kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শরৎ বলি হয়েছে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনে

জয়া ফারহানা

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শরৎ বলি হয়েছে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনে

বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে বিশেষ কোনো কীটকে অপকারী মনে হলেও সৃষ্টিজগতে কোনো কিছুই অদরকারি নয়। শুধু প্রাণচক্রটি ঠিক রাখা গেলে সৃষ্টিজগতের হারমোনি অটুট থাকত। কিন্তু মানুষের মহাবুদ্ধিমত্তায় জীব অণুজীব কীটপতঙ্গ তো বটেই, কত প্রাণী যে বিলুপ্তির পথে আজ। ধ্বংসের মুখে ইকো সিস্টেম। 

আমেরিকান একটি প্রবাদের কয়েকটি টুকরো এমন—যখন শেষ  গাছটি কেটে ফেলা হবে, শেষ মাছটিও নিঃশেষ হবে এবং শেষ জলধারাটি বিষাক্ত হয়ে যাবে, তখন মানুষ বুঝতে পারবে টাকা খাওয়া যায় না। বিশ্ব কী এ প্রবাদটির কাছাকাছি সংকটে পৌঁছে গেছে? কার কাছে করব এ প্রশ্ন? তথ্য-প্রযুক্তি জগতের পরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠান গুগলের কাছে কি এর জবাব আছে? সৃষ্টিকর্তা কোনো প্রাণীকেই অকারণে সৃষ্টি করেননি। মানুষের ধারণায় যে কীট সবচেয়ে প্রাণঘাতী সেও সৃষ্টি হয়েছে অন্য কোনো না কোনো প্রাণীর উপকারের জন্য। বিজ্ঞানীরা তো বলেই দিয়েছেন, সৃষ্টির এই মহাপ্রাণচক্রে সবার শেষে এসেছে মানুষ, যাবে সবার আগে। কেননা মানুষই প্রাণ শৃঙ্খলার চক্র ভেঙে পৃথিবীকে বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলেছে। পৃথিবীতে প্রতিবছর ২০ কোটি টনের বেশি কার্বন মনো-অক্সাইড, পাঁচ টন হাইড্রো কার্বন এবং ১৫ কোটি টন সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি হচ্ছে। প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে বিপুল প্রাণবৈচিত্র্য। খেসারতও কম দিতে হচ্ছে না এর জন্য। সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাহাড়ের চূড়া, দূষণ থেকে মুক্ত নয় ইঞ্চি পরিমাণ জল কিংবা ভূখণ্ড। বিচিত্র সব প্রাণের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কতটা নির্মম হতে পারে ডেঙ্গু তার প্রমাণ। কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, প্রকৃতির শৃঙ্খলা ঠিক থাকলে ডেঙ্গু এতটা ভয়াবহ রূপ ধরে আসত না। কেননা প্রকৃতির মধ্যেই ছিল এডিস নিধনের অন্য প্রাণী। সেসব বিলুপ্ত হওয়ায় এডিসের প্রধান শিকার এখন মানুষ। পরিস্থিতি কতটা মর্মান্তিক হতে পারে তা বুঝতে পারছেন ডেঙ্গুতে যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন তাঁরা। আমরা যারা ডেঙ্গুর অগ্নিপরীক্ষাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি তারাও বুঝতে পারছি কিছুটা। মনে পড়ে বিদ্যাপতির লেখা সেই চরণ দুটি? ‘মত্ত দাদুরী, ডাকে ডাহুকি, ফাটি যাওত ছাতিয়া’। বিদ্যাপতির এই চরণকে উদ্ধৃত করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ব্যাঙের এই ডাক নববর্ষার মত্ত ভাবের সঙ্গে নহে, ঘন বর্ষার নিবিড় ভাবের সঙ্গে। হায়! কত ঘন বর্ষা এলো গেল কিন্তু দাদুরীর সঙ্গে ঘন বর্ষার সম্পর্ক এখন আর আমরা খুঁজে পাই না। বর্ষা যত অবিশ্রান্তই হোক কোথায় সেই দাদুরীর (ব্যাঙ) ডাক? বর্ষা আসে, বর্ষা যায়। ব্যাঙের ডাক শুনি না। আজ যে এডিসকে মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে গোটা দেশ; প্রাণ শৃঙ্খলা নষ্ট না করলে এই এক ব্যাঙই এডিস নিধনের জন্য যথেষ্ট ছিল। প্রকৃতিতে যখন ব্যাঙের প্রাচুর্য ছিল, তখন তো বর্ষায় ডেঙ্গুর নামও শোনা যায়নি। শুধু ব্যাঙ নয়, বাদুড়, চামচিকাও মশাভুক প্রাণী। ‘ভাঙা মন্দিরের দিকে মন্থর ডানা তুলে বাদুড়ের দল উড়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার আবছায়া অন্ধকারে’—এমন দৃশ্যের বর্ণনা এখন আমরা শুধু বইয়ের পাতায়ই পড়ি। বাস্তবে কোথাও বাদুড় দেখি না। প্রকৃতি থেকে বিচিত্র প্রাণীদের হারিয়ে যাওয়ার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে চড়া মাসুল দিয়েই। ডেঙ্গু ছিল ওয়েক আপ কল। তা থেকে কিছু শিক্ষা নিলাম কি না বোঝা যাবে আগামীতে। কে জানে হয়তো ডেঙ্গু মৌসুম শেষ হলে দেখা যাবে আমরা আবার ফিরে গেছি সম্মিলিত শিথিলতায়।      

দুই.

সব পৃথিবীর মানুষের জীবনচক্র একই প্রকৃতির অধীন। যে কারণে চীন কয়লাভিত্তিক রপ্তানি বন্ধ না করলে কিংবা ব্রাজিলের ‘বোল সোনারো’ প্রকল্পের কাজ বন্ধ না করলে যে বিপুল পরিমাণ রেইন ফরেস্ট নষ্ট হয়, যত কার্বন নিঃসরণ হয় তার খেসারত দিতে হয় প্রত্যেক দেশকে। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে বরফ গললে প্রত্যন্ত বাংলাদেশের বিশাল অংশের ভূখণ্ডের তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এক দেশের ভোগী জীবনের দায় মেটাতে হয় অন্য দেশকে খেসারত দিয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বজ্রপাত ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক তালগাছ লাগানো হয়েছে বটে, তবে এই তালগাছগুলোর একেকটির বজ্রপাত ঠেকানোর সক্ষমতা অর্জন করতে কমপক্ষে ২০ বছর প্রয়োজন। এর মাঝের সময়টুকু কিভাবে পার হবে? বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। বর্ষায় তাই বজ্রপাতের শব্দ আর বিজলির চমক বলে মনে হয় না, মনে হয় মহাপ্রলয়। টরন্টো থেকে নরডিক, রিও থেকে কিয়েটো কিংবা প্যারিস চুক্তি প্রত্যেক মানুষের জন্য সমান জরুরি হয়ে উঠেছে। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের খেসারত দিচ্ছে না কে? শুধু যে ভোগী দেশের দায় মেটাচ্ছি, এমন নয়। সব দোষ ধনী দেশের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পাওয়াও যাবে না। নিজের দেশের ধনীদের দায় কম নয় মোটেই। আইনের নানা ফাঁকফোকর খুুঁজে বের করে এই দেশের ধনীরাই কি ফসলি জমিতে ইটভাটা তৈরি করেনি? ইটভাটার ধোঁয়ায় ধানগাছের সবুজ চারাগুলো বিবর্ণ হলুদ হয়ে যায়। ধনী কোনো দেশের কারণে নয়। দুই বছরের কোনো শিশু ট্যাব চালাতে পারলে তার অভিভাবকরা শিশুর এ প্রতিভা নিয়ে গরিমা প্রকাশ করেন। অথচ ট্যাব, সেলফোন বা প্রচুরসংখ্যক ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ঘেরা পরিবেশ যে শিশুশরীরের জন্য কত ক্ষতিকর তা কি ভাবনার মধ্যে আনা দরকার নয়? খেলার মাঠ এবং সঙ্গীবিহীন একাকী বেড়ে ওঠা পরিবেশ শিশুমন বিকাশে কতখানি সহায়ক তাও ভাবা দরকার। অভিভাবকরা দয়া করে শিশুর হাতে ঠাকুমার ঝুলি, জাহানারা ইমাম অনূদিত লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের ‘নদীর তীরে ফুলের মেলা’ তুলে দিন। ছাপার অক্ষরের বই এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কবিহীন একজন মানুষ কী করে কল্পনাশক্তি অর্জন করবে? কল্পনা করার ক্ষমতাবিহীন একজন মানুষের সঙ্গে দামি একটি কম্পিউটারের জটিল অ্যালগরিদমের মৌলিক পার্থক্য কোথায়?

তিন.

যথার্থ পুষ্টিকে ধরা হয়েছে মানব উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে। ধরে নিচ্ছি, উন্নয়নের উচ্চতার সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। করপোরেট বিজ্ঞান এবং হাইব্রিড বীজের মাধ্যমে দেশে প্রায় সব রকম খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে সন্দেহ নেই। মাছ ও সবজিতে চতুর্থ, আলুতে তৃতীয় এবং ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু মানুষ তো শুধু খাওয়ার জন্য বাঁচে না। যিশু বলেছেন, মানুষ শুধু রুটির দ্বারা জীবন ধারণ করে না। কারণ মানুষ শুধু শারীরিয় জীবন নয়। মানুষকে রুটির চেয়ে উচ্চতর খাদ্যের জোগান দিতে হয়। কী সেই উচ্চতর খাদ্য? মনের পুষ্টিই এই উচ্চতর খাদ্য। কিভাবে আমরা অর্জন করতে পারি মনের এই পুষ্টি? ঠিক যে উত্তরাঞ্চল এখন মঙ্গার ভয়াবহতায় ক্ষতবিক্ষত নয়। কার্তিক এখন আর মরা কার্তিক নয় বলে যারা তৃপ্ত তারা কি ভেবেছেন পেটের মঙ্গাটাই সব নয়? হেমন্তে শস্যের মঙ্গা কাটলেও কোথাও দেখা যায় না হেমন্তে ফোটা অপরাজিতা, ছাতিম, মল্লিকা, হিমঝুড়ি, দেবকাঞ্চন বা রাজ অশোক। পেটের মতো মনেরও মঙ্গা আছে। শরৎ ও হেমন্ত ঋতু দুটি আমাদের চোখ থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যাওয়ায় আমরা এখন মনের মঙ্গায় ভুগছি। বাংলা সাহিত্যের তিন বিখ্যাত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথের লেখায় শরতের স্বচ্ছ উজ্জ্বল আকাশ, জ্যোস্নালোকিত চন্দ্রালোক, বেতবনের রূপ, বৃষ্টিধোয়া পথঘাট, মেঘ ও রোদের রহস্যময় খেলার যেসব বর্ণনা পাই, চারপাশে কোথাও সে শরেক দেখি না। ভাবতে পারেন আশ্বিনের আগে শরৎ স্বরূপে ফেরে না। কিন্তু শত বছর আগে ভাদ্রেও শরতের পরিপূর্ণ রূপ যে দেখা গেছে তার বিস্তর বর্ণনা ছড়িয়ে আছে বইয়ের পাতায় পাতায়। শরৎ মধ্যাহ্নের রৌদ্রভরা নির্জন দুপুরে গৃহবিবাদী পথিক দূর হতে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঝিরঝিরে হাওয়ায় লতাপাতার তিক্ত মধুর গন্ধ ভেসে আসছে, বন-ঝোপ থেকে ভেসে আসছে ছাতিম ফুলের গন্ধ কিংবা ‘হঠাৎ করেই বর্ষা শেষে শরৎ চলে এলো’—এমন কথা তো কতই পড়েছি। এখন কি আমরা বলতে পারি বর্ষা শেষে হঠাৎ করেই শরৎ চলে এলো? হেমন্ত আসার আগে শরতের আমেজ অনুভব করতে পারি না। হয়তো শরৎ ঋতুটির কোনো অনুভবই আর থাকবে না ভবিষ্যতে। শরৎ বিলীন হয়ে মিশে যাবে হেমন্তে। ‘নিশীথে’ গল্পে যে লেখা আছে পাখিদের ডানা ঝাড়ার শব্দ শুনতে পেতেন দক্ষিণাচরণ। কই, আমরা তো কোনো পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ শুনতে পাই না! ১৬০ ডেসিবল শব্দদূষণের এই শহরে বায়োনিক কান ছাড়া পাখিদের ডানা ঝাড়ার শব্দ শোনা যেমন দুরূহ, শরৎ অনুভব করতে পারাও তেমনই। 

লেখক : কথাশিল্পী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা