে মতভেদ দেখা দিয়েছে তার ফলে তেমন বিভক্তিই ঘটতে পারে, ১৮৪৬ সালে রবার্ট পিল ‘দ্য কর্ন লজ’ রদ করার পর যেমনটি ঘটেছিল।

মিস্টার জনসন যেন এমন বিভক্তিই চান তাঁর টোরি পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের নোংরা কায়দার বিষয়টিকে আড়াল করার জন্য। তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়া বাইরের লোকদের বিস্মিত করে থাকবে কিন্তু দলের কারোর বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। জুনে ৯২ হাজার টোরি সদস্য ‘নো-ডিলার’ জনসনকে দলের নেতা নির্বাচন করে। এক মাস পরই স্পষ্ট হয় যে শুধু নো-ডিলাররাই মন্ত্রিসভায় বসবে। জনসন পার্লামেন্টে তাঁর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন কিন্তু দলের ভেতরে অবস্থান সংহত করেছেন। এখন কনজারভেটিভ পার্টি স্বদলীয় সমালোচকদের বাদ দেবে, যাতে জনসন আসন্ন নির্বাচনে প্রচারণায় সুবিধা করতে পারেন। যদি সত্যিই নির্বাচন আয়োজন করতে পারেন, তাহলে তিনি ‘চুক্তিহীন ব্রেক্সিট’-বিরোধী যেকোনো আইন পাল্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইবেন। মিস্টার জনসনের বিবেচনায় টেরেসা মের নেতৃত্বাধীন টোরি পার্টি ছিল দুর্বল—আচরণে, মনোভাবে ও চলনে। তিনি ভেবে দেখেছেন, বেদনাহত, ক্ষুব্ধ ও ভীত একটি দেশের এমন দল উপযুক্ত নয়। তিনি ট্রাম্পীয় কৌশল অবলম্বনের পক্ষে—সেটি হলো সমর্থকদের মনোবল বাড়ানোর জন্য প্রতিপক্ষকে উসকানি দেওয়া বা বিরক্ত করা।

প্রধানমন্ত্রী ইইউ ছাড়তে ইচ্ছুক ভোটারদের মাঝে যতটা বিরক্তি-হতাশা-অসন্তোষ ছড়ানো সম্ভব ততটাই করতে চান। এটি একটি চতুর কৌশল। উদ্দেশ্য পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলা, যাতে সাধারণ নির্বাচনে ফলপ্রসূ লড়াই চালানো যায়। চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের ফলাফল অনিবার্য হয়ে ওঠার আগেই তা করতে হবে। আর তা করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাপারে জনসনের কৌশলে ‘উইথড্রয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট’ বিষয়ে আবার দর-কষাকষির জন্য এমন শর্ত দিতে হবে, যা কখনো পূরণ করা সম্ভব নয়। সেটা করা হলে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট অনিবার্য হয়ে উঠবে। তখন প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থতার দায় (পার্লামেন্টে ও মহাদেশে) তাঁর প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবেন। এ কারণেই তিনি প্রতিপক্ষকে (যারা যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেবে!) ‘দালাল’ আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক ও বেলাজ কথাবার্তা বলছেন। রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও বেপথু মতাদর্শের এই অপবিত্র সম্মিলন ব্রিটেনকে দুর্গম ভূ-রাজনৈতিক পথের দিকে চালিত করছে।

ব্রিটেন যদি চুক্তি ছাড়াই ইইউ ছাড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। আর এতে তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে, যারা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, মিস্টার জনসন এখন জীবনযাত্রার ব্যয় কর্তনের কথা বলছেন। জেনে রাখুন, ব্রেক্সিটজনিত কারণে পাউন্ডের মূল্যের অবনমনে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে; এর অভিঘাত পড়েছে গরিবদের ওপর।

মিস্টার জনসন যা করতে যাচ্ছেন তা আসলে উইলিয়াম হেগের জনতুষ্টিবাদের উন্নত সংস্করণ; ২০০১ সালে তা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর সারকথা হলো—লিবারেল এলিটরা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা বিদেশিদের ব্যাপারে ও ইইউ কর্তৃক সৃষ্ট হুমকির ব্যাপারে জনগণের উদ্বেগকে অবজ্ঞা করছে। এসব উদ্বেগ আমলে না নিলে যুক্তরাজ্যকে অচেনা দেশ ভাবতে শুরু করবে জনগণ।

মিস্টার হেগও বিশ্বাস করতেন না ইউরোপীয় সহযোগীদের থেকে আলাদা হয়ে গেলে নিজেদের অবমাননা হবে; আমাদের আইনে-বিধিতে পরিবর্তনের অধিকার হারিয়ে যাবে বা বাকি দুনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করে সবচেয়ে ভালো জিনিসটি পাওয়ার ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি হবে। মিস্টার হেগ ইউরোপের সঙ্গে সংস্কৃতিযুদ্ধ চেয়েছিলেন, বাণিজ্যযুদ্ধ নয়। মিস্টার জনসন দুটিই চান। ইউরোপবিরোধী জনপ্রিয়তাবাদের ভাইরাস ছড়ানোর এটাই কারণ। এটা জাতিকে বেদনাদায়কভাবে বিভাজিত করবে—যেসব ক্ষেত্রে ভালো বোঝাপড়া ছিল সেসব ক্ষেত্রেও। মিস্টার জনসন বোঝেন, এই গোলমেলে পরিস্থিতি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকে টিকিয়ে রাখবে। তাই শাসিতদের দোহাই দিয়ে তিনি সরকারের কোনো অংশকেই অক্ষত রাখবেন না। সব কিছুই তিনি করবেন গদি রক্ষার জন্য। এ জন্যই তাঁকে দমাতে হবে, অবশ্যই দমাতে হবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা