kalerkantho

স্মরণ

এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালে কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত মেধাবী মোজাফফর আহমদ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩৭ সাল থেকেই তিনি রাজনীতি করে আসছেন। শুরু থেকে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল এই মহান নেতা বিশ্বাস করতেন সমাজে ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপের প্রতিনিধি হিসেবে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করেন। দীর্ঘ আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁকে কারাভোগও করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল তাঁদের অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের অবদান অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে  রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল শক্তির পক্ষে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে তিনি কারারুদ্ধ হন। ২০১৫ সালে সরকার অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে, তবে তিনি তা নিতে অস্বীকার করে সবিনয়ে প্রত্যাহার করেন। এই সময় তিনি বলেছিলেন—রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ-পদবির জন্য তিনি কখনো রাজনীতি করেন না।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সারা জীবন এ দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা বড় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তিনি সারা জীবন প্রগতিশীল বামধারার রাজনীতি করেছেন। তবে তিনি মনে করতেন বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ যেহেতু মুসলমান, এখানে ধর্মকে একেবারে বাদ দিয়ে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্ম, কর্ম, সমাজতন্ত্র—এই নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। তিনি কখনো নীতির সঙ্গে আপস করেননি। প্রচারবিমুখ ও নির্লোভ দেশবরেণ্য এই মহান ব্যক্তির মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

 

মন্তব্য