kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

মেগা উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রয়োজন

এম হাফিজউদ্দিন খান

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মেগা উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রয়োজন

পবিত্র ঈদুল আজহা চলে এলো। ঈদের আগে অনেক বিষয় সামনে এসেছে। কিন্তু খেদের সঙ্গেই বলতে হয়, দেশের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এখন সরকার এবং মন্ত্রিপরিষদ নিয়েই দেশের সব কিছু চলছে। সংসদে বা সংসদের বাইরে কোনো বিরোধী দল নেই। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, আন্দোলন নেই—কোনো বাধাবিপত্তিও নেই। সুন্দর ও মসৃণ গতিতে দেশ চলছে। একই সঙ্গে রাজনীতি চলছে। উন্নয়ন হচ্ছে দেশের। এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে—বহির্দেশে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যে সংযোগ ও সম্পর্ক—সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিলাম, সুধীসমাজ ও সমাজের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা খুবই কম। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এসব ভাবা যায় না।

আমাদের এখানে একটা সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে—আমরা কাজ যতটুকুই করি না কেন, নিজের দোষ কখনো দেখি না। অন্যরা কী করছে, সেটা নিয়েই আমাদের যত কথা ও ভাবনা। দেশে প্রতিনিয়ত নতুন বিষয় সামনে আসছে। যেমন—ডেঙ্গু নিয়ে আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। এখনো যে শঙ্কামুক্ত হতে পেরেছি, তা বলা যাবে না। কিন্তু সরকারি দল বা বিরোধী দল—প্রত্যেকের নিজেদের জায়গা থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা জরুরি কর্তব্য ছিল। সেটা কি আমরা করেছি? তা নিয়ে খুব একটা কথা নেই। কথা আছে, কে কতটা দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখিয়েছে বা দায়িত্ব পালন করেনি—সে বিষয়ে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, বেশ কিছু মানুষ মারাও গেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের যে দারুণ অবহেলা ছিল, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার তো স্বীকার করে না। উচিত ছিল, সরকারের অন্য অনেক সাধারণ কাজ মুলতবি রেখে উত্তরের বন্যা এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার। কিন্তু সে রকম কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

নতুন একটি প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি—প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যা সামনে চলে আসে। পুরনো বিষয়টির কোনো সুরাহা নেই, সমাধান নেই, নতুন আরেকটি বিষয় সামনে এলে সেটি নিয়েই আমরা ব্যস্ত হয়ে যাই। আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ সেদিকে নিবদ্ধ করি। এভাবে অনেক সমস্যা আমরা জেনে ও বুঝে এড়িয়ে যাই। এটা কোনো ভালো লক্ষণ বলে মনে হয় না। সময়ের কাজ তো সময়ে করতে হবে। ডেঙ্গু হোক, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব কিছু তো একসময় ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময় থাকতে সেসব বিষয়ে দায়িত্বশীল এবং সক্ষম পক্ষ যদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তো ভালো দেখায় না। এই মানসিকতা থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সম্প্রতি পত্রিকা এবং টেলিভিশনে একটি বিষয় বেশ ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। বক্তৃতা ও প্রশিক্ষণের নামে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কিছু ব্যক্তি প্রচুর টাকা লোপাট করেছেন। এটা অত্যন্ত বেআইনি। নির্বাচন কমিশনে যাঁরা কাজ করেন, এসব তো কন্ডিশনাল পোস্ট। নির্বাচন কমিশনে কে কত বেতন পাবেন—তা তো বলা আছে। তাঁদের কত বেতন-ভাতা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন আছে। এর বাইরে একটি টাকাও অতিরিক্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। আর বক্তৃতা দিয়ে টাকা নেওয়া—এটা তো কোনো নিয়মের মধ্যেই পড়ে না। কারণ তাঁদের যেসব কর্মযজ্ঞ আছে, যে বিষয়গুলো নিয়ে তাঁরা কাজ করবেন, সেসব তো নির্ধারণ করা আছে। বক্তৃতা দেওয়া—এটা তো তাঁদের পার্ট অব ডিউটি। এটা তো আলাদা কোনো কাজ নয়। কাজেই এখানে এক্সট্রা সুবিধা নেওয়া আইন অনুসারে হয় না। আবার এক দিনে ১৪টি করে বক্তৃতা দেওয়া, এটাও তো ঠিক নিয়ম বলে মনে হয় না কিংবা সম্ভবও নয়। এটাকে স্রেফ হরিলুট ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এসব বিষয়ে সরকারের ভূমিকা দরকার। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যাপারে সরকারের ওপরেই দায় বর্তায়।

ডেঙ্গু বিষয়ে আরেকটু কথা বলা দরকার। সেটা হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ে সরকার ও সরকারের বাইরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নানা ধরনের কথা বলতে শুনলাম। কেউ কেউ দেখলাম একেবারেই না জেনে, না শুনে কথা বলেছেন। আর খুবই দুঃখজনক যে বিষয়টি চোখে পড়েছে, দায়িত্বশীল কিছু ব্যক্তি সামাজিকভাবে খুবই পরিচিত বা সেলিব্রিটি মানুষকে ধরে এনে ডেঙ্গু প্রতিরোধের যে মহড়া দিয়েছেন, তা অত্যন্ত হাস্যকর হয়েছে। এটা শুধু ফটোসেশন করার জন্যই করা। এতে মশা মারা বা জনগণকে সচেতন করার কিছু ছিল না। এ বিষয়গুলো কিভাবে ঘটতে পারে ভেবে খারাপই লাগে। সরকারি দলের কিছু প্রতিনিধি সরাসরি এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিরোধী দল থেকেও কাউকে বিশেষ ভূমিকা নিতে দেখা গেছে কি? আমি অবশ্য সেভাবে দেখতে পাইনি।

আমরা অনেক সময় শুধু অন্যের ভুল ধরার কাজে সময় ব্যয় করি। অন্যরা কী করছে, সেটার ভুল ধরে বিবৃতি দিয়ে স্বস্তি পাই। কিন্তু এভাবে কি কোনো কাজের কাজ হয়? না, তা হয় না। তাহলে কেন এসব করতে হবে?

সরকারের বাইরে সংসদে বা মাঠে কোনো জোরালো ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দল কিছু করতে পারছে না। হয় তাদের মনোবাল দুর্বল কিংবা নেতৃত্বের সংকট আছে। কিন্তু দেশে যখন কোনো দুর্যোগ আসে, তখন তো মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, সেটাই সবচেয়ে জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা যুক্ত—সরকারে বা বিরোধী দলে, তাঁদের একটা বড় ভূমিকা থাকবে, সেটাই মানুষ আশা করে। কিন্তু কোথায়? সে বিষয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো ব্যাপার চোখে পড়েনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিরোধী দল আর কিছু করতে না পারুক, তারা তো লাখখানেক লিফলেট ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা জাগাতে পারত। এ জন্য বেশি পয়সাও খরচ হতো না। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগই তো নিতে দেখলাম না। এখন বিরোধী দলের কাজকর্ম প্রেস ক্লাবে আর পার্টি অফিসেই যেন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সামনে তারা কিভাবে কী করবে বুঝতে পারছি না।

দেশে এখন উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ভেতরে মেট্রো রেল নিয়ে দীর্ঘ প্রজেক্টের কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে নিশ্চিতভাবে ঢাকাবাসীর সুবিধা হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বিশাল কাজের গতি এত ধীর, কবে শেষ হবে বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে কি না বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে একটা অসুবিধা তৈরি হয়েছে—যেসব এলাকা দিয়ে মেট্রো রেলের কাজ চলছে, সেসব এলাকার মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। কাজের গতি আরো বাড়ালে ভালো হতো। বিভিন্ন রাস্তার বড় অংশ ঘিরে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস, কিন্তু ভেতরে তো সেভাবে জোর কদমে কাজ হচ্ছে না। মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারের নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে।

একটা বিষয় খেয়াল করার মতো—বড় বড় প্রজেক্টেই শুধু সরকারের আগ্রহ। ছোট ও জরুরি বিষয়ে সরকারের আগ্রহ বা মনোযোগ কম। আমার ধারণা, বিশাল বিশাল যে প্রজেক্ট হচ্ছে, তাতে পরিকল্পনারও ঘাটতি আছে। এখানে কস্ট ও বেনিফিট নিয়ে ভাবা হয় না। অমুক প্রজেক্টে এত টাকা খরচ হচ্ছে, কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর কতখানি উপকার পাওয়া যাবে। কোন কাজটি আগে করা জরুরি? রূপপুর প্রকল্প আগে জরুরি, নাকি গ্রামে স্কুলের অবকাঠামো নির্মাণ বা ভাঙা বিল্ডিং মেরামত এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুবিধার জন্য হাসপাতালের উন্নয়ন আগে করা দরকার। আবার কোনো কাজই নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। এটাও আরেক বিড়ম্বনা। কারণ এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে হয়তো জবাবদিহির ব্যাপার নেই। কোন প্রজেক্ট কী কারণে দেরি হচ্ছে, খরচ কেন বেড়ে যাচ্ছে? তদন্ত হয় কি? তদন্ত না হলে সংশোধনও হয় না। উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পের অবশ্যই দরকার, কিন্তু জনসেবামূলক ছোট ছোট কাজ আগে করা দরকার বলে মনে করি।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

 

মন্তব্য