kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইরানের সঙ্গে বনছে না জি-৭-এর?

স্টিফেন ল্যান্ডম্যান

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইরানের সঙ্গে বনছে না জি-৭-এর?

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মনে করে, ট্রাম্প বিশ্বমঞ্চে একা। আসলেই কি তাই? ট্রাম্প সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের ভাবনা যা-ই হোক, দেশগুলোর জনগণ কিন্তু ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একধরনের একাত্মতা অনুভব করে।

স্পুিনক নিউজের দেওয়া তথ্য মতে, ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা জি-৭-এ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের যাওয়া সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এটি কি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আরেকটি অজুহাতের সন্ধান দেবে?

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্য উপসাগরীয় জোটে যোগ দেওয়ার ট্রাম্পের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। এ বিষয়টি যুদ্ধের আশঙ্কাকে অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের এই জোটে ব্রিটেন, ইসরায়েল ও অস্ট্রেলিয়া যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জি-৭-এর আলোচনায় রাশিয়া অনুপস্থিত ছিল। ইউক্রেন ঘটনার জের ধরে ২০১৪ সালে রাশিয়াকে এই জোট থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এই দেশটি (ইউক্রেন) একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ধামাধরা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর এ বিষয়টিতে জি-৭-এর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। বিষয়টি রাশিয়ার জন্য একটি বড় হুমকি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেখানে যদি ন্যাটোও যোগ দেয়।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনও জি-৭-এ অংশ নয়। ফ্রান্সের বিয়ারিেজ তিন দিন ধরে চলা এ শীর্ষ সম্মেলনে তথাকথিত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ইরান ছিল অন্যতম বিষয়। জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্প অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পর নিজের মতো করে চলার সিদ্ধান্ত নেয় ইউরোপ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য এ চুক্তির সঙ্গে সহমত ছিল। আন্তর্জাতিক আইনে এ চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা থাকার পরও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ট্রাম্প চুক্তি থেকে বের হয়ে যান। এর পর থেকেই চুক্তির শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হয় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইইউ। যুক্তরাষ্ট্রের পথেই চলতে শুরু করে তারা। যদিও বিষয়টি তারা স্বীকার করেনি।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ প্রথম বলেন, তিনি জি-৭-এ ইরান সম্পর্কিত আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন। জি-৭-এর অন্য সদস্যদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে যথাযথ সাড়া না পেয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরান প্রসঙ্গে গতকাল (২৪ আগস্ট) আলোচনা করেছি। কিন্তু অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি। জি-৭-এর কোনো সদস্যই চায় না ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করুক। সবাই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। তবে এই দুই লক্ষ্য অর্জনে জি-৭-এর কোনো সদস্যই সুস্পষ্টভাবে কোনো পদক্ষেপের কথা জানাতে পারেনি। যদিও ইরানের জন্য আমাদের সমন্বিত বার্তা কী হতে পারে, সে ব্যাপারে একমত হয়েছি আমরা।’ বলে রাখা ভালো, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। ইরানের নেই। কখনো ছিল না। বানানোর ইচ্ছার কথাও তারা কখনো জানায়নি। বরং এ ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র বিনাশের পক্ষেই তারা সব সময় মত প্রকাশ করে আসছে। সবার উচিত, কাজ দিয়েই তাদের বিচার করা। জি-৭ দেশগুলো মুখে বলছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতি চায়। কিন্তু তাদের তৎপরতা থেকে তেমন বিশ্বাস জন্ম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন আগ্রাসনে সমর্থন দিয়ে আসছে। যেখানে ইরানের সঙ্গে অন্য দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে। তারা কখনোই অন্য কোনো দেশের ওপর আক্রমণ চালায়নি। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবেও তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেই অধিক আগ্রহী। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সাম্রাজ্যবাদী অন্য মিত্রদের অবস্থান এর একেবারে বিপরীতে।

ম্যাখোঁ জানান, জি-৭ নেতারা ইরানের বিষয়ে একসঙ্গে কথা বলবেন। একটি যৌথ বিবৃতির কথাও জানান তিনি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরান প্রসঙ্গে নিজ কর্মসূচি (বৈরী) অনুসারেই চলবেন, যা হবে জি-৭ দেশগুলোর চেয়ে স্বতন্ত্র। ম্যাখোঁ বিষয়টি নিয়ে জি-৭-এর পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার সঙ্গে একমত কি না এমন প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, এ নিয়ে তিনি কোনো আলোচনা করেননি। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত অনুসারেই চলব। তবে আপনি জানেন, আমি মানুষের কথা বলা বন্ধ রাখতে পারি না। তারা যদি কথা বলতে চায় বলবে।

জি-৭-এর ফাঁকে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যা ইভেস লে দ্রাইনের আমন্ত্রণে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বিয়ারিেজ যান। সেখানে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার কোনো ইচ্ছা তাঁর ছিল না। আরটি জানায়, ম্যাখোঁর পরিকল্পনা ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর বিনিময়ে ইরান দ্রুত জেসিপিওএর শর্তগুলো মেনে চলবে। একই সঙ্গে আলোচনার টেবিলেও ফিরবে তারা।’

ইরান এরই মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ালেও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেনি। ট্রাম্প অবৈধভাবে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। আর ইউরোপীয় দেশগুলোও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থীরা ইরানের ওপর থেকে তাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কমাবে এমনটা আশা করা অর্থহীন। তাদের প্রকৃত পরিকল্পনা হচ্ছে, ইরানের ক্ষমতাসীনদের গদিচ্যুত করে সেখানে পশ্চিমা পুতুল সরকার স্থাপন। যার মধ্য দিয়ে ইরানের তেলসম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। জারিফ জি-৭ সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গরূপে মধ্যস্থতার আলোচনায় অংশ নেন। তবে এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে জেসিপিওএ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধও শুরু করেছে তারা।

বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো আনুষ্ঠানিক শোক সংবাদ প্রচার শুরু না হলেও জেসিপিওএর মৃত্যু ঘটেছে। একটি মাত্র উপায় রয়েছে, যার মাধ্যকে একে রক্ষা করা যায়—সেটি হচ্ছে, ইউরোপ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গ ছেড়ে দিয়ে চুক্তির তাদের অংশের বাধ্যবাধকতাগুলো পূরণ করে, তাহলে এখনো চুক্তিটিকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু ২০১৮ সালের মে মাস (এ সময়ই ট্রাম্প চুক্তি থেকে বের হয়ে যান) থেকে তারা এই প্রয়োজনীয় কাজটি করতে পারেনি। পারবে এমন কোনো চিহ্নও তাদের আচরণে নেই।

 

লেখক : সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশনের গবেষণা সহযোগী

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা