kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দিল্লির চিঠি

আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করে মোদি মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছেন

জয়ন্ত ঘোষাল

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করে মোদি মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছেন

পৃথিবীর ইতিহাসে ভারতবর্ষ এক উদার বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক দেশ বলেই পরিচিত। সেই বিশাল ভারতে অহোম রাজার দেশের ছিল খুব সুনাম। এক অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল সে দেশে। আর আজ সেই আসাম নামক খণ্ড রাজ্যে চলছে এক তুলকালাম কাণ্ড। সে রাজ্যে ১৯৫১ সালের পর যারা থাকতে শুরু করেছে, রাষ্ট্র সেই লাখ লাখ লোককে চিহ্নিত করে নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর আগে এই অসমে বিদেশি বিতাড়নের নামে বাঙালি খেদাও হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের আর এক রূপ দেখেছি আমরা। আর আজ এই নাগরিকপঞ্জি হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে! আপনি বাংলাদেশি? আপনি আমাদের দেশে কেন?

ঠিক এই ঘটনা দেখে মনে পড়ল আর একটি ঘটনা!

লন্ডন শহর থেকে কিছু দূরে এক নির্জন পার্কের বেঞ্চে এক বৃদ্ধ বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। হঠাৎ সেখানে এক প্রৌঢ় ব্রিটিশ ব্যক্তি এসে সেই বৃদ্ধের দিকে আঙুল তুলে ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, আপনি কে? কোন দেশ থেকে এসেছেন? আমার দেশে আপনি কেন?

জবাবে সে বৃদ্ধটি মুচকি হেসে বললেন, আমরা আসলে ক্রেডিটরস। ধার দিই। ভদ্রলোক ভারতে জন্মান। সারা জীবন ঔপনিবেশিক কেনিয়ায় চাকরি করেন, তারপর লন্ডনে অবসর নেন। বৃদ্ধটি বললেন, তোমরা আমাদের সব সম্পদ একদিন লুট করেছিলে, এমনকি আমাদের হীরে-জহরতও। এখন এসেছি সেগুলো ফেরত নিতে। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার অধ্যাপক সুকেতু মেহেতার দাদামশাই ছিলেন ওই প্রবীণ ভারতীয়। সুকেতু এই গপ্পগুলো শুনিয়ে বলছেন, তিনি গুজরাটি। তাঁর ঠাকুরদা কলকাতায় চলে আসেন। সুকেতুর জন্ম কলকাতায়। তারপর ৪০ বছর ধরে তিনি আমেরিকায়। সুকেতু সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত ‘দ্য ল্যান্ড ইস আওয়ার ল্যান্ডুঅ্যান ইমিগ্রান্টস ম্যানিফেস্টো’ গ্রন্থে লিখেছেন, ধনী দেশগুলো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোর সম্পর্কে বলেন, ওরা আমাদের দেশে লোক ঢোকাচ্ছে আর্থিক কারণে। কিন্তু প্রথমে ধনী দেশগুলো উপনিবেশ তৈরি করে শোষণ চালিয়েছে, আমাদের শিল্পের বিকাশে বাধা দিয়েছে, নিজেদের শ্রীবৃদ্ধিতেই তাদের মন ছিল। এরপর এখন তারাই বলছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এ দেশ শুধু আমাদের নাগরিকের জন্য।

আসামে নাগরিকপঞ্জিও (এনআরসি) প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে আবারও বাদ পড়ল ১৯ লাখ নাম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই ৩১ আগস্টের মধ্যে এই তালিকা প্রকাশ করতে ভারত সরকার বাধ্য হয়েছে। ঘটনাচক্রে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ নিজেই অহমিয়া। এই ঘোষণার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র। আসামে রাজ্য সরকার বিজেপি। বিজেপির বক্তব্য, ১৯৫১ সালের পর থেকে আসামে যারা অবৈধভাবে বসবাস করেছে, তাদের চিহ্নিত করে তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানো হবে। তবে উদ্বাস্তু হিন্দু শরণার্থীরা থাকবে, আর মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান এই ভেদ-নীতিকে ভারতের বিরোধী নেতারা বলেছেন সাম্প্রদায়িকতা। ভোটের রাজনীতির ফলে আসামে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের আরো অবনতি হবে, আর সেই মেরুকরণের রাজনৈতিক ফায়দা নেবে বিজেপি। বিজেপির বক্তব্য ভিন্ন। বিজেপির বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ও হিন্দুরা সংখ্যালঘু। তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ব্যক্তির কোনো নিরাপত্তার অভাববোধ নেই, তারা জীবিকার সন্ধানে ভারতে আসছে। কিন্তু হিন্দুরা বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার অভাবে এসেছে। যেভাবে শ্রীনগর থেকে একদা জম্মুতে হিন্দু পণ্ডিতরা চলে আসতে বাধ্য হন।

আমি জানি, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে হাসিনা সরকার খুবই ক্ষুব্ধ। হাসিনা সরকার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছেও সেই বার্তা জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের আরো অভিযোগ যে ভারত সরকার ঢাকাকে এ ব্যাপারে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি জানায়নি। একে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে ঢাকা চাপের মধ্যে, সেখানে আসামে বাংলাদেশি চিহ্নিত করাটা বাংলাদেশের কাছে আদৌ কাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। এই অ-নাগরিক বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের কোথায় রাখা হবে? আসামে, না অন্যত্র? ডিটেনশন শিবিরে কত দিন তারা থাকবে? এ ছাড়া বাংলাদেশে জামায়াত, খালেদার বিএনপি এবং মোল্লাতন্ত্র মাথাচাড়া দিতে চাইছে। এরই মধ্যে ভারতের এই ডোমেস্টিক রাজনীতির আগুনে হাসিনা-সরকারবিরোধীরা রাজনীতির রুটি সেঁকতে শুরু করে দিয়েছে। এর ফলে ঢাকায়ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ঝড় উঠেছে।

আবার মনে রাখতে হবে, আসাম শুধু হিন্দু বনাম মুসলমান নয়। বিষয়টি বাঙালি বনাম অ-বাঙালিও হয়ে উঠেছে। অতীতে বাঙালি খেদাও আন্দোলন হয়েছে এই আসামে। ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধী প্রফুল্ল মোহন্তর অগপ-র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তখন অগপ-র বক্তব্য ছিল, ১৯৭১ সালের পর যারা আসামে এসেছে, সেই বাঙালিদের চলে যেতে হবে। এখন নাগরিকপঞ্জিটিতে মূল বিষয় হলো, ১৯৫১ সালের পর যারা আসামে বেআইনিভাবে বসবাস করছে, তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বলা হলেও আসামে এই বিতর্কের সুযোগে উলফা ও অগপও আবার বাঙালি খেদাওয়ের রাজনীতি করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অসমিয়া-বাঙালি বিরোধিতার শিকড় আছে। সেই ছাইচাপা আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে।

এটা ঠিক যে ভিসা ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই থাকা যায় না। কুকেতু মেহেতা লিখেছেন যে একদা আমেরিকার থ্রেট ছিল জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, তারপর আল-কায়েদা। আর ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় থ্রেট হলো দেশের ভেতরেই নিউ ইয়র্ক-এ ‘কুইন্স’ নামক একটি জায়গা, যেখানে বাংলাদেশের বহু মানুষ বসবাস করে। এখন বিপর্যস্ত মার্কিন অর্থনীতিতে প্রভাব সৃষ্টিকারী এই অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে ব্যস্ত ট্রাম্প। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এই তিনটি দেশের মানুষের থাকা না-থাকার বিষয়টি কিন্তু আলাদা। ব্রিটিশ সাহেব র‌্যাডক্লিফ ফিতে দিয়ে তাড়াহুড়া করে সীমানা নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই সীমানার ভিত্তিতে মানুষ নিজে ঠিক করারও সুযোগ পায়নি যে কোন দিকে থাকবে। রাষ্ট্র তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এমনও তো হয় যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কারোর উঠোন একদিকে, আর শোবার ঘরটা অন্য দেশে। দেশ ভাগের যন্ত্রণার মানবিক দিক থাকে। তাকেও অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে নরেন্দ্র মোদির কাছেও আসামের নাগরিকপঞ্জির বাস্তব প্রয়োগের চেয়ে বাংলাদেশের মতো বন্ধুরাষ্ট্রকে সঙ্গে রাখাটা খুব জরুরি। বিশেষত চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনীতির যা অবস্থা তাতে বাংলাদেশকে আজ ভারতের প্রয়োজন বিশেষভাবে। বাংলাদেশের জিওস্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব মোদি-অমিত শাহ জানেন না—এটা তো হতে পারে না। তা ছাড়া সব আইনিপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিদেশি বলা যাবে না। ১২০ দিনের মধ্যে তারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবে। সেখানে ব্যর্থ হলে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট। ১০০টি ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আসামে আরো ২০০টি ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে শুরু করবে। মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে।

গরিব মানুষরা আইন খরচ জোগাবেই বা কোথা থেকে? এ ব্যাপারে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার আইনি সহযোগিতা দেবে। তাই এত দ্রুত কিছুই হচ্ছে না। তবে বিজেপি দেশের ভেতরে এটিকে রাজনৈতিক প্রচার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মোদি-শাহ বলেছেন, শুধু আসাম নয়, গোটা দেশেই নাগরিকপঞ্জি হবে। সংসদে বিল পাস হবে এবং আধার কার্ড নয়, সেই নাগরিক পরিচয় পত্রটি হবে ফুলপ্রুফ, শেষ কথা।

ঈশ্বর-আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, দেশে শান্তি বিঘ্নিত যেন না হয়। কোনো সন্দেহ নেই কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির পর মোদি আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করেও এক মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছেন।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা