kalerkantho

ডেঙ্গু প্রতিরোধের জৈবিক পদ্ধতি এবং অন্যান্য ভাবনা

ড. হারুনুর রশীদ

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গু প্রতিরোধের জৈবিক পদ্ধতি এবং অন্যান্য ভাবনা

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ সমাধান কী? আমি জানি, আমাদের প্রত্যেকের উত্তরই সঠিক হবে। কারণ এর প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং আমরা সবাই কোনো না কোনো প্রতিকার-প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা বলব, যার বেশির ভাগই সঠিক। যদিও কিছুদিন ধরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কথাবার্তা শুনে মনে হতে পারে যে সবচেয়ে সহজ সমাধান হলো দোষারোপ করা, নিজের ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আমি সেই আলোচনায় যাব না, বরং কিছু জৈবিক নিয়ন্ত্রণের (biocontrol) কথা বলব, যার মধ্যে কিছু সমাধান আমার গবেষণালব্ধ। তা ছাড়া কিছু সমন্বিত পদক্ষেপের কথাও আলোচনা করব। তবে মনে রাখতে হবে, এর কোনোটিই বিচ্ছিন্নভাবে একক সমাধান নয়। তাই তো শুধু ওষুধ ছিটিয়ে বা বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।

মশার ওষুধের ডোজ ও ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ : আচ্ছা বলুন তো, ভরা বর্ষায় নালা-নর্দমার উপচে পড়া পানিতে ওষুধ প্রয়োগ করে কী এর সঠিক ‘ডোজ’ মেইনটেন করা সম্ভব? নর্দমার প্রবহমান পানি কি মুহূর্তের মধ্যে এই ওষুধকে ধুয়ে নিয়ে যায় না? তাই যে ডোজ প্রয়োগ করা হয় তা এত বেশি দ্রবীভূত (diluted) হতে পারে যে মশা কিংবা এর লার্ভার তেমন কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। ‘একটু ক্ষতি হবে কিন্তু মৃত্যু হবে না’ এমন মাত্রা বেশির ভাগ বিষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই বলি, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু দমন করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ধরনের রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা (পাবলিক হেলথের ভাষায় যাকে কি না herd immunity বলে) কমে যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও খুব ভালো ভেক্টর কন্ট্রোল প্রগ্রাম থাকার পরও জনগোষ্ঠীর ডেঙ্গু প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় হঠাৎ করে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার নজির আছে নিকট-অতীতে। ডেঙ্গু থেকে নিস্তার পেতে হলে ‘ভেক্টর’ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ডেঙ্গু আপনাতেই নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে। দেখুন, এই ভরা বর্ষায়ও ঢাকার ড্রেনগুলোতে জায়গায় জায়গায় স্থির পানির ‘পকেট’ তৈরি হয়ে থাকে, যার জন্য প্রধান দায়ী দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। স্বচ্ছ পানির এই পকেটগুলোতে তাই সহজেই এডিস ও অন্যান্য মশার বিস্তার হবে। আর বাড়ির আশপাশে এখানে-সেখানে পানি জমে থাকা তো আছেই। তাই মশার বিস্তার রোধে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।

নালা-নর্দমায় ও বদ্ধ জলাশয়ে মশকভুক মাছ ছাড়া : চট্টগ্রামে ২০১৭ সালে একটি গবেষণা করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল মশা নিধনের জন্য (মশক লার্ভা ভক্ষণ) দেশি জাতের কিছু মাছের সঙ্গে বিদেশি জাতের মাছের দক্ষতা তুলনা করা। এটি করতে গিয়ে আমি চট্টগ্রামের বিভিন্ন ড্রেনের ও নর্দমার প্রচণ্ড নোংরা পানিতে প্রচুর পরিমাণ ‘মশাভুক মাছ’ (mosquito fish) পেয়েছি এবং এরা এই নোংরা পানিতে খুব ভালোমতোই অভিযোজিত। আর তাদের পেট কেটে দেখেছি প্রচুর পরিমাণে মশার লার্ভা। এই মাছটি আপনারা অনেকেই চেনেন, কিছুটা আমাদের দেশি দাড়কিনা মাছের মতো দেখতে এবং শহরের অ্যাকোয়ারিয়াম শপগুলোতে সচরাচর বিক্রি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রামে বেশ কয়েক বছর আগে এই মাছ ও গাপ্পি ছাড়া হয়েছিল বলে শুনেছি। আমি চট্টগ্রামের ড্রেনে গাপ্পি তেমন দেখিনি, কিন্তু এই ‘মসকুইটো ফিশ’ প্রচুর পরিমাণে দেখেছি। ওরা ড্রেনের নোংরা পানিতে শুধু বছরের পর বছর টিকে আছে তাই নয়, বংশও বিস্তার করছে। সেই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ মশার লার্ভা খেয়ে আমাদের সাহায্য করছে। আচ্ছা, চট্টগ্রামে কী ডেঙ্গুর প্রকোপ ঢাকার চেয়ে একটু কম? তাহলে কি তা এই মাছের কারণে? সিটি করপোরেশনগুলো কখনো মশা নিধনের পরিবেশবান্ধব এসব পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখেছে? কিছু গবেষণা? আপনাদের বাজেটে তো টাকার অভাব নেই। খুব বেশি টাকা কি লাগে এই ছোট্ট গবেষণাটি করতে? এই গবেষণায় আমার খরচ হয়েছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকার মতো। ‘মসকুইটো ফিশ’ ছাড়াও আরো কিছু দেশি-বিদেশি মাছ ল্যাবরেটরিতে আমি পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল মশার লার্ভা ভক্ষণে তাদের দক্ষতার তুলনা করা। পরবর্তী সময় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাপার (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) সম্মেলনে আমার গবেষণা উপস্থাপনও করি। গবেষণায় আমি দেখেছি যে বিদেশি ‘মসকুইটো ফিশ’ বা গাপ্পির তুলনায় মশক লার্ভা ভক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশি জাতের খলিসা মাছের দক্ষতা প্রায় দ্বিগুণ। বিদেশি মাছের তুলনায় দাড়কিনা মাছের দক্ষতাও ভালো লার্ভা দমনের ক্ষেত্রে, কিন্তু ড্রেনের পানিতে এই মাছ বেশিদিন টিকে না। পক্ষান্তরে খলিসা শুধু মশার লার্ভা ভক্ষণেই ভালো নয়, এটির ড্রেনের পানিতে অভিযোজন ও টিকে থাকার হারও ভালো।

মশা দমনে জৈব বালাইনাশক প্রয়োগ : পানিতে মশার লার্ভা দমনের জন্য কার্যকর একটি জৈব বালাইনাশক হলো বিটিআই (Bacillus thuringiensis israelensis)। এটি এক ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং ল্যাবরেটরিতে চাষ করা যায়। দেশেই বিটিআই প্রয়োগ করে মশা দমনে ভালো ফল পাওয়া গেছে। আমরা চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?

সমন্বিত বালাই দমন বা আইপিএম : মশাবাহিত রোগ দমনে সফল দেশগুলোতে মশক দমনের জন্য সবারই খুব ভালো সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতি কার্যকর আছে। মনে রাখবেন ফসলের ক্ষতিকর পোকা-মাকড়ের মতো মশাও কিন্তু একটি পতঙ্গ। তাই আইপিএম পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে যদি ফসলের পোকা দমন করা যায়, তবে মশাও দমন করা যাবে।

পলিথিন ব্যাগ ও অন্যান্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ : এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে যত্রতত্র পলিথিন ব্যাগ ও সিনথেটিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার শহরের নালা-নর্দমায় জলাবদ্ধতার জন্য প্রধান দায়ী। উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তাই দরকার পলিথিন ও প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। ইউরোপের দেশগুলো যেখানে আমাদের দেশ থেকে চটের ব্যাগ আমদানি করছে শপিং ব্যাগ হিসেবে ব্যবহারের জন্য, আমরা সেখানে সহজলভ্য ও দেশে উৎপাদিত পাটের এই দ্রব্যের ব্যবহার না করে প্লাস্টিক প্যাকেজিং ব্যবহার করছি। চাইলেই পলিথিনের মতো প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আইন তো আমাদের আছেই, প্রয়োজন আইনের প্রয়োগের। তাহলেই ড্রেনের পানি জমে থাকার জন্য দায়ী একটি বড় কারণ দূর হবে। এর পাশাপাশি মশার বাসস্থান নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতির (যেমন—বাড়ির বা কর্মক্ষেত্রের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া) প্রয়োগ করাও জরুরি।

বাড়ির দরজা-জানালায় স্থায়ী মশারির জাল স্থাপন : জীবন রক্ষার্থে কিছু খরচ কি করা যায় না? শুধু দাপ্তরিক ব্যবস্থার জন্য চেয়ে বসে থাকতে হবে কেন? বাড়ির দরজা-জানালায় স্থায়ী মশারির জাল লাগালে মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব সহজেই এবং এটি করতে খুব বেশি খরচ তো হবে না। আমি যেই ফ্ল্যাটে থাকি, তাকে সুরক্ষিত করার জন্য কিছু খরচ তো করতেই হবে। কারণ তাতে জীবন রক্ষা হবে।

পূর্ণবয়স্ক মশা দমন : মশা পূর্ণবয়স্ক হয়ে গেলে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ ছাড়া দমন সম্ভব নয়। তাই পরীক্ষিত ও কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ করে পূর্ণবয়স্ক মশা দমন করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব আছে জনস্বাস্থ্যে এবং পরিবেশে। তাই এর প্রয়োগে এবং মাত্রা নির্ধারণে খুবই সতর্ক হতে হবে।

একটি সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন উপায় থাকতে পারে। ডেঙ্গুর মতো রোগ যেখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে সেখানে মশক নিধনের বিভিন্ন ধরনের উপায় সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে দেখা উচিত নয় কি? এখনো কী আমরা বুঝতে পারিনি যে শুধু ওষুধ ছিটানোর মতো সহজ সমাধানই একমাত্র সমাধান নয়? অন্যান্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পাশাপাশি জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রয়োগ থেকে তত্ক্ষণাৎ ফল আসবে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে। তাই আসুন, সবাই মিলে চেষ্টা করি নানাভাবে, ভিন্নভাবে, একসঙ্গে বা আলাদা আলাদা জৈবিক, রাসায়নিক কিংবা যান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে হবে এবং ডেঙ্গু তথা মশা দমনের জন্য সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে।

 

লেখক : প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা