kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ডায়াবেটিক সেবা দিবস এবং জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডায়াবেটিক সেবা দিবস এবং জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম

যে দেশ ও সমাজে সীমাহীন সার্বিক (অর্থনৈতিক, চিন্তাচেতনার, সহনশীলতার, সাধনার) দারিদ্র্যের কারণে বড় কিছু করা যায় না, মহৎ কিছু গড়ে ওঠে না এবং যেখানে চিন্তার দৈন্যতা  (Lack of Imagination), উদ্যম-উদ্যোগের অভাব  (Lack of Initiative) এবং ত্যাগ শিকারে অনীহা  (Lack of Sacrifice) অন্যতম প্রতিবন্ধকতা, সে দেশে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমাণ করে দিয়েছেন উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক হয়, তবে স্বল্পোন্নত দেশেও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তথা বারডেমের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। ১৯৫৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিক চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রথম বছরে মাত্র ৩৯ জন রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে এখন শুধু বারডেমই চিকিৎসাধীন নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। শুধু ঢাকা শহর এবং এর উপকণ্ঠে নয়, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ডায়াবেটিক চিকিৎসাকেন্দ্র আজ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সততা থাকলে অঙ্কুর কি করে মহা মহীরুহের রূপ লাভ করতে পারে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠান শাহবাগের বারডেম এটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বারডেম এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিস্ময়করভাবে সমাদৃত, এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক একটি সহযোগী কেন্দ্র  (Collaborating Centre) হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক চিকিৎসার মডেল বা অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে গণ্য করে। আর ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার সঙ্গে আমেরিকার জসলিন, ইংল্যান্ডের লরেন্স ও বাংলাদেশের ইব্রাহিমের নাম জড়িয়ে রয়েছে।

রোগীর পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডা. ইব্রাহিম ছিলেন নৈপুণ্য ও সূক্ষ্মতার প্রতি অচঞ্চল; এর মধ্যেই তিনি তাঁর শিক্ষার্থী, সহকর্মীদের শিখিয়ে ও বুঝিয়ে দিতেন রোগীর রোগ পরীক্ষণ ও নির্ণয় বিষয়টি কত নিখুঁত ও সূক্ষ্ম হওয়া উচিত এবং তিনি কিভাবে তা চান। তিনি ছিলেন প্রকৃতই একজন হাতে-কলমে শিক্ষাদাতা এবং একাধারে তাঁর চিকিৎসাদর্শনের মর্মসাধক। ‘আমি নিজে একটা কথা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি এবং আমার সহকর্মীদের এ কথাটা আমি সব সময় বলি যে আমরা জনগণের খাদেম, এ মনোভাব নিয়ে সেবা করব, তাদের প্রভু—এই মানসিকতা নিয়ে নয়। কারণ নিজেকে খাদেম মনে করলেই সেবাটা আন্তরিক হয়, মনের মধ্যে বিনয় আসে আর মানুষের প্রতি একটা মানবিক সহমর্মিতা জেগে ওঠে। আরেকটা কথা আমাদের ভুললে চলবে না, তা হলো আমাদের এই জনগণ হলো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জনগণ। এরা ১৯৪৭ সালের আগের ব্রিটিশদের গোলাম জনগণ নয়। এরা ১৯৭১ সালের আগের জনগণ নয়। যখন এ দেশকে বলা হতো কলোনি। এরা স্বাধীন-সার্বভৗৈম একটি দেশের জনগণ।’

ডা. ইব্রাহিম চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করতেন। ইংরেজি ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো স্বীয় সত্তা অন্যের সত্তায় বিলীন করে দিয়ে, অন্যের শোক, দুঃখ ও ব্যথার অভিজ্ঞতা কল্পনায় নিজে অনুভব করার শক্তি। আর ‘সিমপ্যাথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো, অন্যের শোক-দুঃখের সঙ্গে সমবেদনা বা সমব্যথিত হওয়া। অন্যের শোক, দুঃখ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা মনে না করলে যেমন দুঃখী বা আর্তপীড়িতের গভীরে যাওয়া যাবে না, ঠিক তেমনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী সব ডাক্তার, সেবাকর্মী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিনি সব সময় বলতেন, ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাবকে নিজের মনে প্রতিফলিত করে সেবাদানে মনোনিবেশ করতে। এরূপ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যখন কোনো সেবাদানকারী কোনো আর্তপীড়িতের সেবায় নিজেকে প্রয়োগ করবে, সেই সেবাদানকারীই আর্তপীড়িতের সত্তার সঙ্গে বিলীন হতে পারবে আর সেবাদান তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে। পক্ষান্তরে ডা. ইব্রাহিম তাঁর সেবাদানকারী সহকর্মীদের বলতেন, তারা যেন রোগীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এ জন্য যে তারা (রোগীরা) এখানে আমাদের সেবা গ্রহণ করতে এসেছে এবং তারা না এলে আমাদের কাজ থাকত না। 

জাতীয় অধ্যাপক ইব্রাহিম চিকিৎসায় মানবসম্পদ তৈরির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বারডেম একাডেমি এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট, আরভিটিসি ও বারটান গড়ে তোলেন। এরই সূত্র ধরে বা ভিত্তিতে পরবর্তীকালে সমিতির ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ, নর্থবেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস), বারডেম নার্সিং কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও চিকিৎসা ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কেননা তিনি মনে করতেন মানবিক গুণ এবং সামাজিক দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন দক্ষ চিকিৎসক নার্স ও টেকনিশিয়ান না থাকলে বা গড়ে না উঠলে কার্যকর ডায়াবেটিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক চিকিৎসা কার্যক্রমের শুরু থেকেই পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। তিনি মনে করতেন, ডায়াবেটিক রোগী তার লাইফ স্টাইল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অর্ধেক চিকিৎসা শেষ। উপযুক্ত পরামর্শ পেলে খাদ্যমান বজায় রাখা এবং শৃঙ্খলা সহজসাধ্য হয়। ওষুধপত্র দেওয়ার সঙ্গে রোগীকে খাদ্যের তালিকা—কোন খাদ্যে কী পরিমাণ শর্করা ও ক্যালরি বা প্রোটিন আছে তার একটা সচিত্র স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়। গাইড বইয়ে প্রতিটি রোগীর কী ধরনের খাবার কী পরিমাণ খেতে হবে তার নির্দেশনা চার্ট দেওয়া আছে। সমিতির প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হেলথ এডুকেটরের পদ রয়েছে এবং রোগীকে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক রোগীর পুনর্বাসনের বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনাকে জাগ্রত রেখেছিলেন। তিনি জুরাইনে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি সমিতিকে দান করে তথায় ডায়াবেটিক রোগীদের পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেন। ডায়াবেটিক রোগীরা যাতে সংসারে ও সমাজে বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, কর্মজীবনে অকেজো না হয়ে পড়ে, সে জন্য তাদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে যারা টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগী তাদের সংসারে এবং সমাজে যাতে বোঝা হয়ে না দাঁড়াতে হয় সে জন্য সমিতির সিডিআইসি প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ২০-২১ বছর বয়স অবধি তাদের বিনা মূল্যে ইনসুলিন সরবরাহসহ তাদের মানসিক, শারীরিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

১৯৫৬ সালে মাত্র ২৩ জন রোগী নিয়ে সেগুনবাগিচার টিনশেডে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যখন ডায়াবেটিক চিকিৎসা শুরু করেন, তখন থেকেই রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লব্ধ প্রাইমারি ডাটা সোর্সকে গবেষণার উত্কৃষ্ট উপাদান বিবেচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। সে সময় পরীক্ষার জন্য রোগীর সন্ধানে নামতে হতো তাঁকে। রাস্তায় চলার পথে কোনো রোগাক্রান্ত অসহায়-অসুস্থ মানুষ ভিখারিবেশে বসে থাকলে তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতেন, তাকে খাইয়েদাইয়ে ভালো পোশাক-আশাক পরিয়ে উত্ফুল্ল করে তারপর তার থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতেন। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁর গবেষণা এগিয়ে চলত। তাঁর প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধগুলোতে বাস্তব অনুসন্ধান উৎসারিত পরিসংখ্যান তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণের উপান্তে এসে একটি পরিশীলন পর্যায়ে পৌঁঁছাত। আধুনিক গবেষণা রীতিতে—ডাটা বিশ্লেষণ এবং একটা রেশনাল কনক্লুশনে উপনীত হতেন এবং তারই ভিত্তিতে টেকসই ও লাগসই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পথে যেতেন। এসব দেখেই বোঝা যেত তিনি একাধারে সফল ক্লিনিশিয়ান যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন খ্যাতনামা চিকিৎসক, শিক্ষক, হাসপাতাল প্রশাসক, সমাজ সংগঠক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, গবেষক শুধু গবেষণায়, ক্লিনিশিয়ান শুধু ক্লিনিক্যাল চিকিৎসায়, আবার সমাজ সংগঠক শুধু তাঁর এলাকায়ই সীমাবদ্ধ ও নিবেদিত।

 

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান

বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা