kalerkantho

চীন ও রাশিয়ার যৌথ বিমান মহড়া

এম কে ভদ্রকুমার

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চীন ও রাশিয়ার যৌথ বিমান মহড়া

এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গত সপ্তাহে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহে চীন ও রাশিয়ার বিমানবাহিনী প্রথমবারের মতো যৌথ বিমান মহড়ায় অংশ নেয়। তারা ধীরগতিতে অনেকটা অদৃশ্যভাবে আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলেছে। চীন ও রাশিয়া অবশ্য বারবারই দাবি করে আসছে যে তাদের কোনো সামরিকভাবে জোটবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা নেই। এবং তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধেও তাদের এই মহড়া নয়। যদিও তাদের সম্পর্কের রসায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আর এই পরিবর্তন এসেছে তাদের শীর্ষ নেতাদের সচেতন সিদ্ধান্ত থেকেই।

এই মহড়ায় রাশিয়ার টিইউ-৯৫এমএস বোমারু বিমান এবং চীনের এইচ-সিক্সকে যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। টিইউ-৯৫এমএস বা টুপোলভ (ন্যাটোর ভাষায় বিয়ার) চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম যুদ্ধবিমান। রাশিয়ার নবনির্মিত কেএইচ-১০১/১০২ স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম এটি। বিয়ার স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিমান। পরে অবশ্য এর প্রযুক্তিতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালে একে সমুদ্রের জাহাজ, সাবমেরিনের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হতো। 

চীনের এইচ-সিক্সকে যুদ্ধবিমানকেও বিয়ারের আদলেই উন্নত করা হয়েছে। এটিও ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। পেন্টাগনের দেওয়া তথ্যানুসারে চীনের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই দীর্ঘ পাল্লার বোমারু বিমানটি। গত সপ্তাহের মহড়ায় চীন ও রাশিয়া দুটি করে এইচ-সিক্সকে এবং টিইউ-৯৫এমএস বোমারু বিমান অংশ নেয়।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, মহড়ায় বিমানগুলো জাপান সাগর ও পূর্ব চীন সাগরের ওপর দিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে টহল দেয়। রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে এই যৌথ মহড়ার আয়োজন করা হয়।

এ ছাড়া এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক আরো বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তাদের যৌথ অভিযানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। রাশিয়ার বিবৃতিতে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, এই মহড়ার মধ্য দিয়ে ‘বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা জোরদার’ হবে।

পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপের (কোরিয়ার কাছে যা দাকতো এবং জাপানের কাছে তাকেশিমা নামে পরিচিত) ওপর চীন ও রাশিয়া কেন তাদের যৌথ বিমান মহড়া চালাল, তা স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। ওই অঞ্চলের জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র বলে মনে করে। পেন্টাগনের ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র দুই মাসের মাথায় এই মহড়া অনুষ্ঠিত হলো। এই প্রতিবেদনে চীন ও রাশিয়া উভয়কেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে চীনের বিবৃতি রাশিয়ার চেয়ে স্পষ্ট। তারা দুই দেশের মধ্যে ‘সব ধরনের কৌশলগত সমন্বয়ের’ কথা বলেছে। মস্কো অবশ্য জানিয়েছে, বিস্তৃত প্রকল্পের অংশ হিসেবে দীর্ঘ পাল্লার এই বিমান টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীন-রাশিয়ার সেনাবাহিনীর একসঙ্গে কাজ করার দক্ষতা বৃদ্ধি। চীন বা রাশিয়া কেউই পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত এলাকার বিতর্কের অংশ নয়। ওই এলাকায় তাদের যৌথ টহলের প্রয়োজন ছিল না। তাদের এবারের তৎপরতা অনেকাংশেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ মহড়ার মতো হয়েছে। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। যদিও সেখানে তাদের ভূমিকা পর্যবেক্ষকের। ওই অঞ্চলে তাদের মিত্র জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়াকে সহযোগিতা করতে পারে না তারা।

চীন ও রাশিয়ার বিমানের বিতর্কিত দাকতো দ্বীপ এলাকায় টহলের এক দিন পর সিউল সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এই ঘটনা। চীন ও রাশিয়ার বিমান টহলের পর দ্বীপটিতে ১৮টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে দক্ষিণ কোরিয়া। জাপান ১০টি বিমান পাঠায়।

ধারণা করা হচ্ছে, এই বিবাদেরই সুযোগ নিয়েছে চীন ও রাশিয়া। এর মধ্য দিয়ে দেশ দুটি তাদের নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেল। সিএনএন মনে করে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে ওই এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের যে বিমানগুলো ছিল, সেগুলো তাড়িয়ে দেওয়াই ছিল চীন ও রাশিয়ার উদ্দেশ্য। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকেও একটি বার্তা দিতে চেয়েছে তারা। বিশেষ করে চীনের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

লেখক : ভারতের কূটনীতিক।

 তুরস্ক ও উজবেকিস্তানের ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য