kalerkantho

বাঙালি অভিবাসীর স্বপ্ন ও হাহাকার

ড. শফিক আশরাফ

১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাঙালি অভিবাসীর স্বপ্ন ও হাহাকার

বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের জোয়ার! স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যেকোনো সময়ের তুলনায় রিজার্ভ বেশি বলে আমরা উৎফুল্ল এই ভেবে যে দেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের জোয়ারের পেছনে যে শ্রম-ঘাম ও শোষণের নিদারুণ প্রক্রিয়া, তার খবর কয়জন রাখি। এ দেশের নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণরা তাদের হালের লাঙল, গরু, ভিটা, জমি বিক্রয় করেও যখন কূল পায় না তখন দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বা পাশ্চাত্যে ছুটে স্বপ্ন কিনতে। প্রায়ই তারা জানে না কোন ধরনের কাজ করতে তারা সেখানে যাচ্ছে, সেই কাজের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা হয়তো কোনোটাই নেই। তার পরও যায়। গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টায় কাজ শিখে দক্ষ হয়ে ওঠে। তাদের মাথায় থাকে বিক্রয় হয়ে যাওয়া ঘটি-বাটি ফেরত পাওয়ার বাসনা। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে কাজ শিখে দক্ষ শ্রমিক হয়ে দেশে টাকা পাঠায়। সেই টাকায় পরিবার-পরিজন বছর ধরে ঋণ শোধ করে এবং ভিটা-জমি উদ্ধারের চেষ্টা করে। তাদের পাঠানো টাকায় ব্যাংক হাসে! এর পরও সবার ভাগ্যে সেই শিকে ছিঁড়ে না। বৈধ-অবৈধ পথে স্বপ্ন কিনতে তারা নানা পথে ছুটতে থাকে। কেউ হয়তো বঙ্গোপসাগরে বার্মিজ জলদস্যুর হাতে পরে প্রাণ হারায়, কেউ আবার নির্মম নির্যাতনের পর মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত আসে, আবার কখনো ঝাঁক বেঁধে ভূমধ্য সাগরে ডুবে মরে! কিংবা মালয়েশিয়ার জঙ্গলে দাস ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে দিনের পর দিন নিদারুণ যন্ত্রণার ভেতর হাহাকার করে! তাদের পরিবার-পরিজন জানতেও পারে না স্বপ্ন ধরতে যাওয়া মানুষটার করুণ পরিস্থিতির কথা, যদি জানেও তখন তাদের করার কিছু থাকে না। সাধারণ মানুষ বিদেশ মন্ত্রণালয় চেনে না, চেনে না জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরো! তারা চেনে গ্রামের মধ্যস্বত্বভোগী দালালকে, পরিস্থিতি বুঝে দালালরা গাঢাকা দেয়। আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সেই খবর জানি। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক খবরে বলা হয়েছে, এত দিন লিবিয়া থেকে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশিদের ইতালি যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এখন ইতালির পর স্পেনেও আশ্রয় চাচ্ছে বাংলাদেশিরা। অন্যদিকে গত সাত মাসে অন্তত ২১৪ জন বাংলাদেশির ইউরোপ যাত্রা ঠেকিয়েছে লিবিয়া কোস্ট গার্ড।

এখন প্রশ্ন হলো, যে খাত বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিচ্ছে, যাদের ঘামের টাকায় আমাদের রেমিট্যান্স উপচে পড়ছে, তাদের প্রতি আমাদের এত অবহেলা-অযত্ন কেন? প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে কতজন মানুষ কী কাজ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে, কতজন মানুষ কোন কাজের ওপর দক্ষ হয়ে দেশে ফিরে আসছে, সে পরিসংখ্যান কি আমাদের কাছে আছে? এসব মানুষ বিদেশ যাচ্ছে কোনো না কোনো এজেন্সির মাধ্যমে। আবার গ্রামের সাধারণ মানুষের সরাসরি কোনো এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তারা গ্রামের কোনো মধ্যস্বত্বভোগী দালাল ধরে, সেই দালাল আবার ঢাকার আরেক বড় দালালের মাধ্যমে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফলে বিদেশযাত্রায় একজন শ্রমিকের যে ব্যয় হয়, সেই টাকা তাকে দেড়-দুই বছর ধরে শোধ করতে হয়, অর্থাৎ এই দেড়-দুই বছর তাকে বেগার খাটতে হয়। কখনো কখনো তারা ঋণের টাকা কোনো দিনই শোধ করতে পারে না।

আবার এসব শ্রমিক যখন বিদেশে যায় বা ফিরে আসে তখন বিমানবন্দরে তাদের নানা ধরনের যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হয়। ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের শুধু তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তা-ই নয়, কখনো তাদের আটকে রাখে, কখনো কোনো ভুল খুঁজে বের করে টাকা দাবি করে। তাদের ফেরার পথে যন্ত্রণা আরো বেশি। বিদেশ থেকে ফেরার সময় তাদের শ্রম-ঘামের টাকা দিয়ে মা-বাবার জন্য দুটি কম্বল, বোনের জন্য সাবান-শ্যাম্পু, স্ত্রীর জন্য হয়তো একটি সোনার চেন নিয়ে আসে। তল্লাশির নামে প্রায়ই তাদের এসব জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলা হয়! কাস্টমসের নামে কখনো কখনো তাদের জিনিসপত্র রেখে দেওয়া হয়। এসব দেখে মনে হয়, বিমানবন্দরে কর্মরত সরকারের এসব কর্মচারী দেশ বোঝে না, রেমিট্যান্স বোঝে না, এমনকি সেবা ধারণাটাও হয়তো তাদের কাছে পরিষ্কার নয়! ফলে তাদের কাছে এসব শ্রমিকের কোনো মূল্য নেই! তারা তাদের নিজেদের শ্রমিক মনে করে কিংবা জঞ্জাল মনে করে! দায়িত্বের নামে সুযোগসন্ধানী হয়! আইন করে শাস্তি দিয়ে এ ধরনের সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এ সমস্যার সমাধান তখনই হবে যখন তাদের মানসিকতা পরিবর্তন হবে, যখন তারা দেশ ও শ্রমিকদের গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং যখন তারা বুঝতে পারবে তারা শুধু দেশ ও মানুষের সেবাদাস। আর বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম এবং তীক্ষ নজরদারির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা তুলনামূলক ঢিলে। একাধিকবার বন্দুক নিয়ে বিমানে ওঠার কাহিনি এরই মধ্যে দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশকে হাসাতে হলে বিমানবন্দরের সব ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগী হওয়া জরুরি। মনোযোগী হওয়া জরুরি বিদেশ গমন-ফেরত শ্রমিকটির হয়রানি রোধের দিকে।

সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে কারিগরি শিক্ষার পেছনে! যে তরুণটি নিজের ঘটি-বাটি বিক্রির টাকায় একজন অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গিয়ে কোনো একটা কাজের দক্ষতা নিয়ে ফিরে আসছে, সে হয়তো জুতার ফ্যাক্টরি কিংবা আতর কারখানায় অথবা নির্মাণকাজের কোনো একটা বিষয়ে দক্ষতা নিয়ে ফিরে আসছে। একজন মানুষকে সেই কাজে দক্ষ করে গড়ে তুলতে সরকারকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে হতো কিংবা সরকার লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছে দক্ষ করে গড়ে তুলতে। সরকার যদি এসব বিদেশফেরত মানুষের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্র তৈরি করে বা পরিকল্পনা করে, তাহলে শুধু যে কারিগরি শিক্ষার ওপর চাপ কমবে তা-ই নয়, মানুষগুলোর কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। দেখা যায়, বিদেশ থেকে উপার্জন করে নিয়ে আসা টাকা-পয়সা কমে এলে, বিদেশফেরত মানুষ দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে আবার কিছুদিন পর বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। তারা বিদেশে যে অমানবিক পরিশ্রম করে, পরিবর্তে যে পারিশ্রমিক পায় তার চেয়ে কম পারিশ্রমিকে তারা দেশে কাজ করবে শুধু তাদের কাজের দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে। আর এটা করতে পারলেই বিদেশফেরত মানুষের কর্মসন্ধানের জন্য হাহাকার করতে হবে না। সুচারু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নেই দেশের মানুষের শ্রমে-ঘামে দেশ এগোবে তার আপন শক্তিতে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য