kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আফগানিস্তানে ভয়ংকরের পদধ্বনি

বাহারউদ্দিন

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আফগানিস্তানে ভয়ংকরের পদধ্বনি

আফগানিস্তানে তালেবানি হামলার বিরতি নেই। বহু প্রদেশ তাদের দখলে। কাবুলও হামলার শিকার। আমেরিকা সেনা প্রত্যাহার আর শান্তি আলোচনা নিয়ে যত সরব হচ্ছে, ততই শক্তি প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে উঠছে সশস্ত্র ও সন্ত্রাসবাদী তালেবান।

গত বুধবার পশ্চিমাঞ্চলের হেরাত প্রদেশে আচমকা হামলা চালিয়ে গেরিলারা সরকারপন্থী ১৪ মিলিশিয়াকে হত্যা করেছে। খবর জানিয়েছেন সরকারি মুখপাত্র আবদুল আহাদ ওয়ালিজাদা।

 হেরাত বরাবর তালেবানদের ঘাঁটি। ওসামা বিন লাদেন যখন মোল্লা ওমর শাসিত আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন, তখনই হেরাত ও কান্দাহারে আল-কায়েদা আর তালেবানদের যৌথ শক্তির বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে আল-কায়েদা গরহাজির। তাদের শূন্যতা পূরণ করছে পশ্চিম এশিয়া থেকে বিতাড়িত ইসলামী স্টেটের যোদ্ধারা।

আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফৌজ প্রত্যাহার প্রায় আসন্ন। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তালেবানদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা প্রায় সমাপ্তির পথে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই আমেরিকা স্তরে স্তরে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে। মার্কিন সেনা সরানোর পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে বলা কঠিন। নির্বাচিত সরকারকে ইতিহাসের লাশ বানিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারে তালেবানরা। সোভিয়েত সেনা কাবুল থেকে সরে যাওয়ার পর একই ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ক্ষমতায় বসলেন মোল্লা ওমর। মার্কিনবিরোধী যুদ্ধ ও প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়ল আল-কায়েদাও। ভয়ংকর আঘাত এলো সভ্যতায়। বুদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। আরোপিত কণ্ঠ রোধের বাড়াবাড়িতে দেশ ছাড়লেন মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা। স্কুল-কলেজে নামল বোরকার মিছিল। বাধ্য হয়ে মোল্লা ওমর ও আল-কায়েদার যৌথ শক্তিকে শায়েস্তা করতে ওয়াশিংটন বোমাবর্ষণ আরম্ভ করল গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে। শান্তি রক্ষার্থে বহুজাতিক সেনার দখলে চলে গেল গোটা দেশ। ভোটের নামে প্রহসন থেকে রেহাই পেল না আফগান মুলুক। ক্ষমতায় বসল আধুনিকতাপন্থী অভিজাত শ্রেণির সরকার। মন্দের ভালো। স্কুল-কলেজে, স্বাস্থ্য পরিষেবায়, ক্রীড়াঙ্গনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ল। রচিত হলো একধরনের শান্তি-কল্যাণের অভিমুখ। এবার ওয়াশিংটনের সেনা প্রত্যাহারের পর আবার মধ্যযুগীয় বর্বরতা, আদিম নৃশংসতা উথলে উঠতে পারে। এটা শুধু আশঙ্কা নয়, অদূর ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্ন আর সবর্নাশের অপরিহার্য বাস্তব।

তালেবানরা যথাসম্ভব দ্রুত মার্কিন সেনার অপসারণ দাবি করছে। বিভিন্ন উপজাতি আর গোষ্ঠীতে বিভাজিত শক্তি তাদের মতবিরোধ আপাত স্তিমিত রেখে গড়ে তুলেছে ঐক্য। ঐক্যের লক্ষ্য, বিদেশি ফৌজের প্রভাব থেকে বিমুক্ত, স্বাধীন সরকার আর নির্বাচিত সরকারের অবসান। এ কারণেই তালেবানরা পর পর আঘাত হেনে চাপ বাড়াচ্ছে। আমেরিকাও পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার মতো শক্তি ক্ষয়, সেনা ক্ষয়, অর্থ ক্ষয় থেকে অব্যাহতি চাইছে।

ভয় হচ্ছে, ট্রাম্পের এই সুপরিকল্পিত, পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত বড় বিপদ ডেকে আনবে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলবে। পাকিস্তান চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয়। এখনকার আফগান প্রশাসন ইসলামাবাদের প্রভাবের বাইরে হলেও বহু স্তরের পাক সংস্থা কাবুলে ভারতের অবস্থান রুখতে চায়। আফগান সরকারের পাশে রয়েছে দিল্লি। কোনো কোনো এলাকায় বিনিয়োগও করেছে। ওয়াশিংটন এ কারণেই তার সেনা প্রত্যাহারের পরবর্তী অধ্যায়ে পাকিস্তান ও ভারতের ওপর শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব অর্পণ করতে আগ্রহী। মার্কিন সেনা সরে যাওয়ার পর তারা অবধারিত শান্তি আলোচনার বৈঠকে পরস্পরবিরোধী দুই দেশকেই শরিক করার চেষ্টা করবে। একসময় চীনকেও যুক্ত করতে চেয়েছিল। বেইজিং আগ্রহ দেখায়নি। চুপ করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। মার্কিন উপস্থিতির শূন্যতাকে চীন ভরাট করার কসরত দেখাবে না, এর গ্যারান্টি কোথায়? কৌশলপ্রিয় শক্তিধর দেশ। চীনকে বাদ দিয়ে মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার বিপর্যস্ত ও সন্ত্রাসকবলিত আফগান মুলুকে শান্তি স্থাপন অসম্ভব। শান্তির স্থিতি ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের অংশগ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনি চীনের সায় আর কূটনৈতিক সংযুক্তি দরকার। দরকার উপসাগরীয় ইরানের সাগ্রহ ও সম্মতি। তা না হলে আবার মধ্যযুগের অন্ধকারে, তাণ্ডবের বিভীষিকায় কাবুলের প্রত্যাবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠবে। আবার চেপে বসবে সভ্যতাবিনাশী, ধ্বংসকামী উগ্রতা।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক

সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা