kalerkantho

সমস্যা মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সমস্যা মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে

এই সময়ে বাংলাদেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে। প্রথমটি বন্যা, দ্বিতীয়টি ডেঙ্গু। বন্যায় উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলাও প্লাবিত হয়েছে। এবারের বন্যায় সিলেট, বৃহত্তর রংপুর, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা এবার আকস্মিকভাবে উজানের জল গড়িয়ে পড়ার কারণে ঘটেছে। গাইবান্ধা শহর হঠাৎ করে ডুবে যাওয়ায় মানুষ বিপাকে পড়েছিল। বন্যার পানি এখনো উত্তর থেকে সবটা সরে যায়নি। দক্ষিণে যেহেতু জোয়ার রয়েছে, তাই পানি দ্রুত নামতে পারছে না। এর ফলে অনেক জায়গায় পানি স্থির হয়ে থাকায় ফসলহানি ঘটছে। বাড়িঘর মানুষের থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মানুষজন ভিটামাটি ছেড়ে বেড়িবাঁধ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে  থাকতে বাধ্য হয়েছে। বন্যায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাঁস, মুরগি ও গবাদি পশুর। এসবের আশ্রয়স্থান এবং খাবার সব সময় কৃষকের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিপাকে পড়েছে তারা এবং গৃহপালিত পশুপাখিও। তবে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রম অপেক্ষাকৃত পরিকল্পিতভাবে করার ফলে মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো, আগে আমাদের দেশে বন্যায় ত্রাণ বিতরণের জন্য সরকারি প্রশাসনের চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা রাখত এনজিও, সামাজিক সংস্থা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠন। ত্রাণ বিতরণের এসব উদ্যোগ নিয়ে তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হতো। মানুষ বন্যার্তদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ এবং প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় প্রদানের জন্য ব্যাপকভাবে সেগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করত। সেই সময় বাংলাদেশ বর্তমানের চেয়ে আর্থিকভাবে ততটা সচ্ছল ছিল না, যতটা এখন মানুষের আছে। কিন্তু মনে হয়, তখন মানুষ জাতীয় যেকোনো দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহী ছিল। এবার সে রকম ত্রাণ বিতরণের দৃশ্য বেসরকারিভাবে দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগ কিছু ত্রাণ বিতরণ করছে, দু-এক জায়গায় বিএনপির বিতরণের কথা শোনা যাচ্ছে, এর বাইরে অন্যদের খুব বেশি দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয় না। এর কারণ কী সেটি বোধগম্য নয়। তবে সরকারিভাবে বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মানুষের পুনর্বাসনের যেমন প্রয়োজন দেখা দেবে, একইভাবে ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণও জরুরি হয়ে পড়বে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকার মানুষের ঘরে খাদ্যদ্রব্য বেশ সময় ধরে বিতরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে হয়। এটি সরকার কিভাবে করছে সেটি কয়েক দিন পরে হয়তো বোঝা যাবে।

বন্যার দুর্যোগ হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই কেটে যাবে। মানুষের কষ্ট, ক্ষয়ক্ষতি, গৃহপালিত পশুপাখির ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা বেশ সময়ের দরকার হবে। এর ফলে বেশ কিছু অঞ্চলের মানুষ আর্থিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগ বিস্তারের ফলে নানা ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে মানুষকে সহযোগিতাদানের উদ্যোগ নেওয়া বোধ হয় খুবই জরুরি। তবে বন্যা শেষে অতি অল্প সময়ে প্লাবিত অঞ্চলগুলোয় কৃষকরা সময়মতো সার ও কৃষি উপকরণ পেলে সেখানে ভালো ফসল উৎপন্ন হতে পারে। উত্তরের বন্যার প্লাবন থেকে যে পলি ভেসে এসেছে তা বাংলাদেশে জমির উর্বরতা, ফসল বৃদ্ধি এবং মাছ চাষসহ নানা ধরনের উৎপাদনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের ধারণা।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটি এ মুহূর্তে দেশের মানুষকে সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। অতীতের অভিজ্ঞতার চেয়ে এবারের ডেঙ্গুর লক্ষণ, প্রতিক্রিয়া এবং ধরন-ধারণ সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যাওয়ায় দেশ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। এডিস মশা এতখানি দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে তা আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর অনেক দেশেরই জানা ছিল না। এই সময়ে নিকারাগুয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশেই ডেঙ্গুর ব্যাপকতা নিয়ে মানুষ একধরনের মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছে। বাংলাদেশে এডিস মশা ঢাকা শহরে এবার যেভাবে বংশবিস্তারে সক্ষম হতে পেরেছে, তার জন্য অনেকেই সিটি করপোরেশনকে অভিযুক্ত করছে। কারণ এই দুই কর্তৃপক্ষ এডিস মশা মারার প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে না পারার কারণে মশা নিধনে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এবারের ডেঙ্গু সম্পূর্ণরূপেই আগের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় ডাক্তাররাও হিমশিম খাচ্ছেন এত রোগীর চিকিৎসা দিতে। ডেঙ্গুর প্রভাব ঢাকা শহরে এতটাই বিস্মৃত হয়েছে যে বেশির ভাগ মানুষের পরিবারেই কেউ না কেউ এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। রোগটি এ মুহূর্তে দেশের অনেক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সামনে কোরবানির ঈদ। অনেকেই গ্রামে যাবেন। তখন এই রোগের বিস্তার গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে কি না সেটি নিয়ে উদ্বেগ আছে। সিটি করপোরেশন নতুন নতুন ওষুধ বিদেশ থেকে আনার চেষ্টা করছে। তাদের আশ্বাস হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে ডেঙ্গু সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তারা কাজ করছে। কিন্তু সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টি বেশ লম্বা। এই সময়ে যদি ডেঙ্গু আরো ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় সেটি বিবেচনায় নিয়ে এখনই সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তাই মানুষ খুব দ্রুত এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলেও মশা মারার ওষুধ, চিকিৎসা ব্যবস্থাধীন ইত্যাদি যথাযথভাবে নেওয়া গেলে এই বিপর্যয় ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।

প্রাকৃতিক এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের শুধু আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন জুুগিয়ে জয় করা সম্ভব নয়। এর জন্য অতীব জরুরি হচ্ছে, গবেষণার মাধ্যমে এসব রোগ এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন, গবেষণা এবং প্রস্তুতি গ্রহণের বিষয়টি জাতীয়ভাবে নিতেই হবে। আমাদের এ ধরনের নতুন নতুন রোগতত্ত্বের গবেষণার জন্য ব্যাপকসংখ্যক গবেষক তৈরি করা দরকার। সে ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা সৃষ্টির জন্য চিকিৎসক ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে তৈরি করতেই হবে। প্রয়োজন এসব বিষয়ে আমাদের তরুণদের আরো ব্যাপকভাবে গবেষণায় যুক্ত করা। তাহলে নতুন নতুন রোগতথ্য নিয়ে আমরা এমন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ব না।

আমাদের আরো বেশ কিছু বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সমস্যা তৈরি হয়েছে, যেমন—পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব, দুধে মানবদেহের ক্ষতিকর নানা উপাদানকে কেন্দ্র করে দুধ উৎপাদন ও বন্ধ করা নিয়ে একটি জটিল সময় গেছে। আবার বন্যা, ডেঙ্গু, গুজব ইত্যাদিকে কেন্দ্র  করে দেশে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর সংকট তৈরি করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রচার-অপপ্রচারে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সবই ঘটেছে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চর্চা ও গবেষণা প্রয়োজনীয় মানে না ঘটার ফলে ব্যাপকসংখ্যক মানুষ কুসংস্কারে বিশ্বাস করছে, নানা ধরনের প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং মহল বিশেষ একধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে দেশকে গভীর সংকটে ফেলে দেওয়ার কারসাজি করেই চলছে। সরকারকে এসব বিষয়ে আরো বাস্তবচিত চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা গ্রহণ ও দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করেই অগ্রসর হতে হবে। এখনই ডেঙ্গু রোগের নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি আগামী বছর কী করণীয় তা চিন্তা করা এবং কার্যকর প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হওয়া জরুরি। তাহলে আগামী বছর এমন পরিস্থিতি দেশে সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নাও ঘটতে পারে।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য