kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাজনীতিতে নতুন ভাবনা ও জাগরণ দরকার

এম হাফিজউদ্দিন খান

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজনীতিতে নতুন ভাবনা ও জাগরণ দরকার

রাজনীতি নিয়ে এখন আর নতুন করে কিছু বলার নেই। এখন তো দেশে সেভাবে বলতে গেলে কোনো রাজনৈতিক চর্চা নেই। অনেক রাজনৈতিক দল আছে, কিন্তু সেসব নামমাত্র। সরকারের বাইরে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, দেশব্যাপী তাদের প্রচুর নেতাকর্মী আছে এবং সুসংগঠিত নেতৃত্বের চর্চা আছে। কিন্তু নানা কারণে তারা রাজনৈতিকভাবে কিছু করতে পারছে না। অজস্র মামলায় তারা জর্জরিত। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকা, তাদের দলীয় প্রধান জেলে, বিরোধী দল হিসেবে যে শক্ত অবস্থান থাকা দরকার তার প্রতিফলন নেই—এসব নানা কারণে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে আছে। ফলে তাদের জন্য বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন বা তারা সেভাবে পেরে ওঠেনি।

এখন যেটা বলা যায় বা বাস্তবে যেটা দেখছি—সরকার খুব শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনা করছে। কোনো বিরোধী দল বা শক্তি নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। দেশ পরিচালনায় সরকারের যে ভূমিকা ও কার্যক্রম তা শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। এটা ভালো দিক। যদি সেভাবে ভাবা যায় আর কি।

জাতীয় পার্টি দল হিসেবে টিকে আছে তাদের মতো করে। এরশাদ সাহেব বেঁচে থাকতেও শেষের দিকে রাজনৈতিকভাবে খুব একটা ভূমিকা রাখতেন না। এখন তো তিনি নেই। না থাকায় যে সুবিধা হয়েছে, সে রকম কোনো খবর পাই না। রওশন এরশাদ এবং জি এম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখতে পাচ্ছি। তারাও যে বড় আকারে কিছু করতে পারছে দেশের জন্য, তেমন কোনো আভাস নেই। এক হিসেবে জাতীয় পার্টি তো সরকারের সঙ্গেই আছে। তাদের নানা সমস্যা আছে। একেক সময় একেক রকম কথা বলে। তারা এখনো সরকারের সঙ্গেই আছে। এতে তারা বরং ভালো আছে। জাতীয় পার্টির মধ্যে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরপন্থী ব্যাপার অনেক দিন ধরে থাকলেও এখন সমালোচনা ও দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছে। কে দলীয় প্রধান হবেন, সেটা নিয়ে জোর আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি কথা এবং বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হবে তা এখনই বলা যায় না।

মোটা দাগে বলতে গেলে দেশে এখন কোনো রাজনৈতিক চর্চা নেই। এখন রাজনীতি ও ক্ষমতা মানেই আওয়ামী লীগ। বর্তমানে এক দল এবং এক ব্যক্তির রাজনীতি চলছে। আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই বা রাজনৈতিক চর্চাটা সেভাবে নেই। আরো যেসব রাজনৈতিক দল আছে, ছোট বা বড় আকারে, তাদের ভূমিকা নগণ্য। উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। বামপন্থী দল কিছু আছে। তারা নিজেদের মতো করে তাদের কাজকর্ম এবং রাজনীতি নিয়ে আছে। বড় আকারে জনমত গঠন করে দেশের জন্য, দশের জন্য কোনো আন্দোলন বা সংগ্রামে তারা নেই। ফলে তাদের রাজনীতি নিয়ে আলাদা করে বলার মতো কিছু দেখছি না। আর আছে জামায়াত। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত যুক্ত আছে। সেখানে তারা যে খুব ভালো আছে, এমন নয়। আবার এককভাবে তারা কিছু করতে পারবে, তেমনটা মনে হয় না। তারাও নানাভাবে মামলায় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচিত। তারাও আকারে অনেক বড় দল বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে। স্বতন্ত্রভাবে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে কিছু করতে পারবে বলেও আমার মনে হয় না। জামায়াত নতুন করে দল গঠন করার কথা বলেছিল। একটি নামও দিয়েছিল—আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরেই দ্বন্দ্ব চলছে। নাম বদলালেও জামায়াতের এখনো বড় শক্তি হিসেবে সামনে আসার সম্ভাবনা কম।

গত আলোচনায়ও এসব নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম যে রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠান অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠান চলছে না বা তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে—এমন নয়। কিন্তু প্রাণ নেই। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কোনো বিভাগের প্রধান এমন সব বিষয়ে জড়াচ্ছেন, যার বিশদ আলোচনা করা লজ্জাকর। এতে কার দায় এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, সেসব না হয় তোলা থাকুক। এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, প্রায় সব জায়গায় মোসাহেবি ও চাটুকারিতা বেড়েছে। এসব আগেও হয়তো ছিল কিন্তু এভাবে ছিল না। এসব অসুখ সেরে উঠতেও বহু সময় লাগবে বা আদৌ অসুখ সেরে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ইমেজ ফিরে আসবে কি না বলা শক্ত। একসময় যে সাহস, সততা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলতে দেখেছি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো যে ভূমিকা রেখেছে, তা তো মনে হয় কল্পনার মতো। আমাদের জীবদ্দশায় আর কখনো হারানো ঐতিহ্য সেসব প্রতিষ্ঠান ফিরে পাবে কি না বলতে পারি না।

এখন দেশের এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, অনেক উন্নয়ন হচ্ছে; বহির্দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে জনগণের যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ—সেখানে মনে হয় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এখন একটা অন্য রকম কিছু দরকার। মানুষের মধ্যে গণজাগরণ না হলে চলতি অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। নতুন কোনো সম্ভাবনা ও ব্যক্তিগত ইমেজ নিয়ে কারো যদি আবির্ভাব হয়, তাহলে নতুন কিছু সম্ভব। এর বাইরে আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রাজনীতিকে যদি নতুন করে কিছু করতে হয়, সে জন্য অবশ্যই জাগরণ লাগবে।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট। দুটি বছর পার হয়ে গেল কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হলো না। এটা বেশ হতাশার কথা। এখানে সরকারের দোষ দিয়েও লাভ নেই। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য যে কৌশল ও অবস্থান দরকার সেটা সম্ভব হয়নি। আবার ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, তারা আমাদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেয়। নানা সময়ে পাশে থাকে। কিন্তু রোহিঙ্গা বিষয়ে তারা মুখে এক রকম, কাজে অন্য রকম। ফলে তাদের কাছে বড় ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ আমাদের চাওয়া অনুযায়ী ভূমিকা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কিছু হতে পারেনি। আমাদের চেষ্টা ও লক্ষ্য তো একটাই—যেকোনো উপায়ে তাদের ফেরত পাঠানো। কোনোভাবেই এই ভার আর বহন করা সম্ভব নয়। কারণ রোহিঙ্গা এরই মধ্যে আমাদের জন্য দায় হয়ে উঠেছে। এই ভার আর ঝুলিয়ে রাখা যায় না। তারা নানা ধরনের অপরাধ, খুন ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে শুরু করেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজে আরো জোর দিতে হবে। আবার এটাও সত্য, তাদের প্রতি নজর দিতে গিয়ে দেশের অনেক কাজ আটকে যাচ্ছে। এটাকে আর ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ নেই।

সবশেষে ডেঙ্গু নিয়ে কিছু কথা। ডেঙ্গু সমস্যা কী ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা কারো অজানা নয়। কিন্তু মশার জন্য যে ওষুধ আনা হয়েছে, তাতে মশা মরে না। এসব বিষয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। তারা স্বীকারও তো করে না। আবার দায়িত্বশীল কিছু ব্যক্তি সামাজিকভাবে খুবই পরিচিত বা সেলিব্রিটি মানুষকে ধরে এনে ডেঙ্গু প্রতিরোধের যে মহড়া দিয়েছে, তা অত্যন্ত হাস্যকর। এতে মশা মারা বা জনগণকে সচেতন করার কিছু ছিল না। এ বিষয়গুলো কিভাবে ঘটতে পারে ভেবে খারাপই লাগে। আমি চাকরি থেকে অবসরের পর যখন উত্তরায় আসি ২০০০ সালের দিকে, তখন এলাকায় মশা মারার ওষুধ ব্যবহার করত। কিন্তু মশা মরত না। যে ছেলেটি মশার ওষুধ দিত, বললাম—বাবা, মশা তো মরে না। সে বলেছিল, স্যার, ২০ টাকা করে দিলে মশা মরবে। আমি দিয়েছি। কাজ হয়েছে। উপদেষ্টা হওয়ার পরে সে আর টাকা নেয়নি। তার মানে তারা চাইলে ভালো জিনিসও দিতে পারে।

এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, সরকার নাগরিক বা সুধীসমাজের কথা শোনে বলে মনে হয় না। আবার অনেকে কথা বলতেও ভয় পায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন নতুন জাগরণ ছাড়া আর কোনো আশার আলো দেখতে পাই না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা