kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মালয়েশিয়ান শিক্ষা

মোস্তফা মামুন

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মালয়েশিয়ান শিক্ষা

মালয়েশিয়ায় এই নিয়ে গেলাম দ্বিতীয়বার। প্রথমবারের সঙ্গে এবারের পার্থক্য হলো, সেবার মাহাথির অবসরে ছিলেন। এবার তিনি ক্ষমতায়। এর ভিত্তিতে খুব পরিবর্তন প্রত্যাশিত নয়। কারণ তখন ক্ষমতাহীন বা এখন ক্ষমতাবান থাকলেও মালয়েশিয়ার সবটা জুড়েই মাহাথির। তাঁর চিন্তা আর পরিকল্পনার ভিতের ওপর মালয়েশিয়ার আধুনিক সংস্করণটা এমন দাঁড়িয়ে আছে যে ২০১৭ সালে যখন তিনি ছিলেন না তখনো সব কিছুতেই শুনেছি তাঁর নাম। আর এখন তো সশরীরে, কেন্দ্রবিন্দুতে। 

মাহাথির সম্পর্কে অনেক গল্প আছে। বহুল চর্চিত বলে অনেকেরই জানা। তবু বলার মতো বলে বারবার বললেও দোষ হয় না। একটা হলো, বিদেশে যখন তিনি যেতেন তখন হাতে একটা নোট বুক থাকত, যা দেখে ভালো লাগত, সঙ্গে সঙ্গেই নোটবুকে টুকে নিতেন। তারপর দেশে ফিরে সেটা নিজের দেশে বাস্তবায়ন করতেন।

দ্বিতীয় গল্পটা খানিকটা মিথের মতো। হৃদযন্ত্রে সমস্যা হয়েছিল। সঙ্গীরা বললেন পাশের দেশ সিঙ্গাপুরে যেতে। মাহাথির বেঁকে বসলেন। বললেন, ‘আমি যদি চিকিৎসার জন্য অন্য দেশে যাই, তাহলে দেশের মানুষরা এই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখবে কী করে?’

মাহাথির গেলেন না। অপেক্ষা করলেন। দেশেই চিকিৎসা করালেন।

এমন জনমুখী নেতারা একটু স্বৈরতান্ত্রিক হলেও মানুষ মেনে নেয়। মাহাথির উদার গণতন্ত্রকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন, বিশ্বাস করতেন এককেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসনে। নিজের ঘনিষ্ঠ সহচর আনোয়ার ইব্রাহিমকে জেলে ভরেছেন চরম রাজনৈতিক জিঘাংসায়। আবার এখন সেই ইব্রাহিমের তৈরি করা মইয়ে চড়েই তিনি ক্ষমতায়। নিজের উত্তরসূরি আবদুল্লাহ বাদাওই এবং নাজিব রাজাকদের ওপর বিরক্ত হয়ে ফের হাত মেলান ইব্রাহিমের সঙ্গে, তাঁর তৈরি কোয়ালিশনের হয়েই নির্বাচন জিতে তিনি আবার ফিরলেন সিংহাসনে। তাতে সাময়িকভাবে দিক হারানো মালয়েশিয়া আবার ফিরতে যাচ্ছে কক্ষপথে। মানুষের মধ্যে যে অস্বস্তিটা আগেরবার দেখেছিলাম, এবার সেটা নেই। এই অশীতিপর মাহাথিরেও লাইন হারানো ট্রেনকে লাইনে ফিরিয়ে আনবে ওরা নিশ্চিত।

ট্রেনের কথা যখন এলো তখন ট্রেন নিয়েই আরেকটা গল্প। কুয়ালালামপুর থেকে ঘণ্টা তিনেক দূরত্বের শহরে বন্ধু ডা. শাহজাহান কবীরের বাস। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে যেতে হলো। ট্রেনে উঠলাম সোয়া ১২টায়, পৌঁছানোর কথা ২টা ৫৬ মিনিটে। ইউরোপে এ রকম সময় নির্ধারিত থাকে এবং যথাসময়ে ট্রেনটি গন্তব্যে হাজির হয়ে একেবারে চমকে দেয়। তা যতই উন্নত হোক, মালয়েশিয়া তো আর লন্ডন-প্যারিস নয়, একটু এদিক-সেদিক মেনে নিতে তৈরিও ছিলাম। আগের দিনের ক্লান্তিতে ঘুমও এসে গিয়েছিল, ভ্রমণসঙ্গী সুদীপ্ত আনন্দের তাড়ায় ঘুম ভেঙে কৌতূহলবশত ঘড়ির দিকে তাকালাম। ২টা ৫৭ বাজে। আর ট্রেন...। দেখতে দেখতে মনে একটা প্রশ্ন জাগল, আচ্ছা আমাদের ট্রেনগুলো কোন দেশ থেকে কেনা হয়! এই রকম বগি কি পৃথিবীতে শুধু বাংলাদেশের জন্যই তৈরি হয়। উঠতে গিয়ে সিঁড়ি পিছলালেন তো গেলেন। আর কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনগুলো মূল স্টেশন থেকে এত দূরে রাখা হয় যে হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে মনে হয় হেঁটেই বোধ হয় গন্তব্যে চলে যাওয়া যাবে। ছোট বিষয়। কিন্তু ছোট বিষয়ই একটা দেশকে ছোট করে রাখে। এবং ছোট সমস্যাকে তুচ্ছ করাও ছোট থেকে যাওয়া চিরস্থায়ী করে।

আগেরবার মালয়েশিয়ায় গিয়ে ইমিগ্রেশনে বড় একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। স্বাভাবিক প্রশ্ন, ‘কী কাজে আসা?’

‘একটা মিটিং আছে। এশিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থার।’

‘তুমি এখানে কী করবে?’

‘আমি বাংলাদেশ অংশের সভাপতি। সেই হিসেবে আসা।’

‘তাই তো জানতে চাইছি...এশিয়ান মিটিংয়ে বাংলাদেশের কাজ কী? বাংলাদেশ তো আর এশিয়ান দেশ না!’

ইমিগ্রেশনের মানুষজনের গড়পড়তা ভূগোল জ্ঞান সাধারণের চেয়ে বেশি থাকে। থাকতে হয়। আর মেয়েটিকে তো এত মূর্খও মনে হচ্ছে না। বরং নিজের জ্ঞানের ওপর তার এমন আস্থা যে একটু ধাক্কা খেলাম। সামলে নিয়ে হেসে বললাম, ‘তুমি নিশ্চয়ই রসিকতা করছ?’

সে অবাক, ‘রসিকতা করব কেন?’

‘বাংলাদেশ এশিয়ান দেশ হবে না কেন? বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটা দেশ।’

সে একটু ভাবে। ভেবে বলে, ‘ও আচ্ছা। তোমার উচ্চারণের বৈচিত্র্যের কারণে আমি বুঝতে ভুল করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আসিয়ান মিটিং। এখন বুঝলাম এশিয়ান মিটিং, কন্টিনেন্টাল মিটিং।’

এতক্ষণে আমিও বুঝতে পারি। আমি বলেছি এশিয়ান, সে বুঝে নিয়েছে আসিয়ান।

দুটির মধ্যে বিরাট পার্থক্য। মালয়েশিয়ায় তো অবশ্যই। ওই আঞ্চলিক সংস্থাটি এখানে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে আছে। বাণিজ্য-কূটনীতি সব কিছুতেই আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) অঞ্চলের ১০টি দেশ এমন পরস্পরমুখী যে সে তুলনায় এশিয়াটা একটু দূরের ব্যাপার। তাই আসিয়ানে এমন মত্ত। এশিয়াকে আসিয়ার মতো শুনে। 

আমাদের এখানেও সার্ক বলে একটা বস্তু আছে। থাকাটাই সার। অনিয়মিত সার্ক সম্মেলন এবং কিছু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন ছাড়া বৃহত্তর জনজীবনে এর এমন কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু ওদের জীবনে আঞ্চলিক সংস্থার গুরুত্ব অনেক। এর সুবাদে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে ভিসা লাগে না। একেবারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো না হলেও এক দেশের মানুষ আরেক দেশে কাজও পেয়ে যায় সহজে। গত সফরেরই আরেকটি গল্প। একটা প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ছিল। যেকোনো দোকানেই পাওয়া যায়, তবু প্রচুর বাংলাদেশির দোকান আছে দেখে বাংলাদেশি দোকানেই গেলাম। দর-কষাকষি ছাড়াই জিনিসটা কিনে এনে পাশের চায়নিজ দোকানে দেখি, দাম এর চেয়ে অনেক কম। বিদেশে দেশের মানুষের ওপর সব সময় ভরসা রেখেছি। ঠকার ঘটনা সে-ই প্রথম। এর পর থেকে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশিদের একটু সতর্ক দৃষ্টিতে দেখি। দেখতে গিয়ে বুঝলাম, যে দেশে প্রচুর স্বদেশি মানুষ থাকে সে দেশের প্রবাসীরা দেশ থেকে আসা মানুষের প্রতি খুব টান অনুভব করে না। ওরা নিজেদের মধ্যেই তৈরি করে নিয়েছে আরেকটা বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা খুব উন্নত বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশিদের করতে হয়েছে খুব কষ্টের কাজ। বেশির ভাগই গেছে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে এবং আজকের যে চাকচিক্যময় মালয়েশিয়া, এটা তৈরিতে বাংলাদেশিদের অপরিসীম ভূমিকা। সেই শ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক সামান্য। অবদানের বিবেচনায় অনেক বেশি অসম্মান। সেটা গভীরভাবে অনুভব করে ভুলে গেলাম তুচ্ছ ঠকে যাওয়া। এদের ঠকে যাওয়া যে এর তুলনায় অনেক বেশি। নতুন সরকার আসার পর ভূমিপুত্র মালয়িদের তুষ্ট করতে গিয়ে স্থানীয়দের জন্য সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে আরো। চীনা আর ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা যেন অসন্তুষ্ট হয়ে ভোটের হিসাবে গোলমাল না পাকায় ভবিষ্যতে, তাই তাদেরও তোষণ চলছে। কোপ পড়ছে বিদেশিদের ওপর। বিশেষত বাংলাদেশিদের ওপর। আগেরবার তাই কুয়ালালামপুরকে যখন মনে হচ্ছিল দ্বিতীয় ঢাকা তখন এবার বাংলাদেশিরা অনেক কম। টাইমস স্কয়ার বা মসজিদ ই ইন্ডিয়ায় বাংলাদেশিদের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাপক ধরপাকড়ের খবর তো দেশে থাকতেই শুনেছি। ফলে কেউ কেউ ফিরে গেছেন দেশে। কেউ কেউ লুকিয়ে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই জানি, এরা শেষ পর্যন্ত হার মানবে না। উপায় বের করবে। লড়বে। টাকা পাঠাবে। সেই টাকায় দেশের অর্থনীতি চলবে। আমাদের এই অর্থনীতির পরিক্রমটাও কী অদ্ভুত। এরা বিদেশে জীবন দিয়ে টাকা পাঠায়। আবার দেশের লুটেরারা সেই টাকা বিদেশে পাচার করে সেকেন্ড হোম-থার্ড হোম তৈরি করে। বিদেশিদের কাছে ফকির-মিসকিন হিসেবে তুচ্ছতা আর অসম্মানে এরা নুয়ে থাকে। আর এদের টাকা লুটেই তথাকথিত বড় মানুষেরা বিদেশে বিলাসী জীবন কেনে।

প্রতিবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় দেশের সঙ্গে সে দেশের তুলনায় মন খারাপ হয়। এবার মালয়েশিয়ানদের দুর্যোগ দেখে অন্য রকম একটা অনুভূতি হলো। টাকা পাচারকারী দুর্বৃত্তদের কাউকে সরাসরি চিনি না। চিনলে হাত জোড় করে বলতাম, ‘ভাই, টাকা লুট করেন। চুরি করেন। ডাকাতি করেন। কিন্তু টাকাটা দেশেই রাখেন। বিদেশে পাচার করবেন না।’

এই তুচ্ছ মানুষগুলোর ঘামের গন্ধের টাকায় প্রিয়জন আর প্রিয় দেশের জন্য ভালোবাসা লেখা থাকে। আফসোসটা হলো, এই ভালোবাসাকে মর্যাদা দেওয়ার মানুষ বিদেশেও নেই। এ দেশেও নেই।

পুনশ্চ : মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের ইদানীংকার সাদৃশ্য আরেকটা কারণে। ওরাও ডেঙ্গুকবলিত দেশ। গিয়ে দেখলাম, তা নিয়ে ওদের বিশেষ দুশ্চিন্তা নেই। কারণ কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গেই সে যে এলাকায় থাকে সেখানে রেড অ্যালার্ট জারি করে লার্ভা নিধনের একটা কার্যক্রম শুরু হয়। ওদিকে সমান্তরালে চলে রোগীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিচর্যা। তাই ওদের খুব উদ্বেগ নেই। রোগ হবে। সে জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সরকার পাশে আছে। আমাদের পাশে এতটা আন্তরিকতাময় হাত নিয়ে কি কেউ আছে! আর দশটি সমস্যার মতো ডেঙ্গুতেও মাথা যার, ব্যথাও তার।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা