kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিরোধিতা যখন শালীনতাকে অতিক্রম করে

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিরোধিতা যখন শালীনতাকে অতিক্রম করে

আমার মতোই শিক্ষকরাজনীতি অপছন্দ করা এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বলছিলেন, আপনাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তো ঐতিহ্য রয়েছে ভিসি বিতাড়ন আন্দোলনের। অনেক দিন তেমন আন্দোলন দানা বাঁধেনি, এখন একটু-আধটু পত্রিকায় নিউজ হচ্ছে। কয়েকটি দুর্বল ইস্যু নিয়ে সরব হচ্ছে একপক্ষ। শিক্ষার্থীদের কোনো কোনো পক্ষ বুঝে না বুঝে ওই পক্ষের হাত শক্ত করছে, সুবিধাবাদীরা সেই সহজ পথ খুঁজে ফেরে সব সময়। সহকর্মী বন্ধুটি কিছুটা শ্লেষের সুরেই বললেন, অনেক দিন আন্দোলন না করে কি কোনো পক্ষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে? আবার দেখবেন শালীনতা যেন অতিক্রম না করে!

বাঙালি সব সময় প্রতিবাদী। আর কেউ না নামলেও বাঙালি দাবি আদায়ে পথে নেমেছে বারবার। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলন করতে গিয়ে উর্দুভাষী পশ্চিমারা নয়, বাঙালি ছাত্ররাই কলকাতার রাজপথে নেমেছিল। সে সময় রাজপথের আন্দোলনে তরুণ শেখ মুজিবের নেতৃত্ব ছিল। বাংলার ইতিহাসে দেখা যায় যেসব আন্দোলন গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে নয়—যৌক্তিক বিচারে সংগঠিত হয়েছিল তা থেকে সাফল্য এসেছে। আবার ছোটখাটো সাফল্য যুক্তি ছাড়া উন্মত্ততা দেখিয়েও তথাকথিত সাফল্যও এসেছে। কিন্তু পরবর্তী সময় আত্মচৈতন্যে ফিরে বিবেকের যাতনা অনুভব করেছেন আন্দোলনকারীদের অনেকে। এর সব ধরনের উদাহরণই আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এখনো তেমন আন্দোলন দানা বাঁধেনি। তবে পাঁয়তারা চলছে। সংবাদ মাধ্যমে একটু একটু খবর বেরুচ্ছে। সেখানেই আশঙ্কা। সব বাড়াবাড়িতেই সমস্যা থাকে। আমরা ঘরপোড়া গরু বলে সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাই। এ কথা বলার কারণ আছে। এরই মধ্যে ভবন তৈরির জন্য জাহাঙ্গীরনগরে গাছ কাটা এবং নির্মাণকাজে ছাত্রলীগ ও অন্যদের দুই কোটি টাকা কমিশন দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কোনো কোনো পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের আগেই দুর্বল সূত্র ও মতলববাজদের সুর ধার করে রিপোর্টিং, টক শো করে যাচ্ছে। মিডিয়া অঞ্চলে আগে কোনো ইস্যুর কৃতিত্ব নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা তো আছেই। আমরা যারা ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি করি না, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল চাই, তাঁরা এখনই সিঁদুরে মেঘ দেখা শুরু করেছি।

কথাটি এ জন্য বলছি, গাছ কাটার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও আবেগের সম্পর্ক তো রয়েছেই। তাই রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে থেকে সুবিধাপ্রত্যাশী যাঁরা তাঁরা এমন ইস্যু ছাড়বেন কেন! একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও প্রশাসনবিরোধী দুই পক্ষের এক পক্ষকে মদদ দেওয়ার মতো করে ছাত্রলীগ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দুই কোটি টাকা কমিশন দেওয়ার অপরাধে অপরাধী করে রিপোর্ট ছেপেছে। সূত্র হিসেবে একজন ছাত্রলীগ নেতার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, পত্রিকাটি অমন রিপোর্ট প্রকাশ করে কি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে? বরং এই রিপোর্ট এক পক্ষের হাতে সুবিধার বল তুলে দিয়েছে। অমন রিপোর্ট প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে গেছে। অন্যায় থাকলে বিরুদ্ধে যেতেই পারে। কিন্তু যদি বেলাশেষে দেখা যায় সত্যের চেয়ে গুজবই বেশি, অথচ ততক্ষণে যদি অযৌক্তিকতার ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়, তবে এর দায় কে নেবে? ছাত্রলীগ তো এখন সারা দেশে নিজেদের মধ্যে কোন্দল এবং মারামারি করছে বেশি। সেখান থেকে শিক্ষকরাজনীতির নায়করা যে যার মতো করে সুবিধা নেওয়ায় তৎপর। তাই একজন ছাত্রলীগকর্মীর বক্তব্য নির্বিচারে একটি পত্রিকার সূত্র হয়ে যায় কেমন করে? বিশেষ করে ইস্যুটি যেখানে সেনসেটিভ। অথচ খোঁজ নিলেই দেখা যেত জাবি ক্যাম্পাসে সরকার সমর্থক শিক্ষকরাজনীতির দুই পক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাখছে। লিফলেট বিতরণ করছে। সংবাদ সম্মেলন করছে। এরও প্রেক্ষাপট রয়েছে।

বেশি আগের কথা নয়, একপক্ষীয় আন্দোলনে অনেকটা পেশিশক্তির কাছে নতজানু হয়ে সরকার অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ভিসি পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। এর আগের ভিসির বিরুদ্ধে বলা যায় জাবি ক্যাম্পাস ফুঁসে উঠেছিল। একটি সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ভিসি। এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সংগঠিত হতে থাকে পদত্যাগী ভিসির দল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শধারী বলে প্রচারিত হলেও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের হাতে নিয়ে শক্তি বাড়ায়। আর এই সূত্রে ভিসি ড. আনোয়ার হোসেনকে বিদায় নিতে হয়। আবার মসনদ ফিরে পাওয়ার একটি প্রেক্ষাপট রচনা করা হতে থাকে। নতুন ভিসি প্যানেল নির্বাচনে সক্রিয় রাজনীতিতে না থাকা জনপ্রিয় শিক্ষক ও গবেষক ড. ফারজানা ইসলামকে নিজেদের প্যানেলে রেখে নির্বাচন করানো হয়। নির্বাচনে জেতার পর সরকার ড. ফারজানা ইসলামকে ভিসি নিয়োগ করল। এটা সাবেক ভিসির দল নিজেদের বিজয় হিসেবে মানল। প্রথম দিকে তারা ছায়া ভিসি হয়ে ড. ইসলামকে পরিচালনা করতে থাকল। তাদের বলয়ের বাইরে যাওয়া সে সময় ভিসির পক্ষে সম্ভব ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে আমি ড. ফারজানা ইসলামকে যতটুকু জানি তাতে তাঁর বিকিয়ে যাওয়ার কথা নয়। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ড. ফারজানা ইসলাম যখন স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে ভিসির দায়িত্ব পালন করা শুরু করলেন, তখন থেকেই তাঁর ওপর হামলে পড়লেন সাবেক ভিসি ও তাঁর দল। তখন থেকেই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব শুরু হলো। লিফলেট-পাল্টা লিফলেট ছড়াতে থাকল ক্যাম্পাসে। ভিসির বিরুদ্ধে নানা ইস্যু তুলে মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট ইত্যাদির কয়েকটি আয়োজন করা হয়েছিল। এ সময়ও এই দল বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশকে পাশে পায়। কিন্তু কোনো আন্দোলনই জমাতে পারেনি তারা।

এরপর তারা ভিন্নপথ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তামাদি সিনেট নির্বাচন হবে বিবেচনায় দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় ভোটার সংগ্রহে দেশজুড়ে চষে বেড়ায়। শোনা যায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে। এর পেছনে বড় কারণ নাকি শতকোটি টাকা। কথা রটেছিল, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নে শতাধিক কোটি টাকা বরাদ্দ দেবে। এসব রাজনৈতিক দলের পরিচালকদের মাথা ঘুরে যায়। সিনেট নির্বাচনের সূত্র ধরে ভিসি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হন অনেকে। নির্বাচনও তাঁদের অনুকূলে যায়। কিন্তু সরকারি সংস্থা সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিল। তাই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ড. ফারজানা ইসলামকেই আবার চার বছরের জন্য ভিসি পদে পুনর্নিয়োগ দেয় সরকার। এবার হতাশ অন্য পক্ষ নানা পথ খুঁজতে থাকে। এর মধ্যে শতাধিক কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ এসে যায়। এখন তো আর মাথা ঠিক থাকার কথা নয়। নানা উপায়ে ভিসিবিরোধী আন্দোলন তৈরির প্রেক্ষাপট রচিত হতে থাকে। যার গরম হাওয়া আমরা একটু একটু আঁচ করতে পারি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও উচিত দুই কোটি টাকা-সংক্রান্ত বিতর্ককে গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায় থেকে বা অন্তত ইউজিসির দায়িত্বে তদন্ত করে নিজেদের স্বচ্ছতা স্পষ্ট করা। তাহলে আর ঘোলা পানিতে মাছ ধরার সুযোগ অনেকে পাবে না। অবশ্য আমাদের দেশের বাস্তবতায় এ সত্য অনেকেই বিশ্বাস করেন ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন নেতা-আমলা সব পক্ষকে বড় প্রকল্পের বিপরীতে বড় অর্থ কমিশন দিতে হয়। ওটা এক রকম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তনই হয়ে যায়। যদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ঘটেও থাকে, তা অনন্য উদাহরণ হবে না। সর্বত্রই একই উদাহরণ পাওয়া যাবে। এখানে ব্যক্তি ভিসি ও তাঁর প্রশাসনের করার তেমন কিছু থাকে না। এ নষ্ট আচরণ থেকে মুক্তি পেতে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন হওয়া উচিত। সুবিধাবাদী শিক্ষকরাজনীতির কারণে সব সত্য বুঝেও শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করে বৃহত্তর সত্যকে যেমন আড়াল করা হয়, আর আসুরিক দাপটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পালাবদলের পথকে প্রশস্ত করা হয়।

যে অশনিসংকেত আমাকে আতঙ্কিত করছে তা হচ্ছে নিকট-অতীতে আমাদের ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনীতিক শিক্ষকরা ভিসি উচ্ছেদ আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক সময় শালীনতাকে অতিক্রম করেছেন। বল প্রয়োগ করেছেন। ভিসির বাড়িতে আক্রমণ করেছেন আমাদেরই সহকর্মীরা। অকথ্য গালাগাল করেছেন ভিসির পরিবার-পরিজনকে। ভাঙচুর করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছেন। ঈশ্বর না করুন, আমরা আবার তেমন কলঙ্ক যেন গায়ে না মাখি। লিফলেট-বিবৃতিতে তেমন আলামত কিন্তু দেখা যাচ্ছে।

প্রিয় শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, তারা যেন সুবিধাবাদীদের পাহাড়ে ওঠার মই হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। আর সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, অনেক দিন ধরে ক্যাম্পাসে শান্তি বিরাজ করছে। ক্লাস-পরীক্ষা এক দিনের জন্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তাই শুরুতেই প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ গ্রহণ করুন।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা