kalerkantho

বন্দুকবাজি ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ

চার্লস এম ব্লো

৬ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বন্দুকবাজি ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ

এ লেখায় স্বস্তিদায়ক ও উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নেই। শোকে মুষড়ে পড়ার ভাবও নেই। আমি বরং হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করতে চাই। একটি সত্য প্রকাশ করতে চাই।

প্রথমেই শুরু করা যাক গত কয়েক দিনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর কথা দিয়ে। ২৮ জুলাই সান্টিনো উইলিয়াম লেগান নামের ১৯ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ ক্যালিফোর্নিয়ার গিলরয়ে গার্লিক ফেস্টিভালে (বার্ষিক খাদ্যোৎসব) গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা ও ১৩ জনকে আহত করে। এরপর সে আত্মহত্যা করে। দ্য ডেইলি বিস্টের (ওয়েবসাইট) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুলিবর্ষণের ঘটনার ঠিক আগে লেগান একটি ছবি পোস্ট করে। সেটির ক্যাপশনে সে তার অনুসারীদের ঊনবিংশ শতকের একটি প্রোটো-ফ্যাসিস্ট বই পড়তে বলে। দ্য বিস্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে : বইটি হিটলার ও অন্য ফ্যাসিবাদীদের লেখার সঙ্গে এ বই পড়ার জন্য 8chan (অথবা ইনফাইনাইটচ্যান বা ইনফিনিটিচ্যান)-এর মতো ফোরামে অনেকবার সুপারিশ করেছে। অ্যান্টি-সেমিটিক, যৌনতাবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বইটি ‘আর্য’-মহিমার পক্ষে, আন্তঃবর্ণ বিয়ের বিরুদ্ধ এবং ভুয়া শুদ্ধতাবাদী ধারণার ওপর ভিত্তি করে সহিংসতার পক্ষে কথা বলে।

শনিবার প্যাট্রিক ক্রুসিউস নামের ২১ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ তরুণ এল পাসোতে একটি জনাকীর্ণ ওয়ালমার্ট ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ঢুকে গুলি চালিয়ে ২০ জনকে হত্যা করে এবং দুই ডজনের বেশি লোককে আহত করে। তাদের মধ্যে কয়েকটি শিশুও রয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে, ওয়ালমার্টে গুলিবর্ষণের কথা জানিয়ে ৯১১ নম্বরে প্রথম কল করার ১৯ মিনিট আগে অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ অভিবাসীবিরোধী একটি ইশতেহার দেখতে পাওয়া যায়। সিএনএন বলেছে, কর্তৃপক্ষ ওই বর্ণাবাদী ভাষ্য খতিয়ে দেখছে। পুলিশ মনে করছে, ক্রুসিউস সেটি পোস্ট করেছে।

ইশতেহারটি অভিবাসীবিরোধী ও হিস্পানিবিরোধী। শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা হ্রাসের ভীতি ছড়িয়ে তাতে বলা হয়েছে, এর ফলে জনসংখ্যার আনুপাতিক অবস্থান বদলে যাবে; এর ফায়দা পাবে ডেমোক্র্যাটরা এবং আমেরিকা একটি একদলীয় দেশে পরিণত হবে। পরের দিন রবিবার কনর বেটস নামের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক ওহাইওর ডেটনে গুলি চালিয়ে ৯ জনকে হত্যা করে এবং ২৭ জনকে আহত করে। নিহতদের অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ।

গুলিবর্ষণের এসব ঘটনা কি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ সামনে আনছে? অবশ্যই। আমাদের প্রচুর বন্দুক। অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র আমরা নাগরিকদের কাছে বিক্রি করছি। যাদের হাতে অস্ত্র থাকা উচিত নয়, তাদের হাতে যাতে অস্ত্র না যায় সে ব্যাপারে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছি না। বিক্রীত অস্ত্রের খোঁজখবর বলতে গেলে রাখছি না।

সন্ত্রাসের ঘটনাবলি ঘটছে। কেউ কারো কথায় উসকানি পেয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে বাধ্য হচ্ছে কি? সন্দেহ নেই, ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা অভিবাসীবিরোধী বুলি কপচে যাচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, সব দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া খুবই জুতসই ও সহজ কাজ। এ প্রসঙ্গে নজর দেওয়ার অধিকতর ভালো উপায় হচ্ছে এটা বুঝতে চাওয়া যে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসীরা এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী নীতিনির্ধারকরা সমান্তরাল ভুবনে বাস করলেও উভয়ের বিচরণ একই পথে, একই লক্ষ্যে। তারা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চায়।

নীতিনির্ধারকরা মনে করেন তারা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কাজটি করতে পারেন। আর সন্ত্রাসীরা লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে। নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, রাস্তায় লাশ ফেলার চেয়ে সীমান্ত প্রাচীর, অভিবাসীবিরোধী আইন, ভোটারদের বিপথে চালনা এবং সর্বোচ্চ আদালতে বিচারক বাড়ানো বেশি কার্যকর ও স্থায়ী উপায়।

অন্যদিকে এল পাসো ইশতেহারের লেখক বলেছেন, রিপাবলিকান পার্টি ভয়ংকর! দলটির বেশ কিছু উপদল করপোরেশনপন্থী, আর করপোরেশনপন্থী মানে অভিবাসনপন্থী। আবার কিছু উপদল করপোরেশনকে অগ্রাধিকার দেয় না। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা প্রায় সমস্বরে অভিবাসনের পক্ষে কথা বলে। রিপাবলিকানরা দ্বিধাবিভক্ত হলেও তাদের সঙ্গে কাজ করলে অভিবাসী-প্রবাহ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানো সম্ভব হবে।

এই সন্ত্রাসী পক্ষগুলো যে প্রায়ই বিপত্তিকর অবস্থায় পড়ে তার কারণ ওপরের ভাষ্যেই স্পষ্ট। তারা শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী নীতিনির্ধারকদের ওপর ক্ষিপ্ত। কারণ তারা মনে করে, তারা তাদের মিশন ভেস্তে দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা দ্রুত কিছু করে ফেলতে চায়, নীতিনির্ধারকরা চায় ধীরে করতে। তাই সন্ত্রাসীরা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তারা অভিবাসীদের ওপর ক্ষিপ্ত কারণ তারা বর্ধমান, তারা শ্বেতাঙ্গদের সাংখ্যিক গরিষ্ঠতায় ধস নামাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার অভিযোগে তারা শ্বেতাঙ্গ উদারপন্থীদের ওপরও ক্ষুব্ধ; কৃষ্ণাঙ্গদের ওপরও ক্ষুব্ধ।

পরিবর্তমান জনমিতির বিষয়ে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীরা সাড়া দেয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। ট্রাম্পের বা অন্য রাজনীতিকদের কথাবার্তা বন্দুকবাজদের প্রণোদিত করেছে—বিষয়টা অত সহজ নয়। তবে এসব রাজনীতিক ও সন্ত্রাসীরা একই পক্ষের লোক—এটি স্বীকার করতে হবে। শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী নীতিনির্ধারকদের পথ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একই।

লেখক : নিউ ইয়র্ক টাইমসের লেখক

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস (অনলাইন)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য