kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময়ের প্রতিধ্বনি

অচেনা চীন এবং জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা

মোস্তফা কামাল

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অচেনা চীন এবং জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা

কথায় বলে, অচেনা চীন। সত্যিই বুঝি তাই। চীনকে চেনা অত সহজ নয়। একবার-দুবার নয়, বারবার নিজের চোখে দেখার পরও হয়তো চীনকে চেনা বা চীন সম্পর্কে পুরোটা জানা সম্ভব নয়। প্রাচীন সভ্যতার দেশ চীন।

চীনের নথিপত্রে যে তথ্য রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ২০ লাখ বছর আগে চীন ভূখণ্ডে মানবজাতির আবির্ভাব ঘটে। তারপর ধারাবাহিকভাবে সেখানে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটে। চৈনিক সভ্যতাকে পৃথিবীর আদিমতম সভ্যতাগুলোর অন্যতম ধরা হয়।

চীন সম্পর্কে জানার আগ্রহ বহুদিনের। বই-পত্র ঘেঁটে যতটুকু জেনেছি, তাতেই উপলব্ধি করেছি, অবশ্যই প্রাচীন সভ্যতার সূতিকাগার চীনে পা রাখতে হবে। নিজের চোখে দেখতে হবে। বই, পত্রপত্রিকা পড়ে কি আর দেখার সাধ মেটে! কিন্তু নিজের চোখে চীন দেখার সুযোগ হয়নি সেভাবে। সেই সুযোগ এলো এবার। একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে মধ্য আগস্টে চায়না ওয়েস্টার্নের একটি ফ্লাইটে গুয়াংজো (চীন) গেলাম। ঢাকা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা। সেখান থেকে ইমিগ্রেশন পার হয়ে আবার আরেকটি ফ্লাইটে পাঁচ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে উরুমচি পৌঁছলাম। রীতিমতো চমকে ওঠার মতো অবস্থা হলো আমার। আমি কখনো ভাবিনি এতটা উন্নত, ছিমছাম, পরিপাটি শহর উরুমচি। উন্নয়নের ছোঁয়া সর্বত্র চোখে পড়ে।

আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি, এক যুগের বেশি সময় ধরে চীন ‘ডাবল ডিজিট’ উন্নয়ন করছে। মাঝেমধ্যে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির জানানও দিচ্ছে। চীনের হাঁকডাক যে ফাঁকা বুলি নয়, তা সেখানে গিয়েই টের পেলাম।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। এটা অবশ্যই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি। শহরে পা দিয়েই আমার মনে হলো, আমি বুঝি কোনো ভিনগ্রহে চলে এসেছি। কেউ আমার ভাষা বোঝে না। কোনো কিছু জানতে চাইলে সবাই বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাদের কাছে আমিও যেন এক ভিনগ্রহের বাসিন্দা। খাবার খেতে গিয়েও মহাবিপদে পড়লাম। বারবার মনে হলো, আমি অথৈ সাগরে ভাসছি। পানির পিপাসায় কাতর। আমার চারদিকে পানি। কিন্তু খাওয়ার মতো এক ফোঁটা পানিও নেই!

উরুমচি হচ্ছে চীনের শিনচিয়ান প্রদেশের রাজধানী। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে আরো ১৫ দেশের ১৯ সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক ও লেখকের সঙ্গে। ২০ জনের টিম নিয়ে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে চীন সরকার। সত্যিই অভাবনীয় এক উদ্যোগ। উরুমচির এক পাঁচতারা হোটেলে আয়োজিত এই সেমিনারে চীনের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, উন্নয়ন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। শুধু আলোচনাই নয়, আমরা ঘুরে দেখেছি শিনচিয়ানের তিনটি বিখ্যাত শহর। দেখেছি কয়েকটি গ্রামও; কিভাবে সেসব গ্রাম শহরের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। আরো বিস্ময়কর লেগেছে ত্রিশ বছরে মরুভূমিকে সবুজ বনভূমিতে পরিণত করার দৃশ্য দেখে। 

শিনচিয়ানে সেমিনার আয়োজনের বিশেষ কারণ রয়েছে। প্রদেশটি নানা কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রদেশের সঙ্গে রয়েছে আট দেশের দীর্ঘ পাঁচ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের সীমান্ত। চীনের সীমান্তবর্তী দেশগুলো হচ্ছে মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত। ১৬ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বৃহত্তর এই প্রদেশটির জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ। অধিকাংশই মুসলমান। এ ছাড়া খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস এই প্রদেশে। চীনের কাছেও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর প্রদেশটির গুরুত্ব সর্বাধিক। তা ছাড়া চীন যে সিল্ক রোডের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে তার মূল কেন্দ্রস্থল শিনচিয়ান।

অমিত সম্ভাবনার এই প্রদেশটিকে টার্গেট করে জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা। ঘটতে থাকে একের পর এক অঘটন! দুশ্চিন্তায় পড়ে চীন। তাদের এত এত উন্নয়ন! কী হবে তার পরিণতি? শুরু হয় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবেলার কৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনা।

এখনো বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর এক হুমকির নাম সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যে এর থেকে মুক্ত রয়েছে। সব দেশই কমবেশি সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে কিংবা সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আফগানিস্তান ও ইরাককে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। সেখানে এখনো মানুষ আতঙ্ক নিয়ে ঘুমাতে যায়। আবার আতঙ্কের মধ্যেই ঘুম ভাঙে। এখন যে অবস্থা হয়েছে তাতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে এ ক্ষেত্রে চীন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে।

চীনে নব্বইয়ের দশক থেকে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে। চীন সরকারের দেওয়া এক হিসাবে জানা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চীনের শিনচিয়ান প্রদেশসহ অন্যান্য অঞ্চলে প্রায় চার হাজার সন্ত্রাসী হামলা হয়। কোনো কোনো এলাকায় রায়টের ঘটনাও ঘটে। জঙ্গিবাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য অনেককে গলা কেটে, আবার কাউকে কাউকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে বেশির ভাগ ক্ষতির শিকার হয়েছে সে দেশের সাধারণ মানুষ। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে শান্তিপ্রিয় মানুষ। তারা এর থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে।

চীনের পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে অনেক জঙ্গি-সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

জঙ্গিদের এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে জঙ্গিদের নির্মমতার কিছু তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়। সেই কর্মকাণ্ড যে কতটা নির্মম ছিল, তা না দেখলে কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। 

চীন সরকার জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলার মূল কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। তারা দেখেছে যে জঙ্গিগোষ্ঠী হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জঙ্গিবাদে প্রভাবিত করে। এভাবে অসংখ্য পরিবারের মধ্যে তারা ঢুকে পড়ে। হঠাৎ করেই মেয়েরা কালো বোরকার আবরণে নিজেদের ঢেকে ফেলে। ছেলেদের আচরণ ও চলাফেরায়ও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। একপর্যায়ে তাদের কেউ কেউ পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

চীনের পুলিশ বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা এই ছেলে-মেয়েদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে। তাদের সঙ্গে কথা বলে। জঙ্গিবাদ যে ভালো কোনো পথ নয়, তা তাদের বোঝায়। মসজিদগুলো থেকে ইমামদের মাধ্যমেও সচেতন করা হয় সাধারণ মানুষকে। ফলে জঙ্গিসংশ্লিষ্ট ছেলে-মেয়েরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু তাদের ওই অন্ধকার পথ থেকে ফেরার উপায় কী?

পরিবারের অভাব-অনটন ও বেকারত্ব তাদের পেছন থেকে টেনে ধরছে। অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরতে চাই অর্থ, চাই বেকারত্ব ঘোচানোর জন্য চাকরি। চীন সরকার বাড়াল সহযোগিতার হাত। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, জঙ্গিবাদের পথ ছাড়লে তাদের ‘ভোকেশনাল ট্রেনিং’ দেওয়া হবে। দুই বছরমেয়াদি কোর্স। পাস করলেই চাকরি। আর ওই প্রশিক্ষণ চলাকালীন (দুই বছর) ওই ছেলে বা মেয়ের পরিবারের ভরণপোষণের সব ব্যয় বহন করবে সরকার।

ঠিক এভাবেই শুরু হয় আলোয় ফেরা। আমরা শিনচিয়ান প্রদেশের আকসু ও কাশগর শহরে প্রতিষ্ঠিত সেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো নিজের চোখেই দেখলাম। অত্যাধুনিক সেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে তাদের চাকরি পাওয়া সহজ হয়।

প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগের কারণে তাঁদের জীবন বদলে গেছে। তাঁরা নতুন জীবন পেয়েছেন। বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী বলেছেন, কালো কাপড়ের ভেতরে তাঁদের জীবন বন্দি ছিল। এখন তাঁরা মুক্তজীবন কাটাচ্ছেন। বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন।

বাংলাদেশও জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকবলিত একটি দেশ। সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে জঙ্গি তৎপরতা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এখনো মুক্ত নয়। আড়ালে-আবডালে অনেকেই জঙ্গিবাদের দীক্ষা গ্রহণ করছে। জঙ্গিরা অনেকের মগজ ধোলাই করে ফেলেছে। কেউ কেউ হচ্ছে আত্মঘাতী। অনেকে গোপনে অনেক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত রেখেছে।

এ ক্ষেত্রে সরকার চীনের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারে। চীন যে প্রক্রিয়ায় জঙ্গি দমন করতে সক্ষম হয়েছে, সে প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে পারে। চীন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে জঙ্গিবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তারা যাতে ঘাঁটি গাড়তে না পারে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এতে চীন সফল হয়েছে।

আমাদের দেশে দেখি, সমস্যার গভীরে আমরা যাই না। মাথায় সমস্যা হয়েছে, কাজেই মাথা কেটে ফেলতে হবে! মানুষকে সচেতন করেও যে কাজটা করা যায় তা নিয়ে আমরা চিন্তা করি না। গবেষণা করি না। জঙ্গিবাদ দমনের পথটি যে শর্টকাট নয়, তা বুঝতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। জঙ্গিদের আলোতে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।

আমাদের মসজিদ ও মাদরাসাগুলোও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জঙ্গিদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে জঙ্গিদের অন্ধকার পথ থেকে আলোতে ফেরার পথ দেখাতে পারে।

 

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

 

* আগামীকাল পড়ুন : চীনের সিল্ক রোড মহাপরিকল্পনা, জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা