kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অনিশ্চিত গন্তব্যে বরিস জনসন ও ব্রিটিশ রাজনীতি

গাজীউল হাসান খান

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অনিশ্চিত গন্তব্যে বরিস জনসন ও ব্রিটিশ রাজনীতি

চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে (ব্রেক্সিট) কেন্দ্র করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের রক্ষণশীল দলীয় সরকার এবং সম্মিলিত বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারের বিরুদ্ধে ৪ সেপ্টেম্বর লেবার পার্টির বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিনের একটি অনাস্থা প্রস্তার আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরিস সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত কমন্সসভার বর্তমান অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছেন। ব্রিটেনের সংসদীয় ঐতিহ্যের দিক থেকে এ পদক্ষেপ অসাংবিধানিক না হলেও বিরোধীদলীয় সদস্যরা এটিকে গণতন্ত্রের ওপর এক বিরাট আঘাত বলে বরিসের সরকারের প্রতি তীব্র আক্রমণ শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে আয়ারল্যান্ডের অর্থ প্রতিমন্ত্রী মাইকেল ডি আর্সি প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে সপ্তদশ শতকের ইংরেজ সেনানায়ক ও সংসদ সদস্য অলিভার ক্রমওয়েলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ ক্রমওয়েল বিভিন্ন রাজনৈতিক অসংগতি, দুর্নীতি এবং বিশেষ করে ধর্মীয় স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে ব্রিটিশ সংসদ স্থগিত করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ১৬৫৩ সালে ক্রমওয়েল শেষ পর্যন্ত সংসদ বিলুপ্ত করে সাময়িকভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক (প্রটেকটরেট) ব্রিটিশ সরকারও গঠন করেছিলেন।

কমন্সসভার বর্তমান অধিবেশন স্থগিতকরণের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিক অধিকার নেত্রী জিনা মিলার। শুধু তা-ই নয়, মিলারের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন রক্ষণশীলদলীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী লর্ড জন মেজর ও আরো অনেকে। তা ছাড়া এডিনবরার উচ্চ আদালতেও প্রধানমন্ত্রী বরিসের সংসদ স্থগিতকরণকে চ্যালেঞ্জ করে স্কটল্যান্ডের ৭০ জন আইনপ্রণেতা আবেদন করেছেন। লন্ডনে জিনা মিলারের আবেদন উচ্চ আদালতে গৃহীত হয়েছে এবং তা বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করেছে স্কটল্যান্ডে রক্ষণশীল দলের নেত্রী রুথ ডেভিডসনের পদত্যাগ। তিনিও স্কটল্যান্ড এবং বৃহত্তরভাবে ব্রিটেনের বিভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে কমন্সসভার অধিবেশন স্থগিতকরণের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থায় যোগ দিয়েছেন। বরিস জনসন ঘোষিত ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজন হলে কোনো চুক্তি ছাড়াই ইইউ ত্যাগ করার ঘোর বিরোধী রুথ ডেভিডসন। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, সংসদ স্থগিতকরণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কমন্সসভায় মত প্রকাশ করেছেন বর্তমান স্পিকার জন বারকাউ। তিনি বলেছেন, সংসদ বা কমন্সসভার অধিবেশন স্থগিতকরণ কিংবা তা বাধাগ্রস্ত করা সংসদ সদস্যদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর হস্তক্ষেপ করার শামিল। রক্ষণশীলদলীয় সংসদ নেতা জেকবরিজ মগ এর বিরোধিতা করে বলেছেন, সংসদ স্থগিতকরণ সংসদীয় ঐতিহ্য কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী নয়। এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ নেই। তা ছাড়া এসব ব্যাপারে সংসদের স্পিকারের রাজনৈতিক মন্তব্য করার তেমন কোনো অধিকার নেই।

কমন্সসভার অধিবেশন স্থগিতকরণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুটা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। বর্তমান সংসদে তাঁর মাত্র একটি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাও বর্তমান অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা এলে তাঁর নিজ রক্ষণশীলদলীয় ৯ জন বিদ্রোহী সদস্য তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন সে আশঙ্কা রয়েছে। সে সম্ভাব্য অনাস্থা প্রস্তাবের বিষয়টি ঠেকানোর জন্যই কমন্সসভা স্থগিতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। বরিস জনসনের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিপরিষদ বিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল গোভ, চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার (অর্থমন্ত্রী) সাজিদ জাভিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোমেনিক রবসহ আরো অনেক ঘোড়েল রাজনীতিক রয়েছেন, যাঁরা লেবার পার্টির বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জো সুইনসন, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) নিকোলা স্টারজেন ও গ্রিন পার্টির নেতা-নেত্রীদের ঠেকাতে যথেষ্ট পারঙ্গম। তবে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রিটিশ অর্থনীতি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অন্য অনেক বিষয় রয়েছে, যার দিকে লক্ষ রেখে ইইউ ত্যাগ করার আগে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট চুক্তি হওয়া আবশ্যক বলে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলেরও অনেকে একমত। সে কারণে চুক্তি হোক আর না-ই হোক ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ ত্যাগ করার ঘোষণা অনেককে শঙ্কিত করে, দ্বিধাগ্রস্ত করে। এ ক্ষেত্রে বাকি অন্য সব কিছু সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ‘ব্যাকস্টপের’ প্রশ্নে অর্থাৎ বৃহত্তরভাবে স্বাধীন আইরিশ প্রজাতন্ত্র ও ব্রিটেনের অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের সীমানা নিয়ে বিরাজিত সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠা কোনো মতেই সম্ভব হচ্ছে না। দুই রাষ্ট্র হলেও বর্তমানে আইরিশ প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আয়ারল্যান্ডের এ দুই অংশের মধ্যে ‘গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট’ বলে একটি চুক্তি বলবৎ রয়েছে। ব্রেক্সিট কার্যকর হলে দুই আয়ারল্যান্ডের মধ্যেও সীমান্ত ব্যবস্থা কার্যকর হতে হবে। সেটি ব্রাসেলসের শর্ত। কিন্তু কিভাবে সব শর্ত বজায় রাখা যাবে, সে বিতর্কে ক্ষমতা ছেড়েছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। এখন বরিস জনসনের সরকার বলছে, তারা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কাস্টম ও অন্যান্য সীমান্ত সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ চালু রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা বের করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মে যা পারেননি, বরিস সরকার তা কিভাবে করবে?

উল্লিখিত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে বসে নেই বরিস জনসন ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ। সম্প্রতি প্যারিসে অনুষ্ঠিত জি-৭ মিটিং উপলক্ষে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি চ্যান্সেলর মার্কেলকে বলেছেন, ‘আগামী ৩০ দিনের মধ্যে’ তিনি সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি উপায় উদ্ভাবন করবেন। বিকল্প ব্যবস্থাসংবলিত একটি চুক্তি হাজির করবেন। তবে তা ইইউ নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা কেউ বলতে পারছে না। এ অবস্থায় বরিস তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব ও সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে কোনো অনাস্থা প্রস্তাব চান না। সম্ভবত সে কারণেই সংসদ স্থগিতকরণ আর তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে উচ্চ আদালতে বিরোধী দলসহ নাগরিক অধিকার সংরক্ষণকারীদের আইনি আবেদন। সংসদ স্থগিতকরণের বিষয়টি মেনে নেওয়া সম্মিলিত বিরোধী দলের কাছে একটি রাজনৈতিক পরাজয়। কারণ তারা এখনো বরিসের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারেনি। আগামী মঙ্গলবার অর্থাৎ স্থগিতকরণ কার্যকর হওয়ার আগে ওয়েস্টমিনস্টারে একত্র হবেন কমন্সসভার সদস্যরা। সেখানে তাঁরা কী ব্যবস্থা নেন, সেটি দেখার জন্য সবাই এখন উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। তা ছাড়া বিরোধী দলের নেতা জেরেমি করবিন লন্ডন অচল করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। লেবার দলের নেতা এখন যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। কারণ লিব-ডেম নেত্রী জো সুইনসন, এমনকি তাঁর দলের অনেকে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা তত্ত্বাবধায়ক জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান না। তাঁরা চান রক্ষণশীল দলের বর্ষীয়ান নেতা (সংসদ পিতা) ক্যানেথ ক্লার্ক কিংবা শ্রমিক দলের সাবেক উপনেত্রী হ্যারিয়েট হারম্যানকে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বক্তব্য হচ্ছে—ইইউ ত্যাগ করার আগে অর্থাৎ ৩১ অক্টোবরের আগে ইইউর সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছার জন্য তিনি নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে বিষয়টি কোনোভাবেই সহজ নয়। এ অবস্থায় বিরোধী দলের বিভিন্ন আইনের আশ্রয় নেওয়া কিংবা লন্ডন অচল করে দেওয়ার ঘোষণা কোনোমতেই সংগতিপূর্ণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

এত দিন বিনা উপদ্রবে ৩১ অক্টোবরে পৌঁছাতে চেষ্টা করছিল বরিস সরকার। কিন্তু তা কঠিন বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় স্থগিত করা হয়েছে পার্লামেন্ট। কিন্তু তাতেও স্বস্তি মিলবে না আইনি লড়াইয়ের কারণে। তবে পূর্বনির্ধারিত ৪ অক্টোবরের মধ্যে সরকার ফেলে দিতে পারলে অন্তত ১৪ দিনের মাথায় ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আরেকটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান সরকার বা বিরোধী দলের পক্ষে কতটুকু সম্ভব হবে, তা বলা অত্যন্ত কঠিন। কারণ সংসদ স্থগিতকরণের কারণে হাতে বেশি সময় না-ও পেতে পারে সম্মিলিত বিরোধী দল। এ ব্যাপারে সংসদ স্থগিতকরণের প্রেক্ষাপটে এখন নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করছে সরকার। বরিস সরকারের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে পূর্বঘোষিত ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ ত্যাগ। তাতে ইংল্যান্ডসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রেক্সিটপন্থীরা তুষ্ট হবে।

যুক্তরাজ্য বর্তমানে এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করেছে বলে মনে হয়। এ অবস্থায় সব কিছু সামাল দিয়ে যুক্তরাজ্যের এ অখণ্ডতা ধরে রাখাও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ বলে অনেকে মনে করে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বরিস জনসনের উত্থান শুধু ক্ষমতা লাভ কিংবা ইইউয়ের আধিপত্যমুক্ত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয় না। আগামী দিনগুলোই নির্ধারণ করবে যুক্তরাজ্য ইতিহাসের কোন ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক ও মানুষকে এত ধারায় বিভক্ত হতে আগে কেউ দেখেনি। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন আর দশটি সাধারণ দেশের মতো নয়। একসময় সমগ্র বিশ্ব শাসন করেছে তারা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নিত্যনতুন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে ব্রিটেন। সুতরাং সেই দেশটির অবশিষ্টাংশ যতটুকুই রয়েছে, তা অক্ষত থাকুক। সেটিই এখন সবার কাম্য।

লন্ডন, ৩১ আগস্ট

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা