kalerkantho

চামড়ার অর্থনীতিতে নৈরাজ্য

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

২৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চামড়ার অর্থনীতিতে নৈরাজ্য

চামড়ার অর্থনীতি নিয়ে খেলা আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। এটা সেই অর্থে নতুন কিছু নয়। তবে কয়েক বছর ধরে এ খাতটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় এসে ঠেকেছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এটা ঘটেনি। ঘটেছে মধ্যস্বত্বভোগী চামড়া ব্যবসায়ী বড় আড়তদার ও চামড়াশিল্পের মালিক শ্রেণির কারসাজিতে ও অশুভ তৎপরতায়। এই দুই শ্রেণির তথাকথিত ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়া ক্রয় বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিমভাবে চাহিদা শূন্য করে দিয়েছে। তারা শুধু নিজেরা বেশি লাভ করার মানসিকতা নিয়ে এ রকম একটি সম্পূর্ণ অনৈতিক কাজ করেছে, যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গর্হিত ও পাপের কাজ।

আমাদের দেশে সারা বছর চামড়ার যে উৎপাদন তার অন্তত ৮০ শতাংশ আসে কোরবানির সময়ে। এ বছর প্রায় ৪৫ লাখ গরু ও মহিষ এবং ৬০ লাখের মতো ছাগল-ভেড়া কোরবানি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে জানা গেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ হয়েছে এক দিনে অর্থাৎ ১২ আগস্ট (মূল কোরবানির দিন)। এক দিনে বিপুলসংখ্যক চামড়া! স্বাভাবিক নিয়মেই তাই এ সময়ে আবির্ভাব ঘটে তথাকথিত মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের। আসলে তারা ছাড়া এত চামড়া দ্রুত আড়তদারদের কাছে যথাযথভাবে সংরক্ষণের নিমিত্তে পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব নয়। কয়েক বছর ধরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আড়তদারদের কারসাজির কারণে ক্রয় দামের চেয়ে কম দামে চামড়া আড়তদারদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে তাদের বিপুল পরিমাণ লোকসান হয়েছে। ফলে এ বছর তারা আর চামড়া ক্রয় করতে মাঠে নামেনি। কসাইরা সামান্য দামে (গরু ১০০ থেকে ৩০০ টাকা, খাসি ১০ থেকে ২০ টাকায়) চামড়া ক্রয় করে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের (যৎসামান্য লাভে) হাতে তুলে দিয়েছে। অনেক কসাই আবার পরিবহন খরচ হবে না বলে ক্রয়ই করেনি। ফলে বিপুলসংখ্যক চামড়া অবিক্রীত থেকে গেছে। এগুলো পচে গেছে। ভাগাড়ে ফেলে দিতে হয়েছে অথবা মাটিতে পুঁতে দিতে হয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে যে দেশব্যাপী প্রায় পাঁচ লাখের মতো চামড়া এভাবে ফেলে দিতে হয়েছে, যার মূল্য সরকার নির্ধারিত মূল্যেই ১০০ কোটি টাকার ওপরে।

উল্লেখ্য যে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়ের টাকা ধর্মীয়ভাবে গরিব-দুঃখী মানুষকে এবং এতিমখানা ও মাদরাসায় দিয়ে দেওয়া হয়। সেই অর্থে এসব অসহায় মানুষের ভাগ্য কেড়ে খেল আমাদের এই তথাকথিত চামড়া ব্যবসায়ীরা। ধিক তাদের এই হীন মানসিকতার জন্য! বেশি লাভের মানসিকতায় তারা এত নিচে নামতে পারে তা ভাবতেও লজ্জা হয়। অথচ বরাবরের মতো এবারও এই তারাই কোরবানির আগে সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে নিয়েছিল : ঢাকায় গরু-মহিষের প্রতি বর্গফুট ৫০-৫৫ টাকা, মফস্বলে ৪৫-৫০ টাকা, খাসি ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ২০-৩০ টাকা, মফস্বলে ১০-২০ টাকা। অথচ তারা কথা তো রাখেইনি, বরং চামড়া ক্রয় বন্ধ করে দিয়ে দাম ইচ্ছামতো কমিয়ে নেওয়ার মতো এক জুয়া খেলায় মেতে ওঠে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।

একটা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কেন এ রকম হবে? একটা অতি সম্ভাবনাময় খাত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। সরকার কি এটা চেয়ে চেয়ে দেখবে? কিছুই কি করণীয় নেই? ব্যবসায়ীরা দায়িত্ব এড়াচ্ছে পরস্পরকে দোষ দিয়ে। আড়তদাররা বলছে, চামড়াশিল্প মালিকরা গত মৌসুমের পাওনা ৪০০ কোটি টাকা তাদের দেয়নি বলে তারা চামড়া কিনতে পারছে না। দেনা-পাওনা তো থাকতেই পারে। সারা বছর তারা কী করেছে? এখন কেন তারা পাওনার কথা বলছে? আগে কেন বলেনি? এখানেই তাদের দুরভিসন্ধি ধরা পড়ে গেছে। অন্যদিকে চামড়াশিল্পের মালিকরা দাম কমানোর জন্য গত বছরের মজুদ ধরে রেখেছে। আড়তদারদের পাওনা ৪০০ কোটি টাকার কথাও তারা পুরোপুরি স্বীকার করেনি। কর রেয়াতি সুবিধা ও প্রণোদনাসহ নানা ধরনের সুবিধা তারা পাচ্ছে সরকারের কাছ থেকে। তার পরও তারা দেশকে ঠকাচ্ছে, গরিবের হক কেড়ে নিতে দ্বিধা করছে না। চামড়ার অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা তথা সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সংসদের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও কঠিন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে চামড়া নিয়ে খেলা বা ষড়যন্ত্র চিরতরে বন্ধ হয়। মৌসুমের আগমুহূর্তে নয়, বছরের শুরুতেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গোটা প্রক্রিয়াটিকে সুপরিকল্পিত রূপদান করতে হবে, যাতে কারো কোনো অভিযোগ না থাকে এবং কারো স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, বিশেষ করে গরিবদের। চামড়া নিয়ে গবেষণা কার্যক্রমে হাত দিতে হবে। এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। চামড়ার বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অব্যাহতভাবে আধুনিক ও রকমারি পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। তাহলেই চামড়ার বাজার সম্প্রসারিত হবে। দূর হবে চামড়া নিয়ে দুর্ভাবনা।

চামড়াশিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ করতেই হবে। প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটা চামড়াশিল্পের পল্লী গড়ে তোলার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। কারণ এ শিল্পটি এখন শুধুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এতে করে দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের খরচ অনেক বেশি হয়। প্রায় সময়ই চামড়ার মান নষ্ট হয়। অন্যান্য সমস্যা তো রয়েছেই—চামড়াজাত পণ্য বাজারজাতকরণের নিমিত্তে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে (আন্তর্জাতিকভাবে) আরো চাঙ্গা করতে হবে। বছরে অন্তত দুবার চামড়াজাত পণ্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। দেশের অভ্যন্তরে বড় বড় শহরগুলোতে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্ভাবনাময় বাজারকেন্দ্রিক শহর-নগরগুলোতে এ ধরনের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি কেনাকাটায়, প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেনাকাটায় দেশীয় চামড়াজাত পণ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বছরের শুরুতেই দেশে চামড়ার চাহিদা কত, সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কত, কুটির ও কারুশিল্পের চাহিদা কত ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে চামড়া ব্যবহারের মোট চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। এর পরও যদি উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে যথাসময়েই রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা ছাড়া কতগুলো রপ্তানি করা যাবে এবং কোন কোন দেশে—সে বিষয়ে আগেভাগেই যথাযথ সিদ্ধান্ত অবশ্যই থাকতে হবে। অব্যাহত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে, যাতে এ রকম ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে। চামড়াসংক্রান্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির জন্য চামড়া প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে এবং দাম কমাতে হবে। আর এ কাজটি আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া সম্ভব নয়। সৎ ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রণোদনা যদি দিতেই হয়, তাহলে শুধু সৎ ও দক্ষ ব্যবসায়ীদেরই দিতে হবে, যাতে অন্যরাও উৎসাহিত হয়। আর ফটকাবাজ, ফ্রড্ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কালো তালিকাভুক্ত করে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই যে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড পারলে আমরা পারব না কেন। চীন তো অন্য সব পণ্যের মতো চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য দিয়ে সারা পৃথিবীর বাজার সয়লাব করে দিয়েছে। তাদের এ সফলতার চাবিকাঠি একটাই। আর তা হচ্ছে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। এটা সম্ভব হয়েছে আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির মাধ্যমে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডও এগিয়েছে ওই একটি কারণেই। যদিও চীনের তুলনায় এ দুটি দেশের অর্থনীতির আকার অনেক ছোট। আর একটা মূল্যবান জিনিস তাদের আছে এবং ছিল—নির্ভেজাল দেশাত্মবোধ। নিজের দেশের মানুষকে ঠকানোর মতো মানসিকতা তাদের দেশের ব্যবসায়ীদের নেই। এক হিসাবে দেখা গেছে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চামড়াজাত পণ্য বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ চীনারা দখল করে নিয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করতে পারছে বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে। অতএব নিজের দেশ ও জনগণকে ঠকানোর হীন মানসিকতা থেকে আমাদের ব্যবসায়ীদের বেরিয়ে আসতেই হবে। ব্যবসায় সততা ও দেশপ্রেমের প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা