kalerkantho

আফগান শান্তিপ্রক্রিয়া : আশা ও শঙ্কা

অনলাইন থেকে

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আফগান শান্তি আলোচনায় মার্কিন দূত জালমাই খলিলজাদ গত ৫ আগস্ট কাতারের রাজধানী দোহা ছাড়ার সময় স্পষ্ট করেই বলেছেন, চুক্তির বিষয়ে দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। চুক্তি সম্পাদিত হলে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করতে পারবে। কিছু বিষয়ে প্রক্রিয়াগত বিশদীকরণ বাকি আছে শুধু। সমস্যা হলো, ওই বিশদীকরণের মধ্যেই হয়তো শয়তান লুকিয়ে আছে।

খলিলজাদ চান ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই চুক্তি সম্পাদিত হোক—২৮ সেপ্টেম্বর আফগান (প্রেসিডেন্ট) নির্বাচনের আগেই। চুক্তির সারকথা খুবই সরল—তালেবানের মূল দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে আর তালেবানরা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী আল-কায়েদার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং আফগান ভূমি ব্যবহার করে কাউকে হামলা চালাতে দেওয়া হবে না, সে প্রতিজ্ঞা করবে।

বাস্তবে বিষয়াদি বেশ জটিল। কতসংখ্যক সেনা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করবে এবং কত দ্রুত করবে? সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রশ্ন হলো, এ চুক্তি তালেবান পক্ষকে কিভাবে বাধ্য করবে? ওয়াশিংটন পোস্টে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত মোতাবেক বর্তমানে আফগানিস্তানে মোতায়েন করা ১৪ হাজার সেনার মধ্যে পাঁচ-ছয় হাজার সেনা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র (আরো সাড়ে আট হাজারের মতো, বেশির ভাগ ইউরোপীয় সেনা সেখানে আছে)। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, বাকিদের ধীরে ধীরে, বছর দুয়েকের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে; অন্যদের মতে বছর দেড়েকের মধ্যে। তাও আবার তালেবান ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি, সংবিধান সংশোধন এবং এজাতীয় আরো কিছু বিষয়ে আলাদা করে সমঝোতা হওয়ার পর।

আফগান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা-আলোচনাই সবচেয়ে জটিল। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর এশিয়া প্রগ্রামের পরিচালক লরেল মিলার মনে করেন, তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার বিষয়গুলোই বরং সহজ ছিল। তালেবান কাবুল সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুলের বেশি কিছু ভাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের কোনো একটি উদ্যোগ সম্পন্ন হওয়ার আগে তারা সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে নারাজ।

যা হোক, লক্ষণ দেখা যাচ্ছে—তালেবান তাদের কাবুলি প্রতিপক্ষদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। ৭-৮ জুলাই দোহায় জার্মানি ও কাতার আয়োজিত আন্ত আফগান বৈঠকে তালেবান সদস্যদের সঙ্গে আফগান সরকার, অন্য বিরোধীপক্ষ, সুধীসমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বসেছে; তবে সেটা পুরোপুরি দাপ্তরিক নয়। এটি অচলাবস্থা নিরসনকারী একটি ঘটনা। গত ফেব্রুয়ারি ও মে মাসেও অনুরূপ আয়োজন হয়েছে; তবে তাতে আফগান সরকারের কেউ ছিল না। সর্বশেষ আয়োজনে ১১ জন নারী উপস্থিত ছিলেন, তাদের মধ্যে আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধানও ছিলেন। তাঁরা সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনার ব্যাপারে একমত হন।

এ ব্যাপারেও সমস্যা রয়েছে—কাবুলের পক্ষে কে কথা বলবে? নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, জনাব গণির (প্রেসিডেন্ট) অথবা তাঁর ১৭ প্রতিপক্ষের যিনিই নির্বাচিত হন তাঁর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তালেবান আলোচনায় বসতে চাইবে কি না স্পষ্ট নয়। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে তাঁর (প্রেসিডেন্ট) ও তালেবানের মধ্যে চুক্তির বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

মিসেস মিলারের মতে, শান্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও নির্বাচন কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় বড় রকমের সমস্যা হতে পারে। আর নির্বাচন বাতিল হলে তালেবানের ব্যাপারে সরকারের সুবিধাজনক কিছু বিষয় অপসৃত হবে; তখন সরকারের বৈধতার দাবি ফিকে হয়ে যাবে।

যে-ই কাবুলে ক্ষমতাসীন হোক, সাধারণ আফগানরা আরো ভোগান্তির মধ্যে পড়তে পারে। তালেবান ‘সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যবস্থা’র দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। সেই ব্যবস্থা তাদের ২০০১-পূর্ববর্তী ব্যবস্থার মতো না হলেও নারী অধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়াদির জন্য তা বেশ বিপত্তিকর হবে।

চুক্তিটি যদি সুচিন্তিত হয়, তাহলে এসব ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। কিন্তু আফগানরা মনে করে না যে তারা সুচিন্তিত একটি চুক্তি পাবে। মূল তিন বিষয়ে—মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, সন্ত্রাস দূরীকরণের নিশ্চয়তা ও আন্ত আফগান আলোচনা—যদি অগ্রগতি ঘটেও তার পরও চতুর্থ একটি বিষয় থেকে যাবে। সেটি হলো, খলিলজাদের দাবীকৃত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। চলমান পরিপ্রেক্ষিতে তালেবান সেটা চাইবে না।

পরিস্থিতিকে আরো জটিল করার জন্য আঞ্চলিক পক্ষগুলো মাঠে ঢুকে পড়তে পারে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ভারত কর্তৃক বাতিল হওয়ায় পাকিস্তানে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় আফগান শান্তিপ্রক্রিয়া বেচালে পড়তে পারে। তবে পাকিস্তান চুক্তি চায়। অন্যদিকে ভারত তালেবানবিরোধী পক্ষগুলোকে আরো সহায়তা জোগাবে। ইরানও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। আইসিজির গ্রায়েম স্মিথ শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

 

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য