kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চাঁদের শব্দ : হানিমুন ও অন্যান্য

আন্দালিব রাশদী

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদের শব্দ : হানিমুন ও অন্যান্য

জ্যাক ও জিল বারে ঢুকে আশ মিটিয়ে পান করে পুরো মাতাল হয়ে বেরিয়ে এলো। আকাশে আলোর গোলক দেখে জ্যাক বলল, দেখ ব্যাটা, কী সুন্দর পূর্ণ চাঁদ।

জিল ভালো করে তাকিয়ে বলল, অসম্ভব, এটা সূর্য। দুজনের মধ্যে মারামারি লেগে গেল। একসময় তারা তৃতীয় কোনো পক্ষের রায় মেনে নিতে রাজি হলো।

ভিন্ন একটি বার থেকে অন্য একজন বেরোতেই দুজনই তার রায় শুনতে চাইল—চাঁদ না সূর্য। তৃতীয়জন অনেকক্ষণ আকাশে আলোর গোলকের দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় চোখ নামিয়ে বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না, আমি এই এলাকার লোক নই। তার কথা শুনে দুজনেই বলে উঠল, শালা মুনস্ট্রাক (Moonstruk)|

মুনস্ট্রাক মানে চন্দ্রমুগ্ধ কিংবা চাঁদে পাওয়া মানুষ। চাঁদে পাওয়া মানে মাথার স্ক্রু ঢিলে। ইংরেজি-বাংলা অভিধান মুনস্ট্রাকের যে কয়টা বাংলা মানে লিখেছে, কোনোটিই প্রীতিকর নয়! কাণ্ডজ্ঞানহীন, মানসিক বিকারগ্রস্ত, পাগল, মাথা খারাপ,  খেপা, উন্মাদ, বুদ্ধিভ্রষ্ট, স্বপ্নচারী, বিকৃত মস্তিষ্ক এবং আরো কিছু।

যারা মুনি (moony) তারা মুনস্ট্রাক, তারা স্বপ্নবিলাসী। তারা পুলিশ ডাকার মতো কাজও করে বসে। ট্রাউজার খুলে পশ্চাদ্দেশ দেখিয়ে দেয়; Mooning মানে তা-ই। কিন্তু এটা কি ফৌজদারি অপরাধ? উত্তর হ্যাঁ এবং না দুটোই। নিতম্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্য কী—দৃষ্টি আকর্ষণ? কাউকে অপমান করা? নাকি প্রকাশ্যে যৌনতার প্রকাশ? নিতম্বও যৌনতা প্রকাশের অর্থ হিসেবে বিবেচিত। মুনিং অবশ্যই গণ-উৎপাত, সুতরাং অপরাধ আর অসংযত যৌনতার প্রকাশ হলে তো কথাই নেই।

কিন্তু ম্যারিল্যান্ডের আদালত মুনিং—অর্ধ কিংবা পূর্ণ নিতম্ব মেলে ধরাকে অপরাধ বলতে রাজি হয়নি। কারণ ম্যারিল্যান্ড সমুদ্রসেকতে থোঙ পরিহিত নারীর পশ্চাদ্দেশের অর্ধেকের বেশিই জনসমক্ষে প্রকাশিত। অপরাধ হলে তাদেরও তো ধরতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অ্যালকোহলের প্রভাবেই মানুষের ‘মুনি’-ভাব (মুনি-ঋষির ভাব নয়) বেড়ে যায়।

আরো কয়েকটি মুনযুক্ত শব্দ

মুনবো (Moonbow) : বৃষ্টির পর সূর্যের আলো পড়ে যে রংধনু রেইনবো সৃষ্টি হয় এটা আমাদের জানা ও দেখা। সন্ধ্যায় বা রাতের বেলায় চাঁদের আলো পড়ে যে ধনুর সৃষ্টি, তা মুনবো। দুর্লভ হলেও নিশ্চয়ই আমাদের কারো চোখে মুনবো পড়ে থাকবে।

মুনকাফ (Mooncalf) : এটা চাঁদের ছানা হলে নামের সঙ্গে বেশ মিলে যেত। যে বাছুর চাঁদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, সেটাও তো মুনকাফই হবে। অভিধান এর যে কয়টা মানে স্থির করেছে তার মধ্যে রয়েছে মাথামোটা, নির্বোধ ও আহাম্মক।

মুনফিশ (moonfish) ও মুনআই (mooneye) : মুনফিশ অবশ্যই মাছ। চওড়া, পাতলা এবং রৌপ্যবর্ণ। এই মাছটিকে সিলভার মুনফিশও বলা হয়।

কিন্তু মুনআই কী? চাঁদের চোখ না চাঁদের মতো চোখ? চন্দ্রচক্ষু উপমা কম, তবে চন্দ্রবদনের কোনো কমতি নেই। কিন্তু মুনআইয়ের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। মুনআই হচ্ছে উত্তর আমেরিকার মিঠা পানির কাঁটাওয়ালা মাছ।

মুনফ্লাওয়ার কিংবা চন্দ্রমুখী : নিঃসন্দেহে একটি ফুল, একে মুন ডেইজিও বলা হয়। ভ্যান গগের নজরে পড়ে সানফ্লাওয়ার কিংবা সূর্যমুখী অধিকতর খ্যাতি অর্জন করেছে। বাজার অর্থনীতির যুগে সূর্যমুখীর তেলও বেশ জায়গা করে নিতে পেরেছে। মুনফ্লাওয়ার সকালের সৌরভ ছড়ানো বড় সাদা ফুল, রাতেই ফোটে।

মুনলেট (Moonlet) :  মুনলেট হচ্ছে ছোট উপগ্রহ—স্যাটেলাইট। এই উপগ্রহ প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম দুই রকমই হতে পারে।

মুনপোর্ট (moonport) : শব্দটির বয়স ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। এটি অবশ্যই বন্দর। জলবন্দর নয়। চাঁদে নভোযান অবতরণের সুযোগ যে জায়গায় সৃষ্টি করা হয়, তা-ই মুনপোর্ট। আগামীতে সৃষ্টি হবে মার্সপোর্ট—মঙ্গলবন্দর।

মুনস্টোন (moonstone) : মুনস্টোন অবশ্যই অ্যাপোলে-১১-এর নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং ও এডউইন অলড্রিনের অনেক কষ্টের বিনিময়ে সংগ্রহ করা চাঁদের পাথর নয় কিংবা পরবর্তীকালে আনা পাথরও নয়। এর নাম চন্দ্রকান্ত মণি; এই পাথরের প্রধান সরবরাহকারী দেশ শ্রীলঙ্কা।

মুনলাইট (moonlight) : নিঃসন্দেহে চাঁদের আলো কিন্তু কেউ যখন মুনলাইটিং করে এমন নয় খালি গায়ে চাঁদের আলো মেখে গড়াগড়ি দেয়। মুনলাইটিং মানে একটি চাকরির বাইরেও গোপনে আরেকটি চাকরি করা। তুমি যে মুনলাইটিং করছ, যদি বস জেনে যান, মূল চাকরিটা কিন্তু হারাবে।

মুনশাইন (moonshine) : এখানেও নিঃসন্দেহে চাঁদের আলো। কিন্তু কেউ যখন মুনশাইনিং করে, সে আসলে অবৈধভাবে মদ চোলাই করে। রাতের আলোয় করে বলেই মুনশাইনিং।

মধুচন্দ্রিমা (Honeymoon) : মধু ও চাঁদের সম্মিলনে বাংলা মধুচন্দ্রিমা ইংরেজি হানিমুনের অনেক পরে সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজিতে প্রথম ব্যবহার ১৫৪৬ সালে। বিয়ের প্রথম মাসটাই (হয়তো চান্দ্রমাসই!) সবচেয়ে মধুর। হানিমুনের ব্যাখ্যায় তখন ভালোবাসা ও সুখের উল্লেখ করা হয়েছে।

একসময় বর ও কনেসহ আত্মীয়-স্বজনের সম্মিলিত সফরও ছিল হানিমুন। কিন্তু উনিশ শতকের শুরুতে আত্মীয়-স্বজন বাদ পড়ে যায়। শুরু হয় শুধু বর আর কনের সফর—ইউরোপীয় অভিজাতদের তখন গন্তব্য ফ্রেঞ্চ রিভেরা কিংবা ইতালির রোম, ভেরোনা, ভেনিস। ১৫৫২ সালে রিচার্ড হাওলে ব্যাখ্যা করলেন : ঠিক আছে প্রথম দিকে পূর্ণ চাঁদের মতোই সুখ কানায় কানায় ভরা, তার পরই এই চাঁদ ক্ষয়ে যেতে থাকে। এ জন্যই মন্দ লোকজন এটাকে বলে হানিমুন। হানিমুনের এটাই পরিণতি।

আরেকটি মধুর বিশ্লেষণ আছে—সে আমলে বিয়েতে মধু থেকে তৈরি পানীয় বর-কনেকে খাওয়ানো হতো। আরো একটি ব্যাবহারিক ব্যাখ্যা আছে : বি কুইন (মক্ষীরানি) সন্তানদের জন্ম দিয়ে চাক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ত এবং বহুসংখ্যক পুরুষ মৌমাছির সঙ্গে মিলিত হয়ে বহুসংখ্যক সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা অর্জন করে মৌচাকে ফিরে আসত। রানির এই ভ্রমণই হানিমুন।

হানিমুন প্রতীকী অর্থে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে : ক দল ও খ দলের হানিমুন শেষ; ব্যাংক লুটেরা ও রাজনীতিবিদদের জম্পেশ হানিমুন। চন্দ্রবিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী স্মরণ করতেই চাঁদ নিয়ে এই লঘু রচনা। চন্দ্রবিজয় তো আর প্রতিদিনের ঘটনা নয়, ওয়ান্স ইন আ ব্লু মুন তা ঘটতে পারে।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা